জ্যোৎস্না পারের বৃত্তান্ত
--পীযূষকান্তি বিশ্বাস
ঘোড়ার নিজস্ব রোগ আছে । রাত্রি জাগার চেয়েও ধাঁকড় বিমারী । এমন অসুখ, ঘোড়সওয়ারের স্বপ্ন ছুটে যায় । রাত্রি থেকে ঘাম ছুটে যায়। আস্তাবল থেকে দূরে, ছিটকে বেরিয়ে যায় হোমো-সেপিয়েন্স । এমন অসুখকে ঈশ্বর আর ইওহিপ্পাসকে নশ্বর করে ছেড়েছে পৃথিবীর দুরন্ত র্যাঞ্চার । প্রাগ-ঐতিহাসিক দিন থেকেই প্রেইরির সবুজ চিরে ছুটিয়ে চলেছে তারা । রাউন্ড-রক থেকে অস্টিন, অস্টিন থেকে হিউসটন, হিউসটন থেকে চন্দ্র অভিযানে । এই সভ্যতার সমীকরণে, বিভাজ্য যা কিছু তা গণিত, ভোজ্য যাকিছু তা গণিকা, ভাগশেষ যা পড়ে থাকে তা মঙ্গল । মহাকাশ যাত্রার এমন দিনে কে যে কাউ আর কে যে কাউবয় এই ঘুমঘুম চোখে ভালো ঠাহর হয় না । এহেন ভূতের অফ-বিট চিত্রকল্প আর এক স্যুররিয়াল রাত্রির এক নাছোড়বান্দা দংগল । কংক্রিটের বুকে এমনই ভার্চুয়াল যাপনে যখন একাই লিখি সোর্সকোড, কম্পাইল করি, একাই নিংড়ানি দিই, জল, মাটি, সার, দিবারাত্রি এককরে । ঠিকানা বলতে কাজ, স্বপ্ন বলতে রাত, নেশা বলতে কোড । ঘুম যায় ঐ চাঁদ । এক উন্মুক্ত কিউবিক্যাল আর কাঁচ-বন্ধ জানলা নিয়ে শারীরিক অফিস-যাপন । চিবুকে হাতদিয়ে একচোখে দেওয়াল, অন্য চোখে ডেস্কটপ । সঙ্গে থাকে জ্যোৎস্না, রাত্রিযাপনের সাথী । বাইরে হাওয়া বইছে দক্ষিণ থেকে উত্তরে, কাচের জানলায় তেরচা আলো পড়ছে লাইট টাওয়ার থেকে, আউট-কাট পশ্চিমে একটা দেওয়াল উঠে যায়, অনেক উচ্চে, কনটিউরা টাওয়ার । কোথাও কোন আস্তাবল আছে মনে হয় অথবা আশেপাশে কোথাও আস্তাবল ছিলো । জানলার ওপারে দেখা যায় মিলিওন বৎসর আগের আধভাঙা চাঁদ, আর তৃণভূমি জুড়ে ডাইনোসর যুগের সুদীর্ঘ ঘাস । শিশির এক ধ্রুবক । টাইম এক্সটেণ্ডেড টু লিমিট । মসৃণ ত্বকের উপর সাজিয়ে রেখে রেশম ঢলান , গর্দন থেকে পিছলে যায় অভিকর্ষ , বলিষ্ঠ বক্ষ নিয়ে টগবগে ঘোড়ারা এখনো জেগে আছে । এক স্বপ্নের দৌড়ের প্রতীক, শৌর্যের, বীর্যের স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে এতকাল একইভাবে দাঁড়িয়ে । ঘোড়া ঘুমায় নি । বিস্তীর্ণ প্রেইরির তৃণভূমিতে এই ইওহিপ্পাস একই ভাবে তাকিয়ে সে ঘাসের প্রতি, আর চিরসবুজ চিকন ঘাস একইভাবে তাকিয়ে ঘোড়ার প্রতি । শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে গেল । ইকো-সিস্টেমে দাঁড়ানো এক পরস্পরের অবস্থান । এক পিরামিডের মানচিত্র । উচ্চতায় এক, ভূমিতে এক, আর তির্যকে দাঁড়িয়ে আছে কাল । এতযুগ পার হয়ে গেল একুয়াস ক্যাবিলাস, এখনো সে মাত্র এক যাপনচক্র বিশেষ । অভিব্যক্তির অন্তরালে ঘোড়া এখনো দৌড়ে যাচ্ছে দেওয়ালে দেওয়ালে ।
এই কিউবিক্যালে আমি আর জ্যোৎস্না বসি । কসমোপলিটনের দিনরাত্রির ডিটেলস এ যাবার আগে একটু ভূমিকা ধরিয়ে দিই । অফিসকাছারী তো থাকেই । আমি, ওরফে একজন ক্লাউড আর্কিটেক্ট, আর জ্যোৎস্না ওরফে হাই-হিল তন্বী কাজল নয়না ইভেন্ট ম্যানেজার, পদবী জুড়ে দিলে জ্যোৎস্না শর্মা । দুধ-ধবধবে গাড়োয়াল তনয়া । কিউবিক্যাল, ওরফে, অফিসের পর্দাহীন ওপেন কেবিন । একই টেবিল । পাওয়ার সকেট, ইথারনেট কানেকশন থাকে । সকেটে ল্যাপটপ জুড়ে রাখা আছে । সামনে টাঙ্গানো রয়েছে প্রোজেক্ট শিডিউল । কিউবিক্যালে আমি আর জ্যোৎস্না । কখনো এক, কখনো দুজন । দেখি একে-অপরের ডেস্কটপ মাঝে মধ্যে যদি না ওয়ালপেপার মুখ ঢেকে ফেলে । মাল্টিমিলিয়নার প্রোজেক্ট আমাদের । গুড়গাঁও চিরে হিংস্র গতিতে ছুটে চলেছে ন্যাশনাল হাইওয়ে-আট , সেক্টর থার্টি টু । এস-ই-জেডে জলবায়ু বিহারে আমাদের অফিস । আমাদের সময় জ্ঞান দিতে প্রোজেক্টের টাইমলাইন দ্রুত এগিয়ে আসে । দেওয়ালে টাঙ্গানো আছে পাঁচ পাঁচটি ঘড়ি । দিল্লি, নিউইয়র্ক, টোকিও, দুবাই, লন্ডন । সুপার স্পীডে প্রোজেক্টের কাজ চলছে । ক্লাউড কম্পিউটিং আর অফিস ডিজিটাইজেশন । বেহতরীন ইন্নোভেশন । পৃথিবীর আধুনিকতম প্রযুক্তির যোগসাধনা । হাই প্রোফাইল প্রোজেক্ট টুয়েন্টি ফোড় বাই সেভেন, এক্রস দ্যা গ্লোব । বিলিয়ন ডলার ইনভেস্টমেন্ট । মূলত: ক্লাউড মাইগ্রেশনের কাজ করি আমরা । আমিই মাইগ্রেশন লিড করি । ক্লাউড আর্কিটেকচার বানাই । আমার টিম মেম্বারদের কেউ আমেরিকা, কেউ দুবাই, জাপান ইংল্যান্ডে কাজ করে । সার্ভারে সার্ভারে টিক টিক করছে হার্ট বিট , যার জিন রয়েছে সুদূর যার সদরদপ্তর আরমংক, নিউ ইয়র্কের ডাটা সেন্টারে । আর দিল্লি এন-সি-আরের প্রজেক্ট অফিসের দেওয়ালে দেওয়ালে টাঙ্গিয়ে দেওয়া হয়েছে ঘড়ি । ডি-এল-এফ টাওয়ারের উপরে ঐ নেভিগেশোনাল লাইট দেখা যায় ! রাত্রিযাপনের অভিজ্ঞানে এখন দিল্লির ঘড়িতে বাজে রাত এগারোটা উনত্রিশ ।
অথচ এইটাই বিজনেস আওয়ার । পিক টাইম । বিজনেস সামলাতে আমার একজন ইভেন্ট ম্যানেজার লাগে । ক্লায়েন্টের সঙ্গে থাকে লাগাতার বাতচিত করতে হয় । মিটিং, কলস, ভয়েস, টেক্সট, অনস্ক্রিন প্রেজেন্টেশন, সেমটাইম চ্যাটিং তাকে সামলাতে হয় । ম্যানেজ করতে হয় সুদূর আটলান্টিক । জ্যোৎস্না ইভেন্ট ম্যানেজারের কাজটা করে । অফিস ফ্লোরে কোন দেওয়াল বা পর্দা দেওয়ার চল নেই । আমাদের ওপেন কিউবিক্যাল । ওপেন নামের সঙ্গে একটা ম্যানেজমেন্ট আট্যায়ার লটকে থাকে । যেমন থাকে ব্যাজ । ব্যাজ মানে, চৌম্বকীয় পট্টি লাগানো পরিচয় পত্র । গেট খুলে ভিতরে প্রবেশের আইডেন্টিটি । আইডেন্টি গলায় ঝোলানো জ্যোৎস্না জেন্ডার ইন্ডিপেন্ডেন্ট একটি রোল । জেন্ডার এটাচ করলেই ঘটে যায় বিপত্তি, বড্ড ডিস্ট্রাকটরের কাজ করে । অফিস-কর্মে ব্যাঘাত ঘটায় । রোজি-রোটির উপরে তুলে দেয় কঠিন প্রশ্ন । কিউবিক্যালে, তাই চেষ্টা করি ওর বুকের দিকে না তাকাতে । আই কার্ডেই ওর মুখ দেখি । ওর ঠোটে ঘন লিপস্টিকের আবরণ, ভ্রূ প্লাক করা, পায়ে হাই হিল, উর্ধাঙ্গে টাইট টপ, নিম্নাঙ্গে মিনি স্কার্ট । দেখতে চাইলে অনেকটাই লং লেগ দেখা যায় । বড় মন দিয়ে কাজটা করে মেয়েটা । প্রতিটা ক্লায়েন্ট কলে আমাকে সাপোর্ট দেয় । ওর গ্রে ম্যাটারে একটা ন্যাচারাল ইন্টেলিজেন্স, ওর চোখে হাজার পাওয়ারের ঝিলিক ।ওর মুখে ভেসে ওঠে হাডসনের ঢেউ, ওষ্ঠে খেলে যায় লাস-ভেগাসের লাস্যময়ীতা । ওর কাজল চোখের সন্ধ্যা আলোয় আমি সূর্য ডুবে যেতে দেখি । দিনের ক্লান্তিতে মেপে দেখি কর্মজীবনের প্রবহমানতা, রাত্রিযাপনের নিঃসঙ্গতা আর দ্রুত খতম হতে থাকা চল্লিশের কথা । মধ্য জীবনের বসন্ত থেকে দ্রুত পাতা ঝরে যায় । রাত আসে । আহা, রাত, পর্ণমোচী রাত, যেখানে ভাঙ্গতে চাই শিল্পের সীমানা আর সুপার ফাস্ট ক্যারিয়ার থেকে চাই ক্ষণিক স্থিরতা , যান্ত্রিকতার থেকে চাই একমুহূর্তের মুক্তি । জব ক্যারিয়ার নাকি ব্লাকহোল ? গর্দনের উপর সদা লটকে থাকে তলোয়ার । যার কোন খাপ নেই, খাম নেই, খেয়াল নেই । কখন যে খসে যায় পান থেকে চুন, কখন যে বেরিয়ে পড়ে এডামেন্ট ডিফেক্ট, কখন যে এস্কেলেট হয়ে যায় ক্লায়েন্ট । আর সুরক্ষা বলয় থেকে এক্সপোজ করে দেয় পিঙ্ক স্লিপ । বিভীষিকাময় কর্পোরেটের কখন যে অচানক পুঙ্গি বেজে যায় ।
জ্যোৎস্নাকে দূর থেকে বার্বি ডল লাগে । কাছ থেকেও বোধহয় তাই । অথচ তিন হাত দূরত্বে সে যখন গালে হাত দিয়ে কাজ করে , কল সামলায়, ক্লায়েন্ট ম্যানেজ করে , খিলখিল করে হেসে ওঠে । গালের উপর লালিমা খেলে যায়, ওষ্ঠে লেপটে থাকে কেটে রাখা দুটি রেড চেরির ফালি । মনে হয় কোমল পদ্মপাতার জ্যোৎস্নাকে একটা চুমু খাই । জ্যোৎস্না কথা বলে চলে ঘড়ির মতো টিক টিক, ভিতরে ভিতরে সে যেন নমনীয় হয়ে আসে । এইরাত্রি, এতো গোপন রাত্রি তার ভিতরে এতো সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে । ও তা নিজেই জানে না । প্রোজেক্টের কাজে দেরী হয়ে যায় । মাল্টি-ন্যাশনাল, মাল্টি-জিওগ্রাফিকাল কল থাকে । এই কিছুক্ষণের ভিতরেই একটা মিটিং আছে । একাউন্ট সফটওয়ারের মডুউলে একটা ডিফেক্ট এসেছে । ক্লায়েন্ট বার বার বলছে, হাই প্রায়োরিটি বাগ, সিভিয়ারিটি-ওয়ান ডিফেক্ট । টেবিল চাপড়ে বলছে, এখুনি এর ফিক্স দিতে হবে । হায়, সমস্তই তো হাই প্রায়োরিটি, ক্লায়েন্টের প্রত্যেকটি কলই ইম্পরট্যান্ট । এখুনি করে দিতে হয় । যখনতখন । দিবারাত্রি । ভিতরে ভিতরে ভাঙ্গছে জ্যোৎস্না , ভিতরে ভেঙে যাচ্ছি আমি । আজও বোধহয় ক্লায়েন্ট ডেলিভারিতে লেট হয়ে যাবে । রাত বাড়ছে । মনে মনে বলি দূর ছাই, গুলি মারি এই চাকরি । বাইরেও একটা পৃথিবীী আছে। যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন । ব্যাল্যান্স বিগড়ে যাচ্ছে । সংসার কল্পনায় ছিঁড়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে বিবেক । সমাজকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, পরিবার কে দেওয়া বিশ্বাস, কোম্পানিকে দেওয়া অঙ্গীকার, আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে । ডেস্কটপের দিকে তাকাই । স্লিপ সিগন্যাল, স্ক্রিনের পিক্সেলে বাতি নিভে গেলো । বাইরে জেগে আছে ল্যাম্প পোস্ট , ক্যাফেটেরিয়ার জানলায় নীলাভ আলো । কাকে কি কথা বলি । কাকে মনের কথা বলি ? ক্লায়েন্ট কলকে প্রায়োরিটি দিতে দিতে নিজের কথা শেষ, আই-কার্ড দেখে দেখে শুক্র-থলী শুঁকিয়ে গিয়েছে । তবু দেখি জ্যোৎস্নার আই-কার্ড । পাশে রাখা বোতল থেকে একটু জল খায় জ্যোৎস্না । নেক্সট মিটিঙের জন্য পি-পি-টি রেডি করে রাখে । তার ডেস্কটপে উকি মেরে দেখি । ওয়ালপেপারে প্যারালাল দৌড়াতে থাকা তিনটে ঘোড়ার একত্র ছবি । ব্যাকগ্রাউন্ডে সবুজ তৃণভূমি । ঘোড়া । সাদা, দুধ-ধবধবে, মসৃণ ত্বক, টগবগে শরীর । জিজ্ঞাসা করেছিলাম একবার – “এই ঘোড়াগুলোর কি মানে ? ডেস্কটপে কেন লাগিয়েছ ? এর কি নিজস্ব কোন কারণ আছে ?” জ্যোৎস্না চোখের ভিতর গভীর চোখ ঢুকিয়ে বলেছিল, “এক্সকিউজ মি !” । দেখছিলাম তার হাত কাঁপে, হাতের রোম খাড়া হয়ে যায় । যথারীতি তাই জানা হয় নাই , এই তেজস্বী ঘোড়ার সঙ্গে সাথে রাত্রিযাপনের কোন সম্পর্ক আছে কি না । নারীর শারীরিক জীবনচক্রে তার ভূমিকা কী । নোটিফিকেশনে পপ আপ আসে, এখুনি মিটিং শুরু হয়ে যাবে । ঘড়ির কাটায় এখন আই-এস-টি, এগারোটা আটান্ন । আই-এস-টি টাইম মানে প্রকৃতই ধরে নেবার দরকার নেই যে মাঝরাত, পৃথিবী ঘুরে আসছে আহ্নিকগতির অনুকূলে । নিউইয়র্কে দুপুর গড়িয়ে দুটো আটাশ । সকাল হচ্ছে জাপানে তিনটে আটাশ । দেওয়ালে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পাঁচটা পাঁচটা টাইম-জোন । আকাশকে মেঘে ঘিরে ধরেছে । অফিস চত্বরের লাইনে লম্বা লম্বা দাঁড়ানো ইউক্যালিপটাসের পাতার ভিতর দিয়ে ঘোড়ার চালে দৌড়ে যায় পাগলা হাওয়া ।
রাত বাড়ে, বাড়ছে রাত্রির নেশা , শালা পাগলা হয়ে আছে ওয়ার্ক্যালহোলিক ভেটেরান ভাইস প্রেসিডেন্ট । খুব ইম্পরট্যান্ট ডেলিভারি চলছে । লাইভ যাচ্ছে মাইগ্রেশন । সিনিয়র ম্যানেজমেন্টদের কেউ বাড়ি যায়নি আজ । যেনতেন প্রকারেণ আজ লাইভ যাবে প্রোজেক্ট । বোর্ড-রুম শাসন করা সাম্রাজ্যবাদী ভাইস প্রেসিডেন্ট আর টপ ম্যানেজমেন্ট, একজোটে হালুম করার অপেক্ষায় । আউটলুক এক্সপ্রেসে বাড়ছে আন-রেড ইমেলের ভিড়, ইমেলের ভিতরই রয়েছে সর্ষে । ভূত । মেল খুললেই রয়েছে একটার পর একটা টাস্ক । একটা টাস্ক ফেল হলেই শালা, চার্জ । জব্বর বাঘের হালুম । প্রোজেক্টে আগুন ধরে যায় । যে কোন সময় যে কেউ ফায়ার হয়ে যেতে পারে । ফায়ার ওরফে চাকরি থেকে খাল্লাস । এক একটা মেল তাই হাড় হিম করা পলিটিক্স । ধমনীতে এক গঙ্গা আড্রিলানিন বয়ে যায় । রক্তচাপ বাড়ে । এমনি এমনি কি শালা মু-মাঙ্গা স্যালারী আসে ? ডলারের পর ডলার । ডলার একটা মস্ত বড় পলিটিক্স । এটা কোন নাইট শিফট নয়, এটা কোন অফিস আওয়ার্স নয় । তবুও প্রত্যেক ব্যক্তিকে এজাইল হয়ে উঠতে হয়, ব্যক্তি ব্যক্তিকে অতিক্রম করে । ব্যক্তি ব্যক্তি কে ঘৃণা করে । ব্যক্তি ব্যক্তি কে পণ্য করে । একটুকু সুবিধের জন্য মানুষ মানুষের লাইন কেটে দেয় । পুঙ্গি বাজিয়ে দেয় প্রিয়তম দোস্তের । এখানে কেউ কাউকে জোর করেনা । এলজিবিটি এগ্রিমেন্ট সাইন করে ঢুকতে হয় পে-রোলে । সাইন করতে হয় নো হ্যারাসমেন্ট ক্লজ । নিজেরাই খুলতে হয়, অ্যাসপিরান্টরা নিজেরাই মুখ খুলে চাকরিতে আসে । যত বড় হা, তত গুচ্ছ ডলার দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় মুখ । কোন ব্লো জবের সিন নেই । স্মল স্টেটমেন্ট, স্মল টক । না বলার রাস্তা নাই । আমার এই হলো কর্মজীবন , এই হলো রাত্রিযাপন আমার রোটি, কাপড়া , মকান । আমার মতো দিনরাতজাগা কর্মচারীর সংখ্যা বাড়ছে, পশ্চিমের দেশের আউটসোর্সিং বাড়ছে । বিজনেস ইভেন্ট খুবই কমপ্লেক্স হয়ে যাচ্ছে । ম্যানেজ করা মুশকিল হয়ে পড়ছে । তবুও এস্ট্যাবলিশ করছি নিজের সংগ্রাম । ঘমাসান জারি । দাগ রেখে যাচ্ছি জমিতে । রাত বাড়ছে । চাঁদ বাড়ছে । সমস্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে অজস্র জ্যোৎস্না । প্রত্যেকটি জ্যোৎস্নার মত, আমি নিজেই রিপ্লিকেট হচ্ছি । জ্যোৎস্নার জ্যোতি ছড়িয়ে পড়ছে টেবিলে টেবিলে, ডেস্কটপে, ওয়াইফাই, ইন্ট্রানেট, ইন্টারনেটে । সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়ালে ওয়ালে ছায়াময় ছড়িয়ে যাচ্ছে জ্যোৎস্নার উদ্ধত বক্ষের আত্মবিশ্বাস । জ্যোৎস্না যেন নিজেই একটা স্টেটমেন্ট । আমার বানানো ক্লাউড আর্কিটেকচারে জ্যোৎস্না ফুটপ্রিন্ট ছড়িয়ে যায় ।
ক্লায়েন্টের মেল আসে, নোটিফিকেশন আসে । প্রোজেক্টের লাইভ আপডেট চলছে । প্রোডাকশন যে কোন সময় আপ হবে । স্মোক টেস্ট পার হয়ে গেলে ক্লায়েন্ট হ্যান্ডওভার। কারো পায়ের আওয়াজ পাই । জ্যোৎস্না এসেছে পায়ে পায়ে । “স্যার, থ্রি সেভ ওয়ান , উই নিড হট ফিক্স, ইম্মেডিয়েটলি ” । কোন সিভিয়ার ডিফেক্ট হবে । আমি ওর মুখের দিকে না বুকের দিকে তাকাই । নজর কোথায় রাখি । সাবোর্ডিনেটদের আমার বোধহয় এতটা কাছ থেকেও দেখা ঠিক না । গাছ দেখি না তাল দেখি । সাবোর্ডিনেটদেরকে জেন্ডার ডিটাচ করে দেখা উচিত । কিন্তু জ্যোৎস্নার শরীরের গন্ধ আলাদা । ওর কাছে আসা, কিউবের চেয়ার টেনে বসার মধ্যে একটা দোটানা । ফিক্স বড় না সেক্স ? ওকে কি ছুঁয়ে দেখা যায় ? না । জয়েনিং লেটারে ওয়ার্ক প্লেস হ্যারাসমেন্ট ক্লজ রয়েছে । রোটি বড়ই বিচিত্র হে । রোটি ও হ্যারাসমেন্ট ক্লজ আমাকে রাখে ভার্চুয়াল করে রাখে । ভার্চুয়ালি আমার মন দোলে, তন দোলে । তার আওয়াজ, তার হতাশা, তার অস্ফুট অধরে আটকে থাকে বক্তব্য , তার গ্রে ম্যাটারে আটকে থাকে ক্লায়েন্ট ওরিয়েন্টেশন । আমার ক্লাউড আর্কিটেকচার তার থট প্রসেসে প্রবাহিত হচ্ছে । কিউবিক্যালে দুজনের চেয়ার পাশাপাশি । এটাই আমাদের যাপন-এলাকা, কফি-শপ, ক্যাফেটারিয়া । কোথায় বাড়ি জ্যোৎস্নার ? একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম । পাহাড়ি মেয়ে জ্যোৎস্না । পউড়ি গাড়োয়ালে এক পাহাড়ের উপরে তার গাঁও । আমি একজন টেকি । আমার কাজ হলো উপর উপর মাইগ্রেশনের পলিসি ও স্ট্রাটেজি নির্ধারণ করা । রিকোয়ারমেন্ট নেওয়া, সফটওয়ার ডিজাইন বানানো, ক্লায়েন্ট ডেলিভারি । ক্লায়েন্ট আমাকে বিলিং দেয় । বিলিং বোলে তো, আমার কোম্পানির জন্য তাঁরা খরচ করে । অনেক টাকা । ক্লায়েন্ট আমাদের দেয় মিলিয়ন ডলার । টাকা দিয়ে ক্লায়েন্ট আমাদের মুখ বন্ধ করে দেয় । আমরা কাজ করি । ক্লায়েন্ট আমার ঈশ্বর । ক্লায়েন্টের কল আসে । ক্লায়েন্টের বাড়ি টেক্সাস । ক্লায়েন্ট কে বানিয়ে দেওয়া সফটওয়ারে ডিফেক্ট এসেছে । প্রোজেক্ট আজ লাইভ যাচ্ছে । ডেড লাইন পার হয়ে যাচ্ছে । ক্লায়েন্ট বড় চিন্তিত, তার চেয়ে বেশী চিন্তিত আমার ভাইস প্রেসিডেন্ট । আমাকে গিলে, চাবিয়ে, পিষেই ফেলে মনে হয় । তড়িঘড়ি সিচুয়েশন সামলাতে, ক্লায়েন্ট কলে যাচ্ছি আমরা, ঘড়ি কাটায় এখন রাত বারোটা , জি এম টি টাইমে সন্ধ্যা আট । লন্ডনে রাত্রি নেমেছে ।
