মেন্টোস জিন্দেগী ও রবিনবাবুর ঘড়ি

 মেন্টোস জিন্দেগী  ও রবিনবাবুর ঘড়ি   

--পীযূষকান্তি বিশ্বাস


শুনেছি কবি বারীন ঘোষাল আম পছন্দ করতেন । ল্যাংড়া, গোপালভোগ, খিরসা, অরুণা, আম্রপালি, মল্লিকা, সুবর্ণরেখা, মিশ্রীদানা, নীলাম্বরী, কাঁচামিঠা, আলফানসোফজলি বা পাতি গুঠলি আম । তার বাড়িতে আম আসতো বহরমপুর, দিল্লি, মেদিনীপুর, বর্ধমান, মালদা থেকে । আম নিয়ে তার ছিল এক সূক্ষ্ম স্বাদবোধ, যেটা ছিল বাংলা কবিতাবাজারের ‘খাস’ কবিদের থেকে আলাদা । খাস চরিত্রের বাইরে তার অবস্থান, অতি তরুণ শ্যামল আমচরিত্রে তার আস্থা তাকে প্রতিনায়কের আখ্যা দিলেও এইসব নিয়ে কবি বারীন ঘোষাল নিজেই যাপন করতেন এক মেন্টোস জিন্দেগী, যা ছিল শো-কেস জীবন থেকে পৃথক, জনপ্রিয়তার জীবন থেকে ইন্সুলেটেড ,আবহমান চরিত্র থেকে জারা হটকে, বরং বলা যায় আম থেকে গুঠলি আলাদা করার ক্ষমতার এক মেন্টর জিন্দেগী । যা ছিল স্বয়ং আম থেকে পৃথকযা ছিল মঞ্চপ্রিয়তার থেকে অনেক দূরে এক পাহাড়ি তরাই, যা ছিল সবুজ ঝকঝকে কবিতা নিয়ে নতুন কাজ করতে চাওয়া তরুণ কবিদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র । তাঁর সেই মেন্টোস-জিন্দেগীর চিন্তাতরঙ্গ আর মেন্টর-চরিত্রের সাহিত্যচেতনা এক প্রদেশ থেক অন্য প্রদেশ, এক আবহাওয়া থেকে অন্য আবহাওয়ায় প্রাকৃতিক ভাবেই সঞ্চারিত হয়েছে, তা এই দূর দিল্লি থেকে যতটুকু ধরা যায়, তা দু এক কথায় চেষ্টা করছি ধরার ।


বারীন ঘোষালকে আমি ভালো চিনতাম না । সেটা আমার সমস্যা । আমি নিজেকে একজন তরুণ কবি হিসাবে প্রেজেন্ট করতাম । দিল্লি আমার ক্ষেত্র । দিলবালোকা দিল্লি । ডায়াস্পোরিক দুনিয়া । এই দুনিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বারীন ঘোষাল নিয়ে কিছু বলতে গেলে একটা কেস স্টাডি করতে হয় । একটা উদাহরণ নিয়ে কিছু কথার অবতারণা করতে হয় । মেন্টর বারীন ঘোষাল আর তরুণ কবির কেমিস্ট্রি কিভাবে ডেভেলপ হতো, তার একটা স্টাডি এখানে আমি ধরার প্রয়াস করি । আমার যা কিছু সাহিত্যচর্চা তার সমস্তই ভিন-প্রদেশে, আইসোলেশনে ও একা । মিডিয়া বলতে যা বুঝেছি তা শূন্য-দশকের পরে । অথচ আমি বঙ্গপ্রদেশ থেকে তার এক দশক আগেই, ১৯৯৩ নাগাদ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কাজ করার প্রয়োজনে চলে আসি । বিচ্ছিন্ন ছিলাম ধারাবাহিক ভাবে । দিল্লিতে আসি ১৯৯৮ নাগাদ । তখনো বিচ্ছিন্ন ছিলাম, স্থায়ী ঠিকানা গড়ে ওঠে নাই । দিল্লির বিভিন্ন অঞ্চলেও ঘটেছে নানান সাহিত্যের ঘনঘটা, কিন্তু তখনো আমার লিটল ম্যাগাজিন, বইমেলা, আবহমান কবিতা বা মেনস্ট্রিম কবিতা সম্পর্কে ধারণা গড়ে ওঠেনাই । সাহিত্য আন্দোলন নিয়ে আমার ধারনা জন্মায়নি । ২০০৫ নাগাদ মহাবীর এনক্লেভে চলে আসি পার্মানেন্ট । মহাবীর এনক্লেভ বাঙ্গালী কলোনি, এখানে একটা পত্রিকায় নিয়মিত লিখতাম – তার নাম ‘কথাঞ্জলী’ । সুতরাং এই প্রথম দেখা গেলো একটা সম্ভাবনার চৌম্বক ক্ষেত্র । সেখানে ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ফিল্ডে বারীন ঘোষাল কিভাবে তার বৈদ্যুতিক চেতনা প্রভাব ছড়িয়ে দিলেন তা দেখার জন্য আরও একটু ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে নিই । 

সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে যোগাযোগ একটা গুরুত্বপূর্ণ রিসোর্স, সোশাল মিডিয়া সেখানে জুড়ে আছে মস্ত বড় শেয়ার নিয়ে । এখানেও আমি নিজেকে একজন তরুণ কবি হিসাবেই দেখি। লেখালেখি শেখার চেষ্টা করি, এই বিদেশ বিভূঁইয়ে ইন্টারনেট এক ভরসা । ফেসবুক , ইমেল, ব্লগ ম্যাগাজিন যোগাযোগের মাধ্যম । সোশাল মিডিয়ায় আসার পরে অনেক দিগন্ত খুলতে থাকেআমিও বুঝতে পারি এক নীল সমুদ্রের আহ্বান । এতদিনে পরিচিত হয়ে পড়লাম পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ এবং খোদ দিল্লির সাহিত্য কর্ণধার দিল্লি হাটার্সদের সঙ্গে । যতদূর সম্ভব এইভাবে মনে পড়ে, বারীন ঘোষালের নাম প্রথম শুনি দিল্লি হাটার্সে গিয়ে । আর একটু একটু করে খোলসা হচ্ছে বারীন ঘোষাল কি বা কেন ? একজন তরুণ কবির কবিতা জীবনের টার্নিং পয়েন্টে কোথায় কোথায় বিশেষ ভূমিকায় ছিলেন বারীন ঘোষাল । তার কবিতা, কাব্যভাবনা, অতিচেতনা, গদ্য ভাব, নিয়ে অনেক আলোচনা অনেকেই করবেন ।আমি তার মেন্টর জীবনের কিছু আলোচনা করি । তার ক্ষেত্রটা কি ? কেন দরকার ? আমি তাঁকে একজন সিনিয়র কবি হিসাবে পেয়েছিযাকে ‘মেন্টর’ বলেই আমি জেনেছি । তাঁকে জানতে জানতেই মনে হচ্ছে, ব্যক্তি বারীন ঘোষালকে আরও জানা দরকার । জানছি, বারীন ঘোষাল একজন মস্ত বড় কবি, অথচ তিনি অপরিচিত থেকে যাচ্ছেন । কবিকে জানতে চাওয়া এক দুর্বোধ্য অভিপ্রায় । তার ভিতরে ঢোকা এক এডভেঞ্চারের পথনির্দেশ , বাঁকে বাঁকে বেরিয়ে পড়ে সারপ্রাইজধাপে ধাপে খুলে যায় নতুন দরজা, তার ভিতরে ঢুকে মনে হচ্ছে বারীন ঘোষালের অনেক কথা যা সম্মুখে আসে নাই । যত জানছি, বেরিয়ে পড়ছে নতুন তথ্য, নতুন ভাবনা, নতুন কবিতার উপর থেকে সরে যাচ্ছে বন্ধুর পাহাড় ।

আমি একদিন সৈনিক জীবন থেকে অবসর নিয়ে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং এর কাজ করি । কবিতার প্রতিশব্দ, বাক্যবন্ধন, ছন্দ, বিন্যাস, ধ্বনি সম্পর্কে আমার জ্ঞান বিলকুল ধারণা নেই । আমি মূলত আইসোলেশনে থাকি, বাংলা লিটল ম্যাগাজিন ও সাহিত্য আন্দোলনগুলি সম্পর্কে সম্যক ধারনা রাখি না । কবিতায় কতটুকু কবিতা থাকবে এই নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় থাকি । এই অনিশ্চয়তার গোলকধাঁধায় ফেঁসে যাওয়া এক বালক অভিমন্যুর কথা মনে পড়ে । চক্রব্যূহ ভেঙে আসার জন্য চাই একটা পাসওয়ার্ড, ভার্চুয়ালটির ল্যুপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য চাই একটা ব্রেক কন্ডিশন । ট্রুথ থেকে যখনই সেটা ফলস কন্ডিশনে যায়, স্টেটমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে চিন্তাপ্রবাহ । আর এটা ট্রিগার সেই করতে পারেন, যে ঐ প্রোগ্রামটা পার করে গেছেন । যার আছে দশতলা থেকে ঝাঁপ দেওয়ার অভিজ্ঞতা, আগুনের ভিতর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসার অতীত । এই রাস্তা, আর চলতে থাকার জন্য চাই উত্তম কলিজা , অদম্য সাহস, কম্পাস স্থিররাখা এক ধ্রুবচেতনা । এমন ব্যক্তিত্বের সহচর্য সবার কপালে জোটে না । এক এই রকম অবস্থাকে আমরা আইটির ভাষায় বলি "মেন্টরিং" । আর সল্যুশন থেকে প্রব্লেমে আসার পদ্ধতিকে বলি "রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং" । এই দুটি পদ্ধতিতে আমি কবিতা পড়া শুরু করি । মূলত কবিতা লিখতে গিয়ে দেখেছি, চেনা সিনট্যাক্স, শব্দবন্ধ, বাক্যগঠনের ব্যাপারে আমার কোন পরিচিত প্যাটার্ন নেই । এর জন্য হতে পারে আমি অধিক পরিমাণে আবহমান কবিতা পড়ি নাই ।  কিন্তু মেন্টরিং এর এমন ধারণা হয়তো দ্রোণাচার্যের জানা নেই বা স্বীকার করেন না, কিন্তু এই ত্রিশ কোটি বাঙালিদের মধ্যে আজো অজস্র একলব্যদের বাস । সঠিক আলো, বাতাস, জল পেলে এঁটেল মাটি ফাটিয়ে দিয়ে অঙ্কুরোদ্গম করে বীজ ।

