অ্যানড্রয়েড

 অ্যানড্রয়েড // পীযূষকান্তি বিশ্বাস


মুকুন্দুপুর ।



বাপের জন্মেও আমি এরকম কথা শুনিনি । বাবার দৌড় কতদূর জানিও না । শুধু বাবা বলতেন কলের গান শুনেছেন । একবার কলকাতায় গেছিলেন । এ থেকে কতটা দৌড় আর মাপা যায় । এই গ্রামে মানে মুকুন্দুপুরে বেড়ে ওঠা, এই গ্রামেই সুজলা সুফলা, রতন, নাগেশ, পরেশ দের সাথে ক্ষেত খামার করা । এক দিনে কে কত আটি ধান কাটতে পারে, এক দিনে কত চাল খড় ছেয়ে দিতে পারে এই ছিলো প্রতিযোগীতা, চৈত্র মাসে গাজনের মেলায় পৈঠা নাচিয়ে নৃত্যকলা প্রদর্শন । ব্যাস । পড়শী দীপেন মন্ডলের বাড়ি একটা রেডিও ছিলো ।  রাত্রে আওয়াজ করে গান ভেসে আসতো । দু-একটা গান শুনেছে, "বাঁশী শুনে আর কাজ নাই", "তুমি আজ কত দূরে" । বংশপরমপরায় এই পর্য্যন্তই দৌড় বাবা পরাণ মন্ডলের । কেবল টিভি, স্মার্ট ফোন, ইউটিউব, ফেসবুক , নাহ, কিছুই তার চোদ্দপুরুষের নাগালে আসেনি । তা দিয়ে অবশ্য পরাণের বেশী উচ্চবাচ্চ নেই, বলা যায় এই সব নিয়ে তার জানাশোনাও বিশেষ কিছু নয় । তার এক মেয়ে তাপসী, এক ছেলে রাজু ও বউ ময়না কে নিয়ে জলঙ্গীর পাড়ে বেশ সংসার কেটে  যায় । ছেলেটা এবার মাধ্যমিক, মেয়েটা উচ্চমাধ্যমিক  দেবে ।



রাজকুমার মন্ডল ।



আমি রাজু, মানে রাজকুমার মন্ডল মাধ্যমিক দেবো এবার । স্কুলে ভালোই পড়াশোনা করি । টিউশন মাস্টার নেই । দিদির মানে তাপসী মন্ডলের বারো ক্লাস, ঐ যা দেখিয়ে দেয় । যা পারে । আমার তো মনে হয় ভালোই পারে, বুঝিয়েও দেয় । তবে মাঝে মাঝে কানের নীচে দুএকটা যে ধরে দেয় না তা নয়, কিন্তু মিস্টি দিদি আমার, আমি পরক্ষনে তাই ভুলেও যাই । দিদির অনেক বান্ধবী , তারা আমাদের বাড়িও আসে । হো হো করে হাসে আর গড়াগড়ি খায় , নিজেরদের মধ্যে সিনেমা, পড়াশোনা , নারী স্বাধীনতা এই সব নিয়ে কথা বলে । দিদির বন্ধু নিবেদিতার কাছে একটা স্মার্ট ফোনও আছে । ওরা ফেসবুকে কে কি আলোচনা করছে, তাই নিয়ে গল্প-গুজব করে ।  আমি এই সব হো হো কিছু বুঝি না । ওদের ভালোই সময় কাটে । আমার ভালো কাটে না । আসলে আমার বন্ধু বান্ধব কম । কেউ ঠিক আমাকে পাত্তা দেয় না । মানে হিরোগিরির কিছুই করতে পারি না বা তেমন উৎপটাং কিছু বলতেও পারি না, খেলাধুলায়ও তেমন গা নেই । আমার একটা বাই-সাইকেল ও নেই । পাড়ায় একটু পাই পাই করে চালাবো, এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াবো । সে গতিও নেই । এইটুকু বুঝি আমার বাপের এইটুকু দৌড় । কিন্তু কেন জানি মনে হয় আমার একটা স্মার্ট ফোনের শখ । মনে হয়, আমার মধ্যে একটা এলেম আছে মানে এই গেম টেম খেলার ব্যাপারে, ফোনের সেটিং চেঞ্জ করে দেওয়ার ব্যাপারে । মন্টুর দাদা রিন্টুর কাছে আমি একটু আধটু ফেসবুক ও করা শিখেছি । হরেক রকম ছবিও দেখা যায় । মানে রিন্টুদা বলেন এইসব ছবি নাকি ছোটদের দেখতে নেই । 



