বাস নামের প্রবন্ধ ও সময় অভিযান
-পীযূষকান্তি বিশ্বাস
------------------------
বার বার আমি বলতে চেয়েছি 764 মানে সেভেন সিক্সটি ফোর । এর অর্থ যদি ধরা যায়, যথাযথ সরাসরি কখনোই সাতশো চৌষট্টি হবে । ইন্টিজার মান হিসাবে, এর মানে সাতশো তেষট্টিও নয়, সাতশো পঁয়ষট্টিও অবশ্য নয় । বরং এর অর্থ নিহিত রয়েছে নজফগড় থেকে নেহেরু প্লেস যাত্রায় । যেখানে নজফ মানে একটি পূর্ণ ঐতিহাসিক গড় আর নেহেরু মানে একটি পণ্ডিত নামের গন্তব্য শহর । এর মাঝখানে একটি রুট রয়েছে, অর্থাৎ মার্গ । ৭৬৪ একটি মার্গ , যা একটি বাস রুট । এই বাসে করে এই যাত্রাপথের একটি ব্যাখ্যা নিয়ে একটি যাত্রা প্রবন্ধ ।
একটি সামান্য সংখ্যার ব্যাখ্যা দিয়ে শুরু করা যাক । সেভেন সিক্সটি ফোর । খুবই ন্যাচারাল একটি সংখ্যা । তবে উচ্চারণ আলাদা । সেই ভাবে দেখলে সামান্য একটা বাস যাত্রা । তার ভৌগলিক আলাদা । স্বতঃস্ফূর্ত অথচ জবরদস্তি প্রতীত হয় । 'প্র' নামের এই 'বাস' । দিল্লি নামের এই বাসরুট । নেহেরুপ্লেস থেকে শুরু করা স্বাধীনতা , নজফগড় থেকে নেওয়া একটি প্রবাস ইতিহাস ।
আমরা যারা প্রবাস নামের মার্গে বাংলা ভাষার সাহিত্য কার্যে নেমেছি । প্রথমের 'প্র' শব্দের প্রতি এক অদ্ভুত উদাসীনতা দেখতে পাই। জিনিসটার ব্যাখ্যা দরকার । এখানে 'প্র' হলো একটি অভিধান থেকে ভিন্ন একটি অস্তিত্ব । অর্থাৎ আছে । সেটা সচেতন ভাবেই আছে । অস্বীকার করে কি লাভ । আর সেহেতু, মূল ভূখণ্ডের বাংলা থেকে ভিন্নতর । তার সাহিত্য ভাবনা হওয়ার সম্ভাবনা বাঙালী হওয়ার থেকে ভিন্ন । সুজলা সুফলা বাংলাভূমির মলয়স্পর্শ এখানে শীতল হাওয়া আনে না । বাংলা এখানে সোনার বাংলা নয় । বরং বলা যায় সাতশো চৌষট্টি এখানে সেভেন সিক্সটি ফোর, আর তেত্রিশ ফুট কে তেত্তিসফুটা বলা একটি ন্যাচারাল বাক্যবন্ধ । কেউ কেউ বলছেন , সাহিত্য হবে উন্মুক্ত, ভাষা হবে উদার ও ওপেন , ইউনিভার্সাল । সেই খানে 'প্র' নামের একটি দ্বার দিয়ে সেই উন্মুক্ততা 'বন্ধ' করা ।
সেইখানেই এই বাসরুট । একটি যাত্রার মাঝখানে যেইটুকু সময়, তাতে একটি 'প্র' রাখা যাক । প্রবাস যেহেতু সত্য, তাই তার ভাষা সাহিত্য সত্য হবে । আমি যেহেতু দিল্লির বাসিন্দা, তাই এই 'প্র' নামের দরজায় 'বন্ধ' । এই বাংলা কবিতার মহাবিশ্বে আমার নিজের জন্য এইটুকু ভৌগলিকতা বঙ্গভূমির কাছে আমি চেয়ে নিচ্ছি ।
এর অভিপ্রায় নিয়ে , অধিবাসীদের মধ্যেও রয়েছে ভিন্ন মত । অনেকে বলছেন 'প্র' শব্দটা উহ্য রাখা যায় কি না । এই যে সাতশো চৌষট্টি তাকে সাতশো চৌষট্টি বললে অসুবিধা কোথায় ? মধ্যাহ্নভোজনে এই যে খোয়াপনীর সহযোগে তন্দুরী রুটির বদলে মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাওয়া অনেক বেশী বাঙালীয়ানা । অর্থাৎ বেঙ্গলী ইন পিওর অব এ পিওরেস্ট ফর্ম । কে বেশী খাঁটি বাঙালী তার একটি প্রতিযোগিতা । কোথায় যেতে চাই আমরা । নেহেরুপ্লেস নাকি নজফগড় ? কোন বাংলা বাক্যে মঞ্জিল শব্দটি শুনেই খাঁটি বাঙ্গালিদের মাথা ঘুরে গেলো । মঞ্জিলের চোদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করে তাদের শান্তি কারণ অভিধানে এই শব্দটি কোথাও নেই । অথচ এখন তথাকথিত বাঙ্গালিদের ঘরে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ছন্দে তালে হরদম তন্দুরী ও শিক কাবাব চুটিয়ে রসেবসে চলছে । যেহেতু ভাষাটা বাংলা , তাই এই জবরদস্তি প্রবাস । এখানে বাংলা নামের কোন বধূ অনুপস্থিত । এইখানে গঙ্গা নামের কোন নদী নেই । নেই ইছামতী, না কর্ণফুলী, না অজয় দামোদর । সুতরাং নিশ্চিত করে বলা যায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এখানে কোনদিনই সাঁতার কাটতে আসেনি । সামান্য উচ্চারণ থেকে উৎপন্ন দূরত্ব নিয়ে একটি লো রাইড বাস ছুটে যায় । এতো দূর ধিল্লিকাপুরী থেকে যখন ধুলোর ঝড় উঠেছে , আমরা বুঝতে পারছি এই কাল্পনিক জায়গাটা সুজলা সুফলা নয় । এই বঞ্জরভূমিতে কাঁটাঝাড়, গুল্মলতা ও অনুচ্চ আরাবল্লি পাহাড়ে ঘেরা । ঐ ছুটে আসে মির্জা নজফখানের অশ্ব, ঐ উড়ে যায় ময়ূরের ঝাঁক । সুরজকুন্ড শহরে মাটি দিয়ে গড়া কুমারের হাড়িকুড়ির বাজার ঘিরে মেলা লেগেছে ।
তাহলে দাঁড়ালো কি? প্রবাসে কি বাংলা সাহিত্য চর্চা স্বাভাবিক ? নাকি জোর করে করা । জোর করে করার ব্যথা আছে । জোর করে করার সাইড ইফেক্ট আছে। মনুষ্য যখন সত্য, তার বিস্তার ও ক্রমবিকাশ সত্য । প্রবাস হোক, বিদেশ বাসই হোক । মায়ের ভাষাটা তো বাংলা । মাতৃভাষার মণিজালে আবদ্ধ তার ভাষাভাষী । সাহিত্য হোক বা না হোক, কিছু লিখে ওঠার তাড়না থেকে নিস্তার কোথায় ? বঙ্গভূমির মূল ভূখণ্ড থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে জন্ম নিচ্ছে যে বাংলা সাহিত্য, তার ভাব,ভাষা, ছন্দ, বিষয় ও কাহিনী আলাদা হবে । এ এক গুল্মলতার দেশ , গ্রীষ্মে সাতচল্লিশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড , শীতে শূন্য ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড । এই যাপন আলাদা , এর রং আলাদা, এর পোশাক, পরিচ্ছদ, প্রেম , ভালোবাসা, পড়শি , পূজা পার্বণ আলাদা । সুতরাং সাহিত্য চর্চায় 'প্র' শব্দটা আবশ্যিক । এইটুকু ভৌগলিক বোধহয় বঙ্গকবি সম্প্রদায় স্বীকার করবেন । যারা , বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত তারা ডায়াস্পোরা সাহিত্যিকের মান্য করেন । যেটা করেন না সেটা হলো, বাংলা ভাষাকে কুক্ষিগত করে রাখা । এক শহরের মালিকানা ভাবেন । ভাবেন, তারাই বাংলা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছেন, তারাই মালিক পক্ষ । মনে করেন আর 'প্র' নামের সাহিত্য চর্চা একভাবে বাণের জলে ভেসে এসেছে ।