আমি সাধারণত রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং করি । সেটা আমাকে কেউ শেখায় নাই । যে কবিতা আমি লিখতে চাই, তাতে একটা কোথাও গ্যাপ আছে, আবহমান থেকে কোথাও ব্রেক আছে । আমি কবিতাটা ভালো করে শিখে লিখিনি । আমার শব্দ, ধ্বনি, বিষয়, নিসর্গ চিন্তা আলাদা । কিন্তু যেহেতু আমি এইগুলোকেই আবার কবিতা ভাবি, সেই কারণেই আমি চেয়েছি কেউ একজন এইগুলো দেখে বলুক যে , এইগুলো কোন কবিতা না কিংবা বলুক অঙ্কুরোদ্গমের সঠিক ফরমুলা নয় । এই ব্যাপারে যেসব খোঁজ আমি করে থাকি, সেই ব্যাপারে প্রত্যক্ষ ভাবে আমাকে যথাযথ সাহস যুগিয়েছেন দিল্লি হাটার্স আর কবি বারীন ঘোষাল । আমি এইটাকে বলি ‘মেন্টরিং’ । যেটাকে ‘গুরু-ইজম’ থেকে পরিষ্কার আলাদা করা যায় । তরুণ কবি হিসাবে ‘মেন্টরদের’ কাছে আমার মতো তরুণ কবিদের এইরকম চাহিদা থাকে, যদি একটা তালিকা করা যায় ।  


১। সিনিয়র কবি আপ্রোচেবল হবেন । তার সঙ্গে নির্ভয়ে কথা বলা যাবে ।

২। সিনিয়র কবি নিজের কবিতা নিজের কাছেই রাখবেনতরুণ কবিকে পাচার করে দেবেন না ।

৩। সিনিয়র কবি নিজেকে পাঠ করবেন না । তরুণ কবিকে পাঠ করবেন তিনি ।

৪। সিনিয়র কবি একটা ভরসা দেবেন, আইডেন্টিফাই করবেন কার ভিতরে কি প্রতিভা আছে । তরুণ কবি নিজেই একদিন প্রবীণ কবি হয়ে যান । 

৫। সিনিয়র কবি কোন তরুণ কবির সিগনেচার বদলাবেন না । তরুণ কবিকে কবিতার পাঠ দেন না ।  তরুণ কবিকে পুষ্পিত হতে সাহায্য করেন । তরুণ কবির কাছে প্রশ্ন রাখেনতরুণ কবিকে এমন অবসর দেন সে নিজেই যে উত্তর খুঁজে নিয়ে আসে । 

৬। সিনিয়র কবি এই সমস্ত কর্মকাণ্ড থেকে কিছু পান না ।  দুএকটা কবিতার বই কেনা ছাড়া তরুণ কবিও সিনিয়রকে কিছু দেন না । সিনিয়র কবি এইটাই ভাবেন, পৃথিবীতে আরও একজন সত্যিকারের কবির আবির্ভাব হোক , সে নিজেকে চিনুককবিত্বময় হোক জগত । সমস্ত কবি নিজের নিজের কবিতার সন্ধান পাক । 

আসলে এমন কোন তালিকা নেই ।  এইটা আমার হাইপোথিসিস । আমার এই সমস্ত ধারনা পড়ে, আমার কবিতার কথা, ভাষা দেখে, কবিতা যাপন নিয়ে আমার একজন সিনিয়র কবি বলেছিলেন, "এতো যাত্রাপথ নয় , হাইওয়ে হে এতো হাইওয়ে নয়, রোপ ওয়ে হে" । কিন্তু এই আমার রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং  । এর ফরমুলায় আমি বুঝতে পারি, বাংলা সাহিত্যের অগণিত তরুণ কবির উপরিউক্ত মেন্টরিংএর ক্রাইটেরিয়া আর এক্সপেকটেশনকে ক্রমাগত মিটিয়ে আসছিলেন অতিচেতনার কবি বারীন ঘোষাল । আমিও পেয়েছি তার স্নেহাশিস আর বুকজোড়া ওয়ার্ম ওয়েলকামদিল্লির সাহিত্য মাধ্যমে বারীন ঘোষাল আরও অনেক কারণেই যুক্ত, কিন্তু প্রথম আজ তার শুরুয়াতের কথা কিছু আজ বলতে ইচ্ছে জাগে । উত্তম পুরুষে লেখা এই টেক্সট তাই আমি , আমার নিজের চোখে দেখা, নিজের অভিজ্ঞতা দিইয়ে বোঝা, নিজের কবিতা বোধ দিয়ে মূল্যায়ন করলাম । সুতরাং আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিমত থাকবে ।

 