পরান মন্ডল ।



বাবা মানে পরান মন্ডল বরাবর নিজের জমির কাজ নিজেই করে । বিঘে দুই মত আমাদের ধানের জমি । আমাকে মাঝে মাঝে মাঠে নিয়ে যায় কিন্তু আমি বেশী কৃষিকাজ বুঝি না । আগে আমাদের গরু ছিলো, লাঙলও ছিলো । এখন বাবা বাদল কাকার লাঙল নিয়ে জমিতে কাদা করে । বাবা দুপুরে বাড়ি আসে না, তাই ভাত তরকারি থালা-গামলায়-গামছায় বেঁধে আমি মাঠে দিয়ে আসি । এরকম একদিন মাঠে গেছি ভাত নিয়ে । আমি একটু কাজে হাত লাগাতে গেলাম । বাবা আমার দিকে তাকিয়ে উদাস হয়ে গেলেন । আমি মাঠে কাজ করি বাবা চান না । দুপুরের খাবার খেয়ে বাবা একটা হুকো ধরালেন । আমাকে কাছে বসতে বলেন ।  



বাবা জিজ্ঞাসা করেন "রাজু , আর কয় বছর পড়লে বিএ পাশ করবি বাবা "

আমি হাতগুনে বলি "পাঁচ বছর বাবা" । তারপর গদগদ হয়ে বাবাকে জিজ্ঞাসা করি, "এবার তো মাধ্যমিক, পাশ করে গেলে,  বাবা আমার একটা ফোন চাই , টাচ ফোন"



বাবা কিছু বলেনা, হুকোটা বন্ধ করে কাদার জমিতে ধান লাগাতে লেগে পড়ে । একটা বাড়তি উদ্যোম দেখি । আমি উত্তরের আশা করিও না, জানি, বাবা ঠিক কিছু না কিছু বন্দোবস্ত করবে । আমি মনে মনে আরো কিছু ফোনের উপযোগীতার কথা প্লান করি । একটা ফোন পেলে আমি কি কি করতে পারি ।  ফোন মানে কি শুধুই গেম, কত্ত লোকের ফোন আসে । বড় মাসীর ছেলে বাসু মন্ডল যে মালেশিয়া থাকে । রাজমিস্ত্রির কাজ করে । দুবছরে একবার বাড়ি আসে । সেই কতবার ফোন করে । আমাদের ফোন নেই । ফোন থাকলে আমাদের সাথেও কথা হবে হয়তো । 



তাপসী মন্ডল ।



বাড়ি এসে দিদির মানে তাপসী মন্ডলের সাথে নতুন ফোনের কথাটা পাড়ি । নানান প্রয়োগের কথাও । আধুনিক জীবনের সমস্ত সুবিধের কথা ।  দিদির ওই এক কথা, অনেক দাম । কিন্তু লক্ষ্য করে দেখলাম দিদির চোখটা জ্বল জ্বল করছিলো । মনে হচ্ছিলো দিদির ক্ষমতা থাকলে হয়তো এই মুহূর্তেই আমাদের মাটির বাড়িতে একটা টাচ ফোন আসতো । 



