রাঙাও ভারত বাসন্তী রঙে
-পীযূষকান্তি বিশ্বাস
“জন্মিলে মরিতে হবে রে, জানে তো সবাই
তবু মরণে মরণে অনেক ফারাক আছে ভাই !
সব , মরণ নয় সমান... ”
এই আমাদের নিয়তি, এই মরণ আমাদের ভবিতব্য । সর্বধর্মজাতিদেশ নির্বিশেষে এই আমাদের ধ্রুব পরিণতি । যেভাবে, মাতৃ-জঠরে কুড়ির মতো ফুটেছি, ক্রমে পূর্ণ-পুষ্পে প্রস্ফুটিত হয়েছি । সে ভাবেই ঝরে পড়া নক্ষত্রের মতো কোনদিন হিমের পরশে মিশে যাবো । ঝরে তো যাবো সবাই, তবে যদি ঝরা যায় নিজের ভূমিকায়, যদি মরা রায় নিজের স্বাধীনতায় । যদি মরে যেতে পারি মনুষ্য কল্যাণে আত্মত্যাগে নিজস্ব মরণে , সেই মরণ হয় মহান, সেই মৃত্যু হয় আকাশ সমান গৌরবের ।
এমনই এক গৌরবের গল্প করি আজ । মরণকে বাজী রেখে পরাধীনতা থেকে ভারতবর্ষকে আজাদ হবার কাহিনী । রক্তকে আবীর করে ভারতভূমিকে রাঙ্গিয়ে নেওয়া সঙ্গীত । হাড়কে হিম করে এক এক করে পার করে যাওয়া বারুদের আগুন স্রোত । যাদের আত্মত্যাগে আমরা স্বাধীন আজ । জন্ম, মৃত্যু আর বসন্ত রঙের এই অবাক পৃথিবীর নাম আজ দেওয়া যাক 'আজাদ' ।
তখন ১৯০৬ সাল হবে । আকাশে বাতাসে দুর্ভিক্ষের বাতাবরণ ! ভারতীয় উপমাহদেশকে লুটেপুটে নিয়ে যাচ্ছে গ্রেট ব্রিটেন । বৃটিশসাম্রাজ্যে যখন সূর্য ডোবে না তখন। আর এদিকে দুর্ভিক্ষের অন্তরালে ব্রিটিশ বাহিনী হামলে পড়েছে বঙ্গ বক্ষে, রাজপুতনায়, মহারাষ্ট্রে, মধ্যপ্রদেশে । তাদের বাণিজ্য সাফল্যের জন্য দেশীয় কৃষকদের কখনো বাধ্য করলেন নীল চাষ করার জন্য, কখনো তাদের ফসলের খাজনা দ্বিগুণ করে করেন উৎপীড়ন । পরাধীনতার অঙ্কুশে ভারতমাতা কেঁদে কেঁদে উঠছে ভারত । আকাশ বাতাসে ক্রন্দন ধ্বনির আওয়াজ । মা, একটু ফ্যান দেবেন ?