এখানে অনেক একমত হবেন বা হবেন না, এক্সিট কন্ডিশন কারো ক্ষেত্রে ‘ট্রু’ হবে কার ক্ষেত্রে ‘ফলস’, সেইভাবে প্রোগ্রামে মিলিয়নস লাইনস অব কোড এক্সেকিউট হবে । ‘আমি’ একটা ভ্যারিয়েবল । ‘আমি’টাকে যে কোন নাম দিয়ে রিপ্লেস করে এক্সেকিউট করে দেখা গেলে তার আউটপুট হবে কগনিটিভ । তা দিল্লি থেকে ঢাকা, সুবর্ণরেখা থেকে আগরতলা , জেলায় জেলায় পাওয়া যাবে এই কাব্যচেতনার উজ্জ্বল কিশলয় । তার কবিতার মূল্যায়ন আমি কোনদিন করিনি, করার মতো সাহস এখনো পাই নাই, কিন্তু গতকাল যে বীজ অঙ্কুরোদ্গম করেছে, কে জানে কাল এক মহীরুহে রূপ নেবে না ? দিল্লি না হোক, হাওড়া, জলপাইগুড়ি, মুর্শিদাবাদ, কলকাতা, আগরতলা, পাবনা, বরিশালে যে সব বৃক্ষের জন্ম হয়েছে, তার মেন্ট্ররিং প্রসেস চালু হয়ে গেছে । আম জিন্দেগী থেকে এই সমস্ত এলাকার কবিদের মনে এক আশ্চর্য বসন্ত বিরাজ করছে । এই তো বৈশাখ এলো প্রায় । আম্রকুঞ্জে ঝাঁকিয়ে উঠেছে মঞ্জরী , শাখা প্রশাখা জুড়ে ফলে উঠবে ফলরাজ, সে আমার সামান্য সাহিত্য জ্ঞানের কবি না বললেও চলে ।   

তো জাহির হে, পাহাড়ি দিল্লির পাথুরে মাটিতে এমন আম্রকানন কিভাবে পল্লবিত হবে ? সেকথা জানার জন্য আবার একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যাবো । আমার সাহিত্য পরিক্রমা মানে যা দিল্লি থেকেই শুরু হয় । দিল্লির করিব থেকেদিল্লির কবিদের সংস্পর্শে এসেই আমি যেটুকু পল্লবিতদিল্লির যে সমস্ত বৃক্ষে আমি কবিতার শিলমোহর দেখেছি, সেখানে ঝলক ঝলক দীপঙ্কর দত্ত, দিলীপ ফৌজদার, গৌতম দাশগুপ্তকে ঘিরে গড়ে উঠেছে আমার কাব্য পাঠশালা । ইহ দিল্লিতে সাহিত্য চর্চার জন্য রয়েছে একটি প্রাঙ্গণ, যার নাম ‘দিল্লিহাট’ , যেখানে বসে প্রসাধনী, পোশাক আশাক, দ্রব্যের নানান বিপণন । ক্রেতা বিক্রেতাগণ প্রবেশ করেন টিকিট কেটে , যারা হাট করেন তারা হাঁটুরে । অথচ এমন বাজার সর্বস্ব মারকাটারি দিল্লির সাহিত্য আঙ্গিনায় যখন কথা ওঠে বাংলা কবিতারতার শ্রোতা হিসাবে আমরা পাচ্ছি বিজলী গ্রীলসনিম গাছের চাতাল আর বারীন ঘোষাল । দিল্লির সাহিত্য আসরে কবি বারীন ঘোষাল কি করছেন তার জন্য আমি আর একটা ছোট্ট গল্প ফাঁদি ।

দিল্লি এক বিশাল শহর । যেমন পুরানো, তেমন তার বিস্তৃতি, ছড়িয়ে ছিটেয়ে আছে আরাবল্লি রেঞ্জ । এবড়ো থেবড়ো পাহাড়ের উপর জেঁকে বসেছে সাত-সাতবার ভেঙে গড়ে ওঠা দেহ্‌লিজ । ঝাটি বাবলা আর সুলতানি ভগ্নাবশেষের মাঝে আমাদের এই সাহিত্য চর্চা, যা কোন দিন অমর খৈয়াম, রহিম খান, মির্জা গালিবের চারণভূমি ছিল । এমন দিল্লির চরিত্র হল মহানাগরিক । মল কালচার আর বাঘা রাজনেতাদের বিচরনক্ষেত্র । ভাষার ভৌগলিকতা, চলন বলন, কর্পোরেট দৌরাত্ম, ও যানজটের ইঁদুর দৌড়ে দিল্লিতে আজও শিল্প ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠে নাই । এহেন দিল্লিতে অনেক তরুণ চাকরি সূত্রে পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসে দিল্লিতে বসবাস করেন, কিছু তরুণ কবির দিল্লিতেই পড়াশোনা । গড়ে উঠেছে নানান সাহিত্যসভার । সর্বভারতীয় বঙ্গভাষী সমিতি, অহেতুক আড্ডা চক্র, বঙ্গদর্শন ক্লাব, সাহিত্যায়ন , বঙ্গীয় সমাজ, বৃহৎ বঙ্গ বাংলা পরিষদ, বেঙ্গল এসোসিয়েশন এই রকম অনেক সংঘের বিভিন্ন সাহিত্য অনুষ্ঠানে আমার যাতায়াত ছিল ।দিল্লির এই রকম সাহিত্য আড্ডাতে ক্রমশ তরুণদের আগমন কম হয়ে আসাতে আমি সোশাল মিডিয়ার ব্যাবহার নিয়ে নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে থাকি । আমার যতদূর মনে পড়ে, সোশাল মিডিয়াতেই আমার প্রথম কথা হয় বারীন ঘোষালের সঙ্গে । আর বিশেষ ভাবে কথোপকথন চলতে থাকে নানান বিষয়ে । কবিতার আড্ডাগুলোতে তার ব্যাপারে কবিদের মুখে মুখে তার আলোচনা শুনি । বিশেষকরে দিল্লি হাটার্সের দীপঙ্কর দত্ত , দিলীপ ফৌজদার, প্রাণজি বসাক, কৃষ্ণা মিশ্রভট্টাচার্যের  কাছে । এই ব্যাকগ্রাউন্ডে গল্পের পাঞ্চ লাইন ধরে শুরু করা যাক: একদিন এক রসিক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন । 