দিদি দেখতে শুনতে ভালোই । কালো বলতে যা বোঝায়, তার মধ্যে দিদি ঠিক পড়ে না । উজ্বল শ্যামবর্ণ বলা যায় । যখন স্কুলে যায়, আমিও সাথে সাথে যাই । নিজেদেরই চোখের সামনে আমরা বড় হয়ে যাচ্ছি । পাড়ার কেউ কেউ বলেন দিদির বিয়ের বয়স হয়ে যাচ্ছে । আমার তেমন কিছু বোধ হয়ে ওঠেনি । তবে পাড়ার দাদাদের আশে পাশে ঘোরার সাথে কোন সম্পর্ক আছে কিনা বোঝার চেষ্টা করি । স্কুল অনেকটাই দূর । হেঁটেই যাই ।  মাঝে মাঝে একটু ভয়ও হয় ।  দিদিও খুব জেদী । সে বড় হয়ে চাকরী করতে চায় । বলে বিয়ে থা করবে না, বাবার পাশে পাশে সে থাকবে, বাবাকে হাড় ভাঙাখাটুনী সে আর করতে দেবে না । দুবেলা জন খেটে আসা বাবার মুখের দিকে তাকালে তার নাকি মায়া হয় । এ কথা বাবাও জানে । বাবা মনে মনে হাসে, বুকের মধ্যে তার সাহস অদম্য হয়ে ওঠে । এই তো সে চাই । নিজের পরিশ্রমের কথা সে ভুলে যায় । পুত্র কন্যার মুখে সে অদ্ভুত এক প্রশান্তি খুঁজে পায় । সে মাঠে যায়, লাঙল টানে । ধানক্ষেতে লড়িয়ে দেয় সমস্ত লড়াই, গায়ে খেটে সে পুষিয়ে দিতে চায় সমস্ত ভালোবাসার ফসল, ইরি ধানের প্রতিটা গোছায় সে অনুভব করে আপন প্রাণের ছোঁয়া ।



দিদি আজকাল পাড়ায় টিউশানিও করে । বেশ কয়েকটা ছাত্র আছে তার । মাস গেলে কেউ মাইনে দেয় বা কেউ দেয় না । দিদির একটা গোপন তহবিল আছে । দিদি টাকা জমায় । দিদির পয়সা জমানোতে বোধহয় বাবারও হাত আছে । মাঝে মাঝে বাজার করে এসে খুচরো টাকাগুলি দিদির হাতে দিয়ে দেয় । দিদি তহবিলে রাখে । আমি মনে মনে এটাই ধরে নিই এটাই মেয়েদের কাজ । দিদি বলে কি ভবিষ্যতে সে এম এ পড়বে, বিটি পড়বে । আমার অবশ্য সে সব ধারনা নেই । এম এ পড়ে কি হয় বা বিটি পড়ে কি হয় । আমি শুধু জানি বিএ পড়ে চাকরি করা যায় ।  পশ্চিমপাড়ার হারাধন মাহাতোর ছেলে অমিত মাহাতো বি এ করে এবছর বোকারোতে একটা চাকরি পেয়েছে । ঝাড়খন্ডে চাকরি করে । তাই আমিও বি এ করতে চাই।



ময়না মন্ডল ।



মা অর্থাৎ ময়না মন্ডলের সব দিকে নজর থাকে । সংসারের কথা ভাবেন । অনেক টানা টানি । স্বামীর এই দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম তার হৃদয়ে পীড়া দেয় । ছেলে মেয়েকে খুশী কে না দেখতে চায় । একদিন উচ্চমাধ্যমিক পার করে শহরের কলেজে ভর্তি হলো দিদি । আমিও মাধ্যমিক পার করে গেলাম । বাবা তার কথা মত আমাকে ফোন কিনে দিলেন না, বলা যায় তার কোন খেয়ালই নেই । আমার এগারো ক্লাসের অনেক বইখাতা কেনা বাকি, এদিক ওদিক পুরানো বই জোগাড় করছি । বাবা বললেন এবার ফসলের ভাল দাম নেই । বাজার মন্দা । দিদির ও নতুন ক্লাস । অনেক বই খাতা । আধুনিক পোষাক আসাক, শিক্ষা সরঞ্জাম, আদব কায়দা , বন্ধু বান্ধব বেশ করচ সাপেক্ষ । কলেজ অনেক দূর ।  বাসে করে যেতে হয়, কখনো অটো করে । ময়না মন্ডল ভাবেন শুধু এই খরচার বাজারে সংসারে দিন আনা দিন খাওয়ার কথা । মেয়েটা বড়ও হচ্ছে । চিন্তা বাড়ে । বাবাকে বলে মাঝে মাঝে, বাবা মাঠে খেটে খুটে দিনরাত এক করে দেয় । এমন একদিন কথা বলতে বলতে মাকে বলে উঠতে শুনি মেয়েদের অত পড়াশোনা করে কি হবে ? আর কদিন পরে তো বিয়ে দিলে শশুরবাড়ি চলে যাবে । অর্থাৎ মা মনে মনে মেয়ের বিয়ের জন্য উপযুক্ত ছেলের কথা ভাবে, জামাই হিসাবে গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান মন্মথ বারিকের ছেলে বিবেক বারিক খারাপ নয় । একবার পূর্বপাড়ার প্রাইমারি স্কুলে ভোট দিতে গেলে বিবেক মাকে প্রনাম করে বলেছিলো " কাকীমা যদি আপনার কোন উপকারে লাগি তো নিজেকে ধন্য মনে করব " । মা বলেন নাকি ছেলেটা বড় ভালো । দেখলে নাকি মায়া লেগে যায় । বিবেক আর তাপসীর জোড়িকে খুব মানাবে । একটাই আমাদের ঘর, একটাই বারান্দা ।  দেওয়াল বলে কিছু নেই । যা কিছু কথা হয়, আমাদের সবার কথা সবাই শুনে ফেলি । 