যখন ইংরাজের বিধ্বংসী বন্দুকের সামনে নতজানু পরাধীন ভারতের কৃষক, কুমার, তেলী, ব্রাহ্মণ, সমগ্র ভারতবাসী । ঘরে ঘরে আতংকের পরিবেশ ছেয়ে আছে । মধ্যপ্রদেশের ভাভরা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন চন্দ্রশেখর তিওয়ারি । চন্দ্রশেখর স্থানীয় ভীল আদিবাসী শিশুদের সাথে বেড়ে উঠতে থাকেন । খেলাধুলায় চোস্ত। সুঠাম শরীর তার । তাঁর মা তাঁকে সংস্কৃত পণ্ডিত করার স্বপ্ন দেখতেন এবং তাঁকে বেনারসের কাশী বিদ্যাপীঠে পাঠালেন।
ছেলের পড়াশোনায় যতটা মন, ততটাই তিনি জাতীয়তাবাদের স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়েন । তখন দেশ স্বাধীনতা আন্দোলনের তুঙ্গে । স্বদেশী আন্দোলন রূপ ছড়িয়ে পড়েছে ভারতবর্ষের প্রদেশে প্রদেশে । মহাত্মা গান্ধী তখন পরাধীন ভারতের প্রধান জাতীয়তাবাদী নেতা । চন্দ্রশেখরের ইচ্ছে, তিনি মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেবেন । কৈশোর থেকে যুবক বয়সে পা দিতে না দিতেই চন্দ্রশেখর ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেফতার হয়ে খুশী খুশী কারাবরণ করেন । ১৯২২ সালে যখন মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন, কিশোর চন্দ্রশেখরের জাতীয়তাবাদী মনোভাব এবং তাঁর দেশকে স্বাধীন দেখার স্বপ্নে একটি বড়সড় আঘাত পান । চন্দ্রশেখর আন্দোলন প্রত্যাহারের পক্ষে ছিলেন না । তিনি চেয়েছিলেন আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে । তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই ধরনের অহিংস আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্তম্ভগুলিকে নাড়া দেবে না।
শুরু হলো, আত্ম উপলব্ধির পালা। কি করা যায় । গ্রামবাসী কৃষকদের অবস্থানের কথা তাকে খুব ভাবাতো । চন্দ্রশেখর বুঝতে পারেন এই দরিদ্রদের ভাষা ইংরাজ সাম্রাজ্যবাদীরা বুঝতে নারাজ । জালিয়ানবালা হত্যাকাণ্ডে তারা নিরস্ত্র এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের ভিড়ের উপর সহিংস গুলিবর্ষণের ঘটনা তাঁকে আহত ছিন্নভিন্ন করে তুলেছিলো । ব্রিটিশদের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় ভরসা রাখতে পারছিলেন না । আলোচনা আসলে হয় সেয়ানে সেয়ানে । সাম্রাজ্যবাদী আর দরিদ্র-কৃষকদের আলোচনা সমান হতে পারে না । স্বদেশী আন্দোলনের সার বুঝতে পেরে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে । পেশীতে প্রকাণ্ড হস্তির শক্তি অনুভূত হয় । শিরায় শিরায় রক্তে বুঝতে পারেন বয়ে যাওয়া দুরন্ত নর্মদা নদীর স্রোত । চন্দ্রশেখর নিজেকে ‘বলরাজ’ হিসাবে ঘোষণা দেন । কোন অনুনয় বিনয়ের সঙ্গে ব্রিটিশের সঙ্গে আলোচনা আর নয়, আলোচনা হবে শক্তিতে শক্তিতে ।