"তোমরা দিল্লি হাটার্স কে হাটার্স কেন বলো । দিল্লিহাট তো বুঝলাম । কিন্তু হাটার্স বলে তো কিছু নেই । আর দিল্লিহাটেই যদি তোমারদের আড্ডা হয়, বড় জোর তোমরা নিজেরদের 'হাঁটুরে' বলতে পারো । সেই ক্ষেত্রে তোমাদের নাম হওয়া উচিত 'দিল্লি-হাঁটুরে' " । 

সুতরাং এইখানে পাঞ্চ লাইনের জবাব হল  এই যেদিল্লি হাটার্স নামটা কবি বারীন ঘোষালের দেওয়া । কবি বারীন ঘোষাল এতটা দিল্লির সাহিত্য আকাশ ছেয়েছিলেন । দূরদেশ জামশেদপুর থেকে বাংলা কবিতা লিখলেও দিল্লিতে ছিল তার সমান উপস্থিতি । দিল্লির কবিতাকে মান্যতা দিয়ে নিজেই মিশে গেছিলেন দিল্লির সাহিত্য ধারায় । দিল্লির বাংলা সাহিত্য চর্চায় প্রচন্ডভাবে তার উপস্থিতি লক্ষ্য করেছি । চিঠি পত্র, ফোন কলস, সোসাল মিডিয়া, পত্রিকা, ব্লগজিন সব জায়গায় ছিলেন বর্তমান । বারীন ঘোষাল দিল্লি আসবেন, খবরটা প্রচার হয়ে যেতো । প্রস্তুতি চলতো কবে কোথায় কখন সাহিত্য আড্ডা হবে । জলপান হবে । জমে উঠবে কবিতা-পার্টি । দিল্লি হাটের নিমের চাতাল ছিল সেই আড্ডার কেন্দ্রস্থল । দিল্লি হাটার্স গ্রুপ নিজেরাই একটা পত্রিকা করে । এই সমস্ত জানাজানি করতে গিয়ে যে কথাটা প্রথম আসে, দিল্লি হাটার্স নামটা এলো কিভাবে এইখানে দূরদেশ জামশেদপুর থেকে আসা বারীন ঘোষালের কথা আসে । দিল্লি হাটের এক নিরিবিলি কোণে বসে সাহিত্য চর্চার ইচ্ছা জাগান প্রথমে দীপঙ্কর দত্ত । তার আগে একটা সাহিত্য গ্রুপ খুব সক্রিয় ছিল যেটা আই আই টি তে কর্মরত প্রাণজি বসাকের বাড়িতে বসতো । দীপঙ্কর দত্তের এহেন খোঁজ বাড়ি থেকে তুলে এনে গ্রুপ কে হাটতলায় বসায় । শুরু হয় সাহিত্যের জালবোনাতরুণ প্রবীণ ভেদাভেদহীন কবিদের আনাগোনা । জামশেদপুর থেকে বারীন ঘোষাল নিয়মিত দিল্লি হাটার্সদের যোগাযোগে থাকতেন । চিঠিপত্র চালাচালি হতো । আমি এই সব দেখিনি, শুনেছি । দিল্লি হাটে বসা গ্রুপদের 'দিল্লি হাটার্স' সম্বোধন করে চিঠি লিখতেন বারীন ঘোষাল । কবিতায় নানা রকম উৎসাহ দিতেন। যখন গ্রুপ একটা পত্রিকা করার সিদ্ধান্ত নিলো, পত্রিকার নাম কি হবে, নাম কি হবে বলে খোঁজ করা হয় । কবি বারীন ঘোষালের এমন ছিল করিশমা, তার কাব্য ভাবনার এমন ছিল যাদু, যাকে অতিক্রম করে অন্য কোন নামকরণ করা যায়নি সেই সময় । অস্তিত্ব আর তার সংগ্রাম, টিকে থাকা আর মাটির লড়াই নিয়ে দিল্লির সাহিত্যের এই উপাখ্যান যা বারীন ডাঙ্গার অবস্থানকে অস্বীকার করতে পারবে না । 