বিবেক বারিক ।



প্রধানের পুত্র অর্থাৎ বিবেক বারিক একদিন বিকেলে আমাদের বাড়ি এলো । মাকে প্রনাম করলো । আমার সাথে হ্যান্ডশেক করলো । বিবেক মাকে বলল "কাকিমা রাজু তো স্কুলে যায় । তো এতোদূর হেঁটে যায় একটা সাইকেল ও কিনে দিতে পারেন" । 

মা বলল "বাবা বিবেক !  এবছর একটু টানাটানি যাচ্ছে । তাছাড়া , রাজু তো একা নয়, মেয়েটাও তো আছে । একজন কে নিয়ে ভাবলে তো হয় না । মেয়েটাও তো হেঁটে কলেজে যায় " ।

বিবেক বলল " একি বলছেন কাকিমা, তাপসীর দায়িত্ব আমার উপরে ছেড়ে দিন, আমি ওর যাতায়াতের ব্যবস্থা করব । "

মা একটু আমতা আমতা করেন । " না মানে, আমাদের তো চলে যাচ্ছে বাবা । এই আর কটা বছর পরেই তাপসী চাকরি পেয়ে যাবে । "

আমি শুনি, একটু আধটু বোঝার চেষ্টা করি । যেটুকু বুঝি দিদি বিবেককে পছন্দ করে না । বিবেক এর আগেও দু একবার দিদির সাথে কথা বলতে চেয়েছে, কিন্তু দিদি পাশ কাটিয়ে যেতে চায় । বিবেক একদিন রাস্তা আটকে জিজ্ঞাসাও করেছিলো এরকম পাশ কাটিয়ে যাবার উদ্দেশ্য কি ? দিদির একটাই উত্তর , এখন এটা কলেজের সময় । কলেজে ভালো রিজাল্ট না করলে এম এ করা যাবে না । 



অমিত মাহাতো ।



দিদি কলেজ থেকে এখনো ফেরেনি । কিছুক্ষন আগে বাবাও ঘরে ফিরলো । সন্ধ্যা পার হয়ে গেলো । মা চিন্তিত । বাবা চিন্তিত । আমি এগিয়ে গেলাম গ্রামের পথ ধরে অনেকটা । রাত হয়ে গেছে । প্রামের পথ । অন্ধকার হয়ে আসছে । গ্রামে এখনো সব জায়গায় কারেন্ট আসেনি । আর যেখানে এসেছে সেই সব লাইটপোস্টে বাল্বও জ্বলে না । আমি তবুও এদিক ওদিক দেখছি । কত লোক বাড়ি ফিরছে । আমি যেন তাদের সবাই কে আজ চিনতে পারছি । ও পাড়ার কানাই কাকা মোটর সাইকেলের হেড লাইট জ্বালিয়ে বাড়ির দিয়ে চলে গেলো । ধুলো উড়ছে । যেটুকু রাস্তায় আলো পড়েছিলো সেই আলোতে দূর থেকে দুজন আগত মানুষকে দেখলাম । একজন কে দিদির মতই মনে হলো । একটু কাছাকাছি যেতেই বুঝলাম দিদিই এটা । কিন্তু সাথে কে ? আরো কাছে আসতে বুঝলাম এতো অমিত দা মানে অমিত মাহাতো । বোকারো থেকে কবে এলো ?  আমাকে দেখে দিদি খুব আনন্দিত হলো । চেচিয়ে উঠলো " রাজু । তুই ? " । তারপর অমিত কে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, "অমিত দা আমি এবার যেতে পারবো । রাজু এসে গেছে । আমি যাই । বাই "  অমিত ও বাই বলে উল্টো পথে হেঁটে অদৃশ্য হয়ে গেলো । আমি আর দিদি দ্রুত পায়ে বাড়ি ফিরলাম ।