মাঝে মাঝে ঠোকাঠুকি লেগে যায়, আগুন জ্বলে না । জ্যোৎস্নার ভিতর আগুন, অন্দরমহলে জ্বলে যায় তার দুরন্ত শিখা । জ্যোৎস্না যেন এক সফটওয়ার । এই রূপ যৌবন নিয়ে রাত্রিকে জ্যোৎস্না আলোকিত করে, পুলকিত করে । আমার ঠিক জানা নেই জ্যোৎস্না কারো বধূ কিনা, কারো প্রেমিকা কিনা । শুধু এইটুকু আমি জানি, ল্যাপটপে আমি ডিজাইন বানাই, তাতে জ্যোৎস্না ঢেলে দেয় মধু । জ্যোৎস্না আমাকে একদিন সত্যিই ডেস্কটপের ওয়ালপেপারের তিনটি ঘোড়ার রহস্য শোনায় । স্বপ্নের ভিতর দৌড়াতে থাকা এই ঘোড়াগুলোর কথা সে বলে । তেজী, স্বাস্থ্যবান, পেশীবহুল অশ্বের কথা । আস্তাবল ভেঙে টগবগিয়ে আসছে যেন তার স্বপ্নের ভিতরে । সেখানে রাত্রি নেই, ক্লায়েন্ট নেই, ক্লাউড নেই, ডিফেক্ট নেই , মিটিং নেই । শুধু আছে যোনীর ভিতরে খসে যাওয়া জলের জীবনচক্র , সুষুম্নাকাণ্ডের সামগ্রিক অবচেতনা । মনস্তত্ব । আমি জানি, এসব আমারই ভার্চুয়াল রূপ, আমারই সোর্স কোডে লেখা সফটওয়ার । ভার্চুয়ালকে চিনতে আমার কষ্ট হয় । আমাকে ফিরতে হবে ফিজিক্যালে । এইসব কৃত্রিম মায়াজাল । রক্ত নাই, মাংস নাই । ভার্চুয়াল অবয়ব থেকে আর্কিটেকচার বের করে এনে তাতে স্থাপন করতে হবে রক্ত, সিক্সপ্যাক করে তুলতে হবে মাংস । যেখানে রাত্রির উপস্থিতি নেই, ডলারের দবদবা নেই । সেখানে ঘুম থেকে স্ট্রেয়েট বাইরে ছিটকে আসবে ধবধবে লালসা । এইখানে সজাগ প্রহরীর মতো লিড করে বের করে আনতে হবে ডিফেক্ট ফিক্স, কোডের ভিতর কোড, সোর্সের ভিতর সোর্স ।জ্যোৎস্নাকে খুব খেটে কাজ করতে হয়, জবাবদিহি করতে হয় । সমস্ত ডিফেক্টের রুট কজ এনালাইসিস দিতে হয় । আজও তার সমস্ত জবাব দিলো । মিটিং শেষ হল । সাকসেসফুল মাইগ্রেশন । গো-লাইভ ডান । এক্সিলেন্ট জব । আমার মুখেও তৃপ্তির হাসি । ক্লাউড থেকে ডাউনলোড হচ্ছে বাইটস । মেগা বাইটস, গিগা বাইটস, টেরা বাইটস, পেটা বাইটস । ডাটা ট্রান্সফার হচ্ছে সোর্স থেকে টার্গেটে বিদ্যুৎ গতিতে । ভাইস প্রেসিডেন্ট ও খুশ । ছুটি হবে এখন । এইবার বোধ হয় আমরা আজকের মতো সাইন অফ করতে পারি । রাত এখন দুটো বেজে পনের মিনিট ছত্রিশ সেকেন্ড । ক্লায়েন্টও খুশ হবে । টেক্সাসের তৃণভূমিতে ফুল ফুটেছে ম্রিয়মাণ রোদ্দুরে । সেখানে বিকেল পাঁচটা ছয় ।
এবার দীর্ঘ রাত্রি-সেবার শেষে বাড়ি ফেরার পালা । ব্যাগ, ল্যাপটপ গুছিয়ে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে চলি আমি আর জ্যোৎস্না । ট্যাক্সির ডিমান্ড দিই । ক্যাব আসতে টাইম লাগবে । ততক্ষণ কফিও খাওয়া যায় । কতটা রাত হবে এখন, আড়াই, বা তিন ? সমস্ত দেশ, উপমহাদেশ ঘুমিয়ে অচেতন, তাদের গভীর স্বপ্নময় জগতে ঘিরে রয়েছে আচ্ছে দিনের স্বপ্ন । এদিকে আমি আর আমার টিম দুঃস্বপ্ন নিয়ে রাত্রিব্যাপী প্রতিদিন লড়ে শহীদ হয়ে যাচ্ছি । লড়াই আমাদের ডলারের সঙ্গে, নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে , লড়াই নিজস্ব যৌনতার সঙ্গে । লড়াই আমার আন্তঃ-প্রজাতির, লড়াই আমাদের ক্ষিপ্রব্যাঘ্রের মুখের থেকে হরিণ ছিনিয়ে আনার । কি কফি খাবে জ্যোৎস্না ? আমি বলি ক্যাপাচিনো, নাকি ক্যাফে লাটে ? ভারতীয় মুদ্রায় একশো ষাট । ডলারে, মাত্র ‘দু’ ডলার । দুই সমানুপাতে একশো ষাট । সমীকরণ অনেক কথা বলে । গরম কফি হাতে নিয়ে আমরা অপেক্ষা করতে থাকি ক্যাবের । রাতের ট্যাক্সি । ক্যাবে জ্যোৎস্নাকে একা ছাড়া যাবে না । অফিসের নিয়ম নেই । রোজকারের মতো ওকে এসকর্ট করে পৌঁছে দিতে হবে ওর বাড়ি পাঞ্চশীল এনক্লেভ । কিছু কথা বলার অবকাশ পাচ্ছি । জ্যোৎস্নাই শুরু করে ।