আমি অনেক পরে আসি দিল্লি হাটার্স গ্রুপে । সুতরাং দিল্লি হাটার্সের কবিতা আড্ডায় বারীন ঘোষালের সঙ্গে আলাপ তার পরে । এই সমস্ত তখন আমার কাছে গল্প । বয়সে তরুণ তার পরে কবিতা লিখি । সুতরাং তরুণ কবি হিসাবে বিভিন্ন ক্রিয়াকর্ম, সোশাল মিডিয়ায় প্রোমোশন, কবিতার আসরে উপস্থিত থাকা, বিতর্কে উসকানি দেওয়া এই সমস্ত ছিল আমার কাজ । আমি যে কবিতাটা বুঝি  এই  ধারনা প্রথম পোষণ করেন 'পাওয়ার পোয়েট্রি'র প্রবক্তা কবি দীপঙ্কর দত্ত । আর আমার কবিতার উপর প্রথম ভরসা করেন 'নতুন কবিতা'র প্রবক্তা কবি বারীন ঘোষাল । অথচ আমি আজও খোঁজ করে চলেছি তাদের কবিতা, চিনতে চিনতে ভুল করে ফেলছি তাদের সাহিত্য চরিত্র, জানতে জানতেই মনে হচ্ছে এরা কতই না যেন অজানা । বারীন ঘোষালের সম্পর্কে আমার পরিচয় পাকা হয়ে গেলো । আমি, একজন তরুণ কবি তার ব্যাপারেও জানলাম । বইমেলায় আমি ওনাকে আমার প্রথম কবিতার বই 'ঘুমঘর' দিলাম । উনি আমার পড়ে মতামত জানালেনইমেল করলেন । যা ছিল সৎ এবং  অ্যাজ ইট ইজ । আমার দিল্লির ফ্লাটেও উনি এলেন পরে । মধ্যাহ্নভোজন হোল ।  আমার ফ্লাটে সেদিন ডেকে নিয়েছিলাম প্রাণজি বসাক, জয়শ্রী রায়, বারীন ঘোষালের বন্ধু মিহির রায় চৌধুরী, দেবব্রত সরকার, ও ভাস্বতী গোস্বামী । আমি তখনো নিজেকে কবি বলে পরিচয় দিতে কুণ্ঠা বোধ করি । কিন্তু বারীন ঘোষাল সবার সামনে ওঠালেন আমার "পবনপুত্র" কবিতাটার কথা । সেই কবে বইমেলায় আমার 'ঘুমঘর' পড়েছেন । বারীন ঘোষাল যে তরুণ কবিদের কবিতা পড়েন এই তার প্রমাণ । আমি একটা আশার আলো পেলাম । মনে মনেই এইটা শ্রদ্ধা জন্মে গেলো । এইটাকে ‘গুরুগিরি’ বলা যায় না । এইটা আমার পাওনা । এইটা হল মেন্টরিং । সঠিক সময়ে, সঠিক বিষয়ের উপস্থাপনা । সারাদিন অনেক কবিতা আলোচনা হল । বিষয়হীন কবিতা নিয়ে ঝড়, নতুন কবিতা নিয়ে বিতর্ক, বারীন ঘোষালের কবিতা নিয়ে দুর্বোধ্যতা । আমি বুঝতে পারলাম , এই যাত্রা যা এতটা সহজ না ।

এর পরের বছর আবার দিল্লিতে এলেন বারীন ঘোষাল । চিত্তরঞ্জন পার্কে শ্যালকের বাড়িতে থাকতেন । সেখান থেকেই বিভিন্ন সফরে যেতেন । দীপঙ্কর দত্ত ফোন করে জানালেন, নেহেরু প্লেসে উনি দাঁড়িয়ে থাকবেন আর আমি গেলে দুজনে মিলে একসাথে দেখা করতে যাই । সেই মতো আমরা দেখা করতে গেলাম । আমাদের বসিয়ে অনেক গল্প হল, চা হল , কিন্তু কবিতা হল না । কবিতার জন্য জল চাই । জলের জন্য চাই নিরিবিলি বসার ব্যবস্থা । সারিতা বিহারে  হল সেই বন্দোবস্ত । চুটিয়ে কবিতা পড়া হল বারীন ঘোষালকে নিয়ে । গৌতম দাশগুপ্ত, কৃষ্ণা মিশ্রভট্টাচার্য, দিলীপ ফৌজদার, দীপঙ্কর দত্ত, অগ্নি রায় ছিলেন সেই কবিতার পার্টিতে । এই প্রথম আমি বুঝতে পারলাম, বারীন ঘোষাল আমাকেও কবি হিসাবে কাউন্ট করছেন । অথচ আমি কোনদিন ‘নতুন কবিতা’ লিখিনি । তার ‘অতিচেতনার কথা’ পড়িনি । অতিচেতনার কথা কেন তার "মায়াবী সিমূম", "লূ", "মুখস্থ ডালিম",  "গিনিপিগ একটি তথ্যচিত্র" পড়া হয় নাই ।  আমি ফেসবুকে পোস্ট দিলাম 'কবিতা পার্টি' হিসাবে । অরুণ চক্রবর্তী সেই পোস্টে লিখলেন, এই 'কবিতা পার্টি' কথাটির আমিই প্রবক্তা । বারীন ঘোষালের উপস্থিতিতে দিল্লিস্থিত কবিদের এই সব উন্মাদনা, কবিতা পার্টি, দিল্লি হাটার্স, দীপঙ্করের শূন্যকাল ওয়েবজিন, রিমা দাশের পোনা মাছের পাতুরী, অস্তনির্জনের জাহাঙ্গীর সিরিজ ছিল দিল্লিতে এক কবিতা জোয়ার । এমন কবিতাপ্রাণপুরুষ, প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব, প্রখর বিশ্লেষক, সাহিত্যানুরাগী, দিলদরিয়া মানুষের কাছে যে কোন তরুণ ,সমসাময়িক, প্রবীণ যে কোন ধরনের  কবিই ছিলেন 'স্পেশাল' এই উপমহাদেশে আমার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য উদাহরণ । এই 'স্পেশালমনস্তত্ত্ব , এক কবিবিহীন চেতনা, যা বারীন ঘোষাল কে দিয়েছিলো এক আশ্চর্য জনপ্রিয়তা । দিল্লিরও প্রত্যেকজন কবি ছিল তার সখ্য । কবিতার উপাদান । জীবন দিয়ে, ঘাম দিয়ে, রক্ত দিয়ে সেই কাব্য লিখিত হয়েছে । তা সে দিলীপ ফৌজদার হোক, দীপঙ্কর দত্ত হোক, সঞ্জীবন রায় বা রবীন্দ্র গুহ । আমরা তাঁকে পেয়েছিলাম ফ্রেন্ড ফিলোসফার হিসাবে, যদিও তিনি গাইড করাতে উৎসাহ দেখাতেন না । আড্ডা করেছেন, পান করেছেন,অসুস্থ কবির জন্য রক্ত দিয়েছেন, উচ্ছলপ্রাণ বন্ধুদের সঙ্গে  নৌকা ভ্রমণ করেছেন গড়গঙ্গাতে । রবীন্দ্র গুহের সঙ্গে ছিল দারুণ সখ্যতা ।কবি দীপঙ্কর দত্তের সঙ্গে গড়গঙ্গা ভ্রমণকালেই রবীন্দ্র গুহের সুস্থতা কামনা করে লিখলেন আশ্চর্য সেই কবিতা ।