নিজেকে দীক্ষিত করে তোলেন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে । শক্তি অর্জন করতে হবে । শক্ত হাতে, সাম্রাজ্যবাদীদের শিক্ষা দিতে হবে । গড়ে উঠলো হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের (এইচআরএ) । যা ছিল একটি জঙ্গি সংগঠন । ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সহিংসতা ব্যবহারে বিশ্বাসী সংগঠন। শুরু করলেন অস্ত্র সংগ্রহ ও লোকবল জোগাড় করা । পরিকল্পনা হলো অস্ত্র সংগ্রহের জন্য সরকারী ট্রেন লুট । ১৯২৫ সাল নাগাদ কাকোরি ট্রেনে করা হলো হামলা বোল । একজন যাত্রী সেই অভিযানে মারা যান । ব্রিটিশরা এটিকে হত্যা বলে অভিহিত করে। মামলা দায়ের করেন । তার সঙ্গী সাথী আশফাকুল্লা খানের সাথে বিসমিলকে গ্রেফতার করা হয়, তবে চন্দ্রশেখর নিজে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন ।
চন্দ্রশেখর ছিলেন বিচক্ষণ এবং ক্রমে হয়ে উঠলেন দেশ ব্যাপী আন্দোলেনের অংশীদার । এরপর তিনি এইচআরএর সদর দফতর কানপুরে চলে আসেন। সেই সময়ের সবচেয়ে ভয় পাওয়া স্বাধীনতা সংগ্রামী চন্দ্রশেখর । সে বছর ব্রিটিশ পুলিশের লাঠিচার্জে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী লালা লাজপত রায় মারা যান। সেই কারণে, চন্দ্রশেখর তিনি জেমস স্কটকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন । বিপ্লবী ভূমিকায় উত্তর ভারতে চন্দ্রশেখর তিওয়ারী ক্রমে হয়ে উঠলেন চন্দ্রশেখর 'আজাদ' । এইরকম এক সাহসী অভিযানে একদিন তার সংস্পর্শে এলেন প্রথমবার ভগৎ সিং ও রাজগুরু সহ অন্যান্য তরুণ বিপ্লবীরা । । চন্দ্রশেখর আজাদের সত্য দেশপ্রেম , ভারতের স্বাধীনতার জন্য তার জীবন সংগ্রাম ছিলো বহু বিপ্লবীদের আদর্শ । স্বাধীনতা ও ন্যায়ের শক্তিতে বিশ্বাসী সকলের কাছে তিনি অনুপ্রেরণা । হাসিমুখে প্রাণ দেবার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন ভগৎ সিং। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যখন জেমস স্কটকে উচিত শিক্ষার নিয়ে প্লান করা হলো । এ এক একমুখী বিপ্লবী অভিযান যেখান থেকে গৃহে ফিরে আসা সম্ভব নয় । এই কার্যে সফল হওয়ার ভাগ অনিশ্চিত, মৃত্যুর পথ অবধারিত । বিপ্লবীরা ঝাঁপিয়ে পড়লেন ।
জেমস স্কট ছিলেন লাঠিচার্জের আদেশ দাতা । ঘটনাক্রমে জেপি সন্ডার্সকে পুলিশ স্টেশন থেকে ফেরার পথেই বুলেটবিদ্ধ করেন রাজগুরু ও ভগৎ সিং। জেপি সন্ডার্সকে ৮টি ক্লোজ শটের গুলি খেয়ে প্রাণ ত্যাগ করলেন । পুলিশও ভীষণ তৎপরতার সঙ্গে অধিকাংশ বিপ্লবী সদস্যদের গ্রেপ্তার করে ফেললো । তাদেরকে রাখা হলো দিল্লি জেল ও পরে লাহোর মিয়ানওয়ালি জেলে । কিন্তু চন্দ্রশেখর আজাদ কে পুলিশ ধরতে পারলো না । এ কারণেই তাকে ‘কুইক সিলভার’ নাম দেওয়া হয়। চন্দ্রশেখর আজাদ তার দুর্দান্ত ছদ্মবেশী ক্ষমতা ব্যবহার করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। ধরা পড়লো ভগৎ সিং ও শিবরাম রাজগুরু । বলা হলো তাদের ফাঁসী হবে । বসন্তী পঞ্চমীর দিন । বিপ্লবীরা খোলা পাঞ্জাবী স্বরে কণ্ঠে গেয়ে উঠেছেন মেরে রং দে বাসন্তী চোলা । এই বিপ্লবী জীবন এক পলকের জন্য রাঙ্গিয়ে নেওয়া । এই সুন্দর পৃথিবীর আকাশ, এই সুন্দর সুবাসিত বাতাস থেকে চির বিদায় জানানোর পালা । ভারতের স্বাধীনতার জন্য আত্মবলিদানের মতো মরণ । সারা দেশ উত্তাল । খবরের কাগজ উত্তাল । মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশের কাছে ভগৎ সিং এর প্রাণ ভিক্ষা চাইছেন । আর ওদিকে, চন্দ্রশেখর আজাদ প্রস্তুতি নিচ্ছে বৃটিশপুলিশের সঙ্গে খণ্ড যুদ্ধের । বিপ্লবীদের জেল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পালাবার পন্থা বের করছেন।