অ্যানড্রয়েড ।



বাড়িতে একটু উত্তেজনা ছিলো । মা রেগে টং, বাবার মুখ গম্ভীর । আমি নির্বিকার । কোন মতেই দিদির দেরী করে বাড়ি ফেরা ঠিক হয়নি । একে তো মেয়ে আর তার উপর অন্ধকার । পাড়ার অবস্থা তেমন ভালো না । কোন সময়ে কে কি করে বসে । আমরা হলাম গরীব এবং জাতে ছোট । আমাদের কোন নিরাপত্তা নেই । দিদি চুপ থাকলো । কোন উত্তর করলো না । মা বাবাকে ডেকে বললেন যে বিবেক আজও এসেছিলো । বাবা যেন প্রধান মন্মথ বারিকের কাছে গিয়ে বিবেকের সাথে তাপসী   বিয়ের সম্পর্কের কথা পেড়ে আসেন । তুমুল তর্কাতর্কি । আমরা কোনদিন মা বাবার সংগে এমন তর্ক করতে দেখিনি । 



আজ অনেক রাত হলো । পাশের বাড়ি পলাশদের বাড়ি কারেন্ট আছে । সারা রাত উঠানে বাল্ব জ্বলে । কিছুটা আলো আমাদের বাড়িও আসে । ঘুম আসছে না আজ । বাল্বের আলো দেখছি । আমাদের একটা ঘর দুটো বিছানা হয় । আমি মার কাছে শুই । ওপাশে দিদিও মার কাছে ঘুমায় ।  কত রাত কে জানে । আমার নিজস্ব কোন ঘড়ি নেই । দিদির কাছে একটা লেডিস ঘড়ি আছে । বালিশের নীচে রেখে ঘুমায় ।  ঘুম আসছে না  । আমার বিশ্বাস দিদিও জেগে আছে । আস্তে ডাকলাম ,

"দিদি ।"  

দিদিও ওঠে । বললাম "কোথায় গেছিলি ? এত দেরী হলো কেন ?"  দিদি ঘড়ি দেখলো একবার । তারপর বালিশের নীচে থেকে কি একটা কাগজের হাত বাক্স বের করলো । বাক্সের উপর মনে হলো কোন টিভির ছবি । 

আমি বল্লাম "কি এটা ?" 

দিদি বলল "আই খুলে দেখাই ।" 

আস্তে আস্তে আমরা দুজন বারান্দায় আসি । বাল্বের আলো আমাদের দুজনেরই মুখে পড়ে । বুঝতে পারি আমরা দুজনের কেউ রাত্রে ঘুমাইনি । চকচক করে ওঠে আমাদের চোখ । বাক্স খুলে বেরিয়ে পড়ে ইয়া বড় একটা ফোন । পুরোটা জুড়েই স্ক্রীন । এত চকচক করছে যেন হাত থেকে পিছলে যায় । দিদি বলল "স্মার্ট ফোন । সিম কার্ড ও আছে ।" 

আমার হাতে দিতেই বুঝি আরে এই তো সেই ফোনটা ।  যার কথা আমি এতদিন ধরে বলে আসছি । 

আমি বললাম "অ্যানড্রয়েড" ? 

দিদি আমার মাথায় হাত দিয়ে বলল "হ্যাঁ রে তোর অ্যানড্রয়েড" ।  

আমি বললাম "তুই কিনলি ?"

দিদি বলল "হ্যাঁ, আমি টাকাটা দিলাম, অমিত কিনে দিলো , ও এইসব ব্যাপার ভালো বোঝে " ।

আমি বললাম "অমিত মানে ওই যে তোর সাথে আসতে দেখলাম ঐ অমিত মাহাতো ? ওর সাথে তোর কিভাবে পরিচয় হলো ? "

দিদি বলল "নিবেদিতা আমার একটা ফেসবুক একাউন্ট খুলে দিয়েছিলো । অমিতই আমাজে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দিলো । ও বোকারো থেকে ছুটি নিয়ে বাড়িতে ফিরছিলো আজ । দেখা হয়ে গেলো । আমি বললাম আমার একটা ফোন কিনে দিতে হবে । পয়সা আছে । ফোন কিনতে কিনতে অনেকটা দেরী হয়ে গেলো "

আমি বললাম "তা তুই এই ফোনটা কেন কিনতে গেলি ? আমি তোর কাছে ফোন চাইনি, আমি তো বাবার কাছে চেয়েছিলাম "

দিদি বলল "তুই আজ অব্দিও ছোট আছিস রাজু । কাল থেকে দেখিস বড় হয়ে যাবি "

আমি বললাম " মানে ?"