বাংলা সাহিত্য কি কলকাতার আলাদা হয় নাকি ? কিংবা ঢাকার বাংলা সাহিত্য ? সামগ্রিকতার দাবীতে একক বাংলা ভাষার প্রচলন, প্রমিত বাংলা, অভিধানিক বাংলা, অকাদমী বাংলা । নানান কায়দা কেতা । সেই রকম একসময় সংস্কৃত ভাষাও ছিলো । আর মগধের 'প্র' নামের সাহিত্য চর্চা ধ্বজ্জিয়া উড়িয়ে দিয়েছিলো । পাশা কার পিঠে কে চড়ে । অধিক সংখ্যার ভারে পাশা পালটে যায় । আজ, নিজ বঙ্গভূমিতেই ঢাকার সাহিত্য চর্চাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চট্টগ্রাম তার নিজের ভাষা প্রতিষ্ঠিত করা ইচ্ছা প্রকাশ করছে । কলকাতা থেকে মুক্ত হয়ে গিয়েছে আগরতলার বাংলা সাহিত্য । ধানবাদ, জামশেদপুর, গৌহাটি, দিল্লি তাদের নিজের ভাষার উপর জাঁকিয়ে বসেছে । এই কথা স্বীকার্য বঙ্গভূমির বাংলা সাহিত্যকে ঘিরেই বাংলা ভাষার বিস্তার ঘটেছে । কিন্তু 'প্র' নামের বাঙালী , তারাও বাংলা ভাষার কাছে ততটাই ঋণী । তাদের কিছু অধিকার আছে , দায়িত্ব আছে, আছে সাহিত্য চর্চা করার মতো সামান্য কিছু আরমান । আমি যেহেতু দিল্লির প্রবাসী বাঙালী, সুতরাং উদাহরণ স্বরূপ, দিল্লির কিছু তথ্যচিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করি ।
দিল্লি বাংলা মূল ভূখণ্ডের বহুদূরে আরাবল্লি রিজের উপর ঘনয়-মাণ সাহিত্যের এই পুষ্প প্রকাশ পাচ্ছে নিয়মিত স্বাধীনতার পরপর থেকেই । এই মুহূর্তে ৫ টি অনলাইন বাংলা পত্রিকা ও ২০ খানা প্রিন্টেড বাংলা পত্রিকা দিল্লির সাহিত্যকে পথ দেখাচ্ছে । বাংলা বইমেলা হচ্ছে বছরে ৪ । দিল্লির বাংলা সাহিত্য যার শিকড় পাথুরে জমির অতল গভীরে ঢুকে আছে আর ইতিহাসের পাতায় পাতায় যা নিহিত রয়েছে । সেই শিকড় বেয়ে উপরে উঠে আসা সেই আকরিক যা বাংলা সাহিত্যের কবি, লেখক, নাট্যকারদের লেখনীতে ধরা পড়ছে । বাংলা থেকে দূর কোন এক্সকিউজ নয়, সাহিত্যমানের প্রতি দায়বদ্ধ আমাদের এই দিল্লির সাহিত্য প্রয়াস । দিল্লির বাংলা সাহিত্যের কর্মকাণ্ডে তাই কোলাবোরেশনের বড় একটা শ্রেয় থাকছে । বাংলা সাহিত্য এর কোর । ধনী, গরীব, পুরুষ , মহিলা, কেরানী, আই এস অফিসার , ডাক্তার, রোগী, ছোট, বড় ভেদ ভাও থেকে দূরে এই সাহিত্য চর্চার অবস্থান । এর কোন চাঁদা নেই, কোন মেম্বারশীপ নেই । কমিউনিটি ডেভেলপমেন্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দিল্লির বাংলা সাহিত্য । সোশ্যাল মিডিয়া এই ডেভেলপমেন্টকে ছড়িয়ে দিচ্ছে দিল্লির কোনায় কোনায় । দিল্লির কবি ও সাহিত্যিকদের নিয়ে খুব আশাবাদী কাজকর্ম শুরু হয়েছে ২০০০ পরবর্তী সময়ে । বেশ কয়েকজন সম্পাদক ও কবিদের ব্যক্তিগত লেখনী ও সাহিত্যপ্রয়াস উল্লেখযোগ্য এখানে । 'দিল্লি হাটার্স' সম্পাদনা করেছেন কবি দিলীপ ফৌজদার । পত্রিকাটি জনপ্রিয়তা একটা উচ্চতায় নিয়ে গেছে দিল্লির বাংলা সাহিত্যকে । দিল্লি হাটার্সের সুত্রপাত হয় আর একজন কবি প্রাণজি বসাকের বাড়িতে একটি সাহিত্য আড্ডায় । দিল্লির সাহিত্যে গতির সঞ্চার করেছেন কবি ও সম্পাদক অরুণ চক্রবর্তী তার প্রাংশু পত্রিকা ও