“আজও লেট হয়ে গেলো । তবে গো-লাইভ তো ডান । এইবার ছুটি চাই স্যার, টু উইকস । এবার ছুটিতে ক্রুজে যাবো । ঠিকানা, জিব্রাল্টার থেকে পশ্চিম উত্তর আফ্রিকা ।” বলল জ্যোৎস্না । আমি হাসি, মনে মনেই হাসি ।
“ওহ ! ইয়েস, শিওর । ক্লায়েন্ট একবার ইউজার একসেপটেন্স সাইন করুক” – আমি আর কি রিপ্লাই করি । প্রোজেক্টে কাজের লোক দরকার । এ মুহূর্তে আমার কাছে জ্যোৎস্না একজন ইভ , আর ক্লায়েন্ট একজন ঈশ্বর । আমার কাছে আপেল বড় না গাছ বড় সেইটা বড় প্রশ্ন ।
“এইবার স্যালারিটা স্যার, বাড়িয়ে দিন স্যার । ক্লায়েন্ট কে বেস্ট ডেলিভারি দেবো, আর আপনাকেও খুশ করে দেবো” – জ্যোৎস্না বলে । আমি ভাবি, কার খুশী যে কোথায় ? আমি তো আজও জানতে পারিনি । আপাতত কফির চুমুকে আমি একটা উত্তাপ বোধ করছি । আপেলেও কি একটা কামড় দেওয়া যায় ?
“কেন, এখন যেটা পাচ্ছ, এটাও তো কমপিটিটিভ, ভালোই স্যালারি পাচ্ছ ।”- একটু ডিপ্লোম্যাটিক জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলাম ।
“স্যালারী, মাই ফুট ! দিস ইজ জাস্ট পিনাটস্ ”- ঘেমে ওঠে জ্যোৎস্না । “বাজারে আগুন, আসবাবে আগুন, সবজীতে আগুন, পেট্রোলে আগুন, ডু ইউ ফলো দিস ? ” । পঞ্চমীর চাঁদ কখন যে ডুবে গেছে খেয়াল করিনি । জ্যোৎস্নার এক অন্য আগুন , আগুনের গোলা ফেটে যায় যখন তখন । কোথাও তার ছিঁড়ে যাচ্ছে, কোথাও সিগন্যাল কম হয়ে আসছে ।
“দেখো, এইটাই হলো ইন্ডিয়া, বিবিধতার মধ্যে একতা, আমরা রাত জাগছি, কোথাও দিন হচ্ছে, কোথাও দুপুর হচ্ছে, কোথাও বিকেল, কোথাও সন্ধ্যা নামে । কেউ অনেক কামাচ্ছে, কারো নুন আনতে পান্তা ফুরায় । তোমার উপর দেশের নাগরিকগণ অনেক ভরসা করেন ” – আমি যখন ফিজিক্যাল থেকে আবার ভার্চুয়ালের দিকে টার্ন নিতে যাচ্ছি । আরও একটু পলিটিকাল কারেক্টনেসের দিকে ।
“ফক দ্য দিন, ফক দ্য নাইট, হোয়াট ক্যান আই ডু, আমি রাত জাগি আর তোমরা ঘুমাবে ? আর চব্বিশ বাই সাত না ঘুমিয়ে তোমাদের ঘুমন্ত বিচি চাটবো?”- জ্যোৎস্নার আগুন বুঝি সামনে চলে আসে ? আমি এতই উত্তাপ অনুভব করি , আগুন কি বোধ হয় হাতের নাগালের বাইরে চলে যায় ?
“এই দেশের ওরাও তো নাগরিক, ওরা তোমার ভাই, বোন । ওদের চোখ মুখ নাক, আমাদের মতো, ওদের ভোট আর আমার ভোটের মান এক, বরং মার্কিন পুঁজিবাদের দালালের মত কথা তোমার মুখে মানায় না । ” – এই হলো আমার চরম ভার্চুয়াল হয়ে ওঠা । গোললাইনের উপর থেকে ক্রমাগত রোনাল্ডোর ফ্রি-কিক ডিফেন্ড করে যাওয়া ।
“তবে শোনো, মাই ডিয়ার আর্কিটেক্ট, মাই ফুট তোমার ভোট, মাই ফুট তোমার আর্কিটেকচার । পুঁজিবাদ পুঁজিবাদ করে, মিটিং মিছিল করে, প্রতিবাদ করে, কবিতা লিখে, গান গেয়ে বালের আর্কিটেকচার দাঁড় করানো যায় না । তার জন্য চাই রাত জাগা । সকালে উঠে ফির সে কাজে ফেরা । দিনকে রাত, রাতকে দিন করা । বিছানা বিছানায় বীর্য স্খলন করে বিপ্লব আনা যায় না । বিপ্লব আনুন শিল্পে, বিপ্লব আনুন চিন্তায়, বিপ্লব আনুন বিজ্ঞানে, বিপ্লব আনুন চেতনায়, সমাজ সমাজ করে গাঁড় মেরে রেখেছেন সমাজের । বেশতো রাতভর ঘুম দিচ্ছেন সমস্ত উপমহাদেশ জুড়ে, সৃষ্টি কি করে করবেন ? ডলার, স্যার, ডলার কোথা থেকে আসবে ? পুঁজিবাদ শেখাচ্ছেন ? ডোন্ট টিচ ইওর ফাদার হাও টু ফাক ।”- এই বার বুঝি আর বাধ মানে না প্লাবনের । জ্যোৎস্না আগুন বৃষ্টির মতো বরষে পড়ে অঝোরে । কফি টান দিয়ে ফেলে একটা সিগারেট ধরায় জ্যোৎস্না । আমাকেও একটা দেয় । আমি সিগারেট খাইনা । মানা করে দিই ।