রবিন বাবুর ঘড়ি 

১০-১০-৩৪

চোখ বড় হতে হতে আকাশ হল 

এক বিন্দু জল এঁকেছে কেউ                                                                  

চড়ক গাছ 

ছাড়ানো                                                                                              

পড়বে 

কেন                                                                                                         

মেঘ না জেটের গুমগুম ধোঁয়া ভরা 

...

...

...

ধূলো হটলে ছায়াদের আত্মপ্রতিকৃতি

ভুতুড়ে ফুল গন্ধ-অণু শোঁকা চতুস্পদে

রুমুর ঝুমুর এগিয়ে এল রবিন

উঠে দাঁড়ালো শ্রাবণের শ্রীলিঙ্গ

বৃষ্টি ফোঁটায় পরম্পরানো শুরু হল তার মোনিয়াম

#

রবিনের হারমনিগুলোর মধ্যে আমরা 

খুঁজে পেলাম শুদ্ধ রবিনকে --- থ্রি চিয়ার্স রবিন

হলোগ্রামে সে বানালো হলোশহর

এবং না বলার মতো পাজি হাসিতে উবে

সে বললো --- ভাসার চেয়ে ডোবা অনেক মজার

পড়তে পড়তে এই পড়াটা হল

এই তিনটে চিয়ার্স জেনো দিল্লী হাটে কেনা 

                  

বারীন ঘোষালের নিজের জবানীতে – “ কবিতাগুলো লিখে সবচেয়ে আগে আমি দীপঙ্করকেই দেখাই, পড়াই। সেই ২০০৪ সালের জুলাই মাস। স্বদেশদা লিখেছিলেন – ‘জুলাইয়ের ছুটি লাগে’ --- আমরা জুলাইকে ছুটি দিলাম না। রবিনদাকে ফিরিয়ে আনলাম। রক্ত দিয়ে, স্তব দিয়ে, প্রার্থনা দিয়ে, কবিতা দিয়ে।...”


এই হলেন দিলবালোকা দিল্লি, আর এই হলেন দিলকা সাহজাদা বারীন ঘোষাল । উদাহরণ হিসাবে এতক্ষন আমি যা উপস্থাপন করলাম, মোটামুটি তা আমার চাক্ষুষ দেখা উদাহরণ । সাহিত্যের অঙ্গনের এই রকম আরও অনেক উদাহরণ নিশ্চয় আছেবদনামও আছে । তাঁকে বাংলা কবিতার “ছেলেধরা” হিসাবে অনেকে অভিহিত করেন শুনেছি । কিন্তু সেই ছেলেদের কথা ভাবুন, ছেলেরা তো আর অনুসরণকারী নয়, আর বারীন ঘোষাল তাদের পাঠও দিতেন না । নিজের মতো লিখতেও বলতেন না । কিন্তু সাহস যোগাতেন । বুকে ফুঁ মেরে ভরে দিতে উদ্যম, সাহসিকতা, যে কোন তরুণ নিজেই খুঁজে নিতেন নিজস্ব লেখনীর ধারা, তথাকথিত বাংলা কবিতার আবহমানতার বাইরে গিয়ে রচনা করা এক অনন্য চিন্তার তরঙ্গকে ছুঁতে ছুটেছেন তরুণ কবিদের অনেকেই । কেউ বলেন ক্ষতি করেছেন । কথাটা ঠিক না । যে ক্ষতি হবার, সে নিজেই অন্ধ । যে কোন কবির নিজের খোঁজ থাকে । সেই সন্ধানে থাকে কোথায় বাঁধা আছে মায়ামন্ত্র । সঠিক কবিকে প্রভাবিত করা যায় না। তার জিজ্ঞাস্য মিটানো যায় মাত্র  । 