যে কোন সময় , সরকারী পুলিশ তাকে ধরে করে ফেলতে পারে । এই তো জীবন, এইতো জিদ । চন্দ্রশেখর আজাদ অনায়াসে আজকের নেতাদের মতো সঙ্গী সাথীদের ছেড়ে নাম ভাঁড়িয়ে অন্য দলে ভিড়ে গিয়ে পালিয়ে বেঁচে থাকতে পারতেন । মিশে যেতে পারতেন সাধারণ দরিদ্র নিরুপায় কৃষকদের ভিড়ে । হয়তো,চুপচাপ রাতের অন্ধকারে কোন গ্রাম প্রান্তরে জীবন সেভাবেও শেষ করা যেতো । চন্দ্রশেখর আজাদ সেই জীবন চান নি । সেই মাটির মানুষ তিনি নন। তার রক্তে সেই মরণ ছিলো না ।
চন্দ্রশেখর আজাদ ছিলেন ব্রিটিশ রাজের জন্য দুঃস্বপ্ন। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা তাকে মৃত বা জীবিত ধরতে বদ্ধপরিকর। এমনকি তারা তার মাথার জন্য একটি বড় আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। এই ঘোষণার ফলে একজন ইনফর্মার চন্দ্রশেখর আজাদের হদিস খুঁজে পান। সেই খবর পেয়ে ১৯৩১ সালে, চন্দ্রশেখর আজাদকে এলাহাবাদের আলফ্রেড পার্কে ব্রিটিশ পুলিশ কোণঠাসা করে ফেলে। তিনি সহজেই পালাতে পারতেন, কিন্তু আত্মসমর্পণ না করে তিনি মৃত্যুর সাথে লড়াই করার পথ বেছে নিলেন। বুলেটের শিলাবৃষ্টিতে ঘিরে ফেলা আস্তানা । পর্যাপ্ত অস্ত্র ও কার্তুজ চন্দ্রশেখর আজাদের কাছে ছিলো না । একক যুদ্ধে একটি সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীকে কতক্ষণ আটকানো যায় ? তিনি বুঝতে পারছেন গ্রেফতার অবশ্যম্ভাবী । ফাঁসীর কাঠে তাকে ঝোলানো হবে ।
তিনি ধরা দিতে চাইলেন না । একটি বুলেট তিনি নিজের পকেটে সর্বদা নিজের জন্য বরাদ্দ করে রাখতেন । অন্তিম মুহূর্তে তিনি নিজেই নিজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে নিজের মৃত্যু নিজেই ঘোষণা করলেন । মরণ তে তুহু মেরে শ্যাম সমান । চন্দ্রশেখর আজাদ, আত্মঘোষনায় আজাদীর সঙ্গে অমর হয়ে গেলেন ।
এহেন, বহু মুক্তিযোদ্ধা ও জাতীয়তাবাদীদের আত্মত্যাগে আমরা ভারতের স্বাধীনতা পেয়েছি। যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নিরলস ভাবে লড়াই করেছে তাদের ভিতর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহীদ হলেন চন্দ্রশেখর আজাদ। তিনি ছিলেন একজন প্রবল জাতীয়তাবাদী এবং ভারত মাতার প্রকৃত সন্তান । যার কোনো পরাশক্তির ভয় ছিল না। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর সাহসিকতা সর্বদা স্মরণযোগ্য । তার মরণের কাছে হার মানে এই পাহাড় হিমালয়, নতশির হয়ে বসে আছে এই আসমুদ্রহিমাচল । তার ত্যাগের কাছে আমাদের এই সামান্য মুরতি, স্যালুট জানায় । ভারতীয় উপমহাদেশ যতবারই তার স্বাধীনতা উদযাপন করবে ততবারই তাঁকে স্মরণ করা হবে। তাঁর নিঃশর্ত ভালবাসা এবং নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ভারতীয় ইতিহাসে দেশপ্রেমের প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হবে ।
Comments
Post a Comment