“তা বলে, আমার পিতা, পিতামহ, ভিটের প্রতি দেওয়া অঙ্গীকার, অগুনতি গরীব ভাই বোনেদের কথা... জ্যোৎস্না এটাও তো তোমার দায়িত্বের ভিতর পড়ে ”- শেষ অব্ধি বলেই ফেললাম সামগ্রিকতার কথা ।
“এই সব বাল বিচি আপনি নিয়ে আর্কিটেকচার বানান ? তো কিকরে ক্লায়েন্ট কে খুশ করবেন ? ” – সুখটান দেয় জ্যোৎস্না । দাঁত বের কর হেঁসে ওঠে জ্যোৎস্না । খিলখিলয়ে ।
জ্যোৎস্না , আমার সঙ্গে ডিস-এগ্রি করে, সে করতেই পারে । তার সাইকোলজিক্যাল কোশেন্ট আমার সঙ্গে মেলেনা , আমিও তো মিলি না কারো সঙ্গে । কেন যে আজও উপড়ে ফেলতে পারিনি মাটির টান । লাল, সোনাঝরা মাটি, ব্রাউন ল্যাটেরাইট । আমার রক্তে রক্তে তারা আমার দিনমজুর পিতার কথা বলে, বলে যায় বিক্রি না হওয়া দোকানির দ্রব্যের কথা । মনে মনেই আমি সিদ্ধান্ত নিই, আমার প্রোজেক্টের জন্য জ্যোৎস্না ঠিক ব্যক্তি নয় । যার শোচ ইতনা গন্দা, যার ভাষা এতো ব্লান্ট, যার মুখে চুমু খেতে গেলে আসে সিগারেটের গন্ধ ।আমি একজন ভদ্র-সভ্য সমাজের আর্কিটেক্ট, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির অফিস রিপ্রেজেন্টেটিভ ! আমার একটা স্ট্যান্ড নেওয়া দরকার । জ্যোৎস্নাকে আমি মনে মনে প্রজেক্ট থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবি । ফায়ার করেও দেওয়া যায় । ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে ট্যাক্সি এসে গেছে । পাঞ্জাবি ড্রাইভার । হলুদ নাম্বারের ট্যাক্সি । পেছনের গেট খুলে দেয় । আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে । আমরা পিছনের সিটে বসি । জ্যোৎস্নার মিনি স্কার্ট । ড্রাইভার ট্রেনিং দেওয়া । তাকায় না । কথা বাড়ায় না । এক্সিলেটরে চাপ দেয় সে । ট্যাক্সি ছুটতে শুরু করে রাত্রির অন্ধকার বিদ্ধ করে ।
জ্যোৎস্নাকে নামিয়ে দিতে হবে ওর বাড়ি পাঞ্চশীল এনক্লেভ । অনেকটা রাস্তা । আমার পৌরুষের কাছে এটা একটা হিরোয়িক হাতছানি । জ্যোৎস্নার গায়ের গন্ধ আসছে । রহস্যময় মাংসের গন্ধ । তীব্রতর হচ্ছে ঘ্রাণ । বাতাসে দিল্লির আবহাওয়ার উসকানি, চাঁদ ডুবে গেছে অদ্ভুত আঁধারে । আসলে, সমস্ত আপেক্ষিকতার এই রাত্রি-জীবন, নৈশ-প্রহরা, নিশিযাপনের কাছে রক্তমাংস নিজেই আপেক্ষিক, সময়য়ের তরঙ্গে কেউ হয়ে উঠছি প্রক্সি, কেউ হয়ে উঠছি গেটওয়ে , কেউ বা ভার্চুয়াল । শারীরিক ছন্দের যে গন্ধ আছে, তা হয়ে উঠছে কাল্পনিক, অর্থ হয়ে উঠছে ডলার আর ইকো হয়ে উঠছে হার্ট-বিট । এখানে গলে যাওয়া মোম আর রক্তে মিশে যাওয়া ভায়াগ্রা সমস্তটাই ভার্চুয়াল, হাতে হাত মেলাচ্ছি নিউরনে নিউরনে, ওভার দ্যা আটলান্টিক সেক্সুয়াল কন্টাক্ট হচ্ছে স্কাইপ কলে, চুমু ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছে ফাইবারে । ফের জুড়ে যাছে ওয়াইফাই এর মাধ্যমে । সুতরাং বলা যার জ্যোৎস্নার সঙ্গে এই মুহূর্তে আমার দূরত্ব নাই । যে কোন সময় আমি দু-আঙুল ঢুকিয়ে দিতে পারি জীবন্ত ধোঁয়া-ওঠা ভিসুভিয়াসের অতলান্ত গভীরে । যে কোন মুহূর্তেই ঢেলে দিতে পারি সফেদ নায়াগ্রার গতিময় জলপ্রপাত । শুধু এই হাইপোথ্যালামাসে যে অবিরত পারমুটেশন আর কম্বিনেশনে দৌড়ে বেড়াচ্ছে , এরাই জন্ম দিচ্ছে বিভিন্ন এলগোরিদমের । যে কোন মঙ্গল বা শনি বা বুধের প্রভাবে ছুটে যেতে পারে বন্দুক থেকে গুলি আর নিমেষেই ফুড়ে দিতে পারে পাম্প দেওয়া বেলুনের মতো ফুলে ফেঁপে ওটা প্রাকৃতিক ডিম্ব-থলি । সম্ভব , অবশ্যই সম্ভব । যে কোন এক্স ওয়াই জোড়া, তা বিভাজিত হয়ে , জোড় বাঁধতে যেতে পারে ওয়াই ওয়াই, কিংবা এক্স ওয়াই । আমি এই আবর্ত থেকে দূরে নই । জ্যোৎস্নাকে এক্স ওয়াইএর একটা সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে রেখে আজকের মতো আমি সাইন অফ করি । হাইওয়ে বরাবর স্ট্রিট-লাইট জ্বলছে সারি সারি । একটা ডট ডট রেখা দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে পিছনে । টেক্সাসে বিকেলের রোদ শেষ হয়ে এসেছে । ফুলের রঙ থেকে ঠিকরে আসছে আগুনের রং । টগবগিয়ে ফুল ফুটছে থরে-বিথারে, ব্লু আস্টার, স্মল সানফ্লাওয়ার, অ্যারো, পেরেন্নিোলস, রক ক্রেস, মিল্কঊইড ও নানাবিধ ফুল । এমুহূর্তে ওয়ার্ণার র্যাঞ্চে রাখাল বালকেরা ঘরে ফিরে গেছে । ঘোড়ারাও ফিরে গেছে আস্তাবলে । প্রেইরির বিস্তীর্ণ বুকে খিলখিলিয়ে উঠছে সবুজ । মুজইকারা এসেছে সবুজের বিশাল ঢেউ নিয়ে । মুজাইকা, আজটেক, রেড ইন্ডিয়ান । দিল্লি এন সি আরের কোন তৃণভূমি আর অবশিষ্ট নাই, পাথরে পাথরে ভরে গিয়েছে আটবার ভেঙে গড়ে তোলা দেহ্লিজ । আজ আরাবল্লির ভগ্নশরীরে দাঁড়িয়ে আছে কাটাছেঁড়া ঝাটি-বাবলার বন । এখানে ভরে গিয়েছে কংক্রিট আর সিংহাসন দখলের লড়াই, ইঁদুর দৌড়ের রণভূমি, কর্পোরেটের বাণিজ্য আর ছুটে চলা মার্সিডিজ, অডি, হ্যামার, জাগুয়ার । হেডরেস্টে মাথা রেখে আমরা দুজন ট্যাক্সির বিপরীত উইন্ড স্ক্রিনে মনোনিবেশ করি । দুটি ভিন্ন লিঙ্গের সওয়ারী । ক্যাবটি এই মাত্র থার্টি-টু মাইলস্টোন পার করে গেলো । ট্যাক্সির ঘড়িতে তিনটে বত্রিশ । লন্ডনের বিগবেনে বাজছে এগারো দুই, ম্যানহাটনে সন্ধ্যা নামে ছটা দু’এ ।
কাল সকালে আবার ফিরতে হবে অফিসে । জ্যোৎস্নাকে স্ট্যান্ড-পয়েন্টের জন্য পিংক স্লিপ দেওয়ার কথা মনে ঘুরপাক খাচ্ছে । জ্যোৎস্না অযথা সত্যি কথা বলে ফেলে । ও যথেষ্ট ডিপ্লোম্যাটিক নয় । কোমরে হাল্কা মেদের এপিডার্মিস নিয়েও সে এতটাই উলঙ্গ । বুকে এতো দুটো বড় স্তন নিয়ে ও আজ সে শুধুই নারী । জ্যোৎস্না বারবার সেন্টার বরাবর আঘাত করে । আমার বুকে এক গভীর ক্ষত । ওর বুকে এক সুডৌল মৌচাক । আমাদের দুই বুকের ভিতর এক ইঞ্চির ব্যবধান । দো জিসম এক জান । এক কোটি দিন, এক কোটি রাত কেটে যাবার পর আবার ঘোড়া আর ঘাস মুখোমুখি । জ্যোৎস্না পলিটিক্যালি কারেক্ট চরিত্র নয় । সবই তো বুঝলাম । বাট ! কিন্তু ! ঘোড়া ঘাস কে সাথ দোস্তি করে গা তো খায়েগা ক্যা ? ভাঁড়মে যায় বুর্জোয়া, ভাঁড়মে যায় সমাজতন্ত্র, বালের মুনাফা, বালের মালিক শ্রেণী, বালের শ্রমিক শ্রেণী , বালের হ্যারাসমেন্ট ক্লজ, বালের এলজিবিটি, গাঁড় ফেটে যাচ্ছে রাত জেগে জেগে , আগুনে হাত পুড়িয়ে ছিনিয়ে আনতে হচ্ছে ডলার, আর তোমরা বলছ কবিতা পড়ো । মানুষের কবিতা লেখো । বালের কবিতা । বালের দিনযাপন, বালের রাত্রিযাপন । পালাম বিমানবন্দর থেকে মহিপালপুরের উপর দিয়ে ভুস করে উড়ে গেলও বোয়িং ৩২১ । এয়ারপোর্টের ওভারব্রিজের নিচে ওড়না-ঢাকা মেয়েদেরকে খদ্দের ধরতে দেখা যায় । এদের কোন ঘড়ি নেই, কোন দিন নেই কোন রাত নেই । জীবনই নেই তো বালের রাত্রিযাপন । হাতের পেশী নিশপিশ করে । রক্তের ভিতর নাড়া দেয় ক্যালকুলাস । প্রাগ-ঐতিহাসিক ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি শোনা যায় । রাত বাড়ছে চড়চড় করে । ওভারব্রিজের উপর দিয়ে ট্যাক্সি ছুটে যায় । এফ এম রেডিওতে পুরানো দিনের গান বাজে । জিহাল এ মিস্কিন মাকুন বারাঞ্জিস,বাহাল এ হিজরা বেচারা দিল হে । সুনাই দেতি... । চিড়ে চ্যাপ্টা হচ্ছি আমি আর জ্যোৎস্না । ফিজিক্যাল হচ্ছে সোর্স । কম্পাইল হচ্ছে কোড । কি বোর্ডে ঝড় উঠেছে । এমনি করেই রাত যদি যায় যাক না । সুদূর প্রেইরির তৃণভূমিতে হয়তো সন্ধ্যা নামছে । ঘোড়ারা আস্তাবল ভেঙে নেমে পড়েছে সবুজ তৃণভূমিতে । হয়তো আরমংক, নিউইয়র্কের ক্যাম্পাসের ম্যাপলট্রিতে জ্বলে উঠেছে ইনফ্রা রেড চুনি বাল্ব । কর্কশ সবুজ পাতাগুলির ভিতর দিয়ে যে কোন সময় উঠে আসতে পারে চাঁদ । সাত সাগর তের নদী পারে আমি এক ভার্চুয়াল যাপনচিত্রের জন্য সোর্সকোড লিখে যাই । সি-শার্প ডটনেট ।
Comments
Post a Comment