আজ এমন একটা সময়, যেখানে এদিক ওদিক চতুর্দিক কবিতার ছড়াছড়ি । সৃষ্টির বাধন ছিঁড়ে গেছে । হাজার হাজার লোক কবিতা লিখছে । দেশ দেশান্তরের ভাবনা মাউসের এক ক্লিকে এসে উপস্থিত । চিন্তাসূত্রে এসে পড়ছে ডিস্ট্রাকটর, ভালোবাসায় এসে পড়ছে স্বার্থ, সম্পর্কে এসে পড়ছে প্রতিযোগিতা, দুধে এসে পড়ছে জল, জলে এসে পড়ছে চোনা । এতদূর দিল্লি থেকে কলকাতায় গিয়ে কবিতা করা আর পোষায় না । তবু বইমেলায় যাওয়ার এক অদ্ভুত টান এসে গেছিলো । বইমেলাতে এক ধরণের ওয়ার্ম ওয়েলকাম দিতেন বারীন ঘোষাল, চিত্ত জুড়িয়ে যেতো । দিল্লি থেকে কেউ বইমেলা গেলে খোঁজ নিতেন , আমি এসেছি কি না, দীপঙ্কর এসেছে কিনা । আমি জানি আজও বইমেলায় কৌরবের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বারীন ঘোষাল । যক্ষের ধনের মতো পাহারা দিচ্ছেন । কখন দিল্লি থেকে আমরা কলকাতা বইমেলায় পৌঁছবো,  কাউকে এমন খোঁজ নিতে আমি দেখিনি । এই হল মেন্টোস জিন্দেগী, এই হলো শীল্পবন্দেগী, কবিতাযাপনের অপর প্যহলু । যার নাম মেন্টরিংমেন্টরযাপন । আজ কত বছর হল । আমার সমগ্র দেওয়াল জুড়ে তিনজন কবির মুখ । রবীন্দ্রনাথ, দীপঙ্কর দত্ত আর বারীন ঘোষাল । আমি হয়তো কোন কবিই না, কিন্তু আজ যে কথাটা বলছি, এই কথাটাও বলার মত জায়গায় আমাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন বারীন ঘোষাল ও দীপঙ্কর দত্ত । এঁদের কেউ আমাকে কবিতা হাতে ধরে শেখায়নি । কেউ সমালোচনাও করেনি আমার কবিতার । কোথাও কোন গ্রুপবাজিতে আটকে গেলে ঢাল হয়ে বাঁচাতেও কেউ আসেনি আমি একটু ভীতু প্রকৃতির লোক । একটু ভয় পাই । বুঝে উঠতে পারি না কবিতার ‘তার’ কোথায়বিদ্যুৎ কোথায়, তরঙ্গ কোথায়, স্পন্দন কোথায়, আর কোথায় তার প্রাণ । আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করি । তাঁরা উত্তরও দেন না । তাঁরা সাহস জোগান , ভরসা দেন , পাশে থাকেন । আপনা-আপনিই তার উত্তর চলে আসে । 

আজ বারীন ঘোষাল পৃথিবীতে নাই । আমাদের মতো তরুণ কবিদের কাছে এক গভীর সংকট । সাহিত্য বিষয়ক একটা জিজ্ঞাসার জন্যে কার কাছে যাই  কাকে ভরসা করি ? কে আছে সেই আপনজন ?  যাকে ভরসা করা যায়তার ধারণা নেই । যার ধারণা আছে সে খুলতে চায় না , তার নাক উঁচু তালগাছ ।  যে কবিতার প্রাংগণে একটু সিনিয়র, তার এমন ভাব, যেন সেই সেরা কবি,  সে যেন কবেই সাহিত্যে ‘জ্ঞানপীঠ’ নিয়ে ভারত সেরা হয়ে হয়ে বসে আছেন । এখন এত বিগ ম্যান, বিদ্বান,অহংকারী কবিকুলের কাছে এই সামান্য জিজ্ঞাসা নিয়ে যাওয়া অবান্তর চিন্তার সামিল । আমি এইরকম একজন মেন্টরের খোঁজে বহুবছর ছিলাম যার কাছে যাওয়া যায়, কোন ভয় থাকে না । কথা বলা যায় । বুকে জড়িয়ে নেন । বইমেলাতে ইন্তেজার করেন । একজন বিশ্বস্ত ‘খাস’ বারীনের খুব প্রয়োজন । যে হতে পারে ফ্রেন্ড-ফিলোজফার-গাইড । পথে পথে এই গরমের জ্যৈষ্ঠে পেকে ওঠা মালদা, চৌষা, তোতাপূরী, কারাবাউগোপাল খাস তাকিয়ে আছে । এত আম নিয়ে দিল্লি জনপথ থমকে দাঁড়িয়ে । সেই স্বাদের মালিক নাই । এখন আমরা কোথায় যাই ?

   


Comments