দিদি বলল " তুই কিরে কাট কাউকে বলবি না "

আমি বললাম "মাকালির কিরে "

দিদি বলল "জানিস আমার পড়াশোনার পিছনে অনেক খরচ ।  আর মনে হয় আমি আর এম এ অব্দি যেতেও পারবো না । বিটি অব্দি পড়াও আমার হবে না " । একটু শ্বাস নিলো দিদি । তার পর বলল " বাবার অবস্থা আগের মত নেই । এম এ করতে এখনো পাঁচ বছর, তার পর কোনদিন চাকরি পাবো কি পাবো না কেউ জানে না । আর পেলেই বা কি সেই তো পরের ঘরে চলে যেতে হবে । বাবা মাকে এত কষ্টের মধ্যে রেখে পড়াশোনা করে আমার কি কাজে লাগবে ? আমার ভালো লাগে না । "

আমি বললাম " কি বলছিস তুই দিদি " ?

দিদি বলল " হ্যাঁ রে, তাছাড়া আমাদের মতন পরিবারের মেয়েদের এত উঁচু স্বপ্ন দেখা ঠিক না, আর তুই জানিস তো যে মা আমার জন্য বিয়ের সম্পর্ক দেখছে ।  প্রধানের ছেলে বিবেকের সাথে সম্পর্ক করতে চায় "

আমি বললাম "হুঁ বুঝলাম,  বিবেক আজ বাড়িতে এসেছিলো । কিন্তু দিদি তুই ভাবিস না, আমি বিবেক কে বলে দেবো যেন ও আমাদের বাড়ি না আসে "

দিদি বলল "না রে , ওরা খুব শক্তিশালী লোক, পার্টি করে । ওদের সাথে তুই পারবি না " আমার খুব কান্না পেল । দিদিকে জড়িয়ে ধরলাম । কাঁদতে পারলাম না । 

দিদি বলল । "আর একটা কথা শোন , কাউকে কিছু বলিস না , আমি আর অমিত ঠিক করেছি যে আমরা ঘর বাঁধবো । ও বোকারোতে চাকরী করে । আমি ওর সাথে কাল বিকেলের ট্রেনেই বোকারোতে রওয়ানা দেবো ।  তুই লক্ষী ভাইটি আমার আমাকে কথা দে । তুই যে করেই হোক বি এ টা পাশ করবি । আমি তোর বি এ পাশের আমি বাঁধা হতে চাই না । তোর একটা চাকরী খুব দরকার । বাবার এই বয়সে এত পরিশ্রম আর দেখা যায় না " । এরপর দিদি কেঁদে ফেলল । আমরা দুজনেই কাঁদছি । আওয়াজ করে উঠতে পারছি না । বাবাকে নিস্তেজ শুয়ে আছে, ঘাড় মুড়ে শুয়ে আছে মা । দুজনেই ঘুমাচ্ছে । ওরা যেন জেগে না যায় । সারাদিন পরিশ্রম করা ছাড়া ওদের বেশী আর দৌড়ও নেই । কোন নিউজ পেপার, কোন ইন্টারনেটের, কোন সোসাল মিডিয়ার নামও শোনেনি ওরা । ফেসবুকের পরিচয়ের কথা ওরা কেউ জানে না । আমার হাতে স্মার্ট ফোন । দিদি কাল আমাকে ছেড়ে চলে যাবে । এমনিতেই আমি একা, আরো একা করে দিয়ে চলে যাবে । হাতের মধ্যে আমি একটা পরিবর্তন অনুভব করছি । স্মার্টফোন খুব ভাইব্রেট করে উঠলো । শিরা উপশিরায় একটা ঢেউ খেলে যাচ্ছে । গায়ে একটা ঝাঁকুনি এলো । অবসম্ভাবী আগামীর তাড়নায় ধাক ধাক করে আমি বড় হয়ে যাচ্ছি । 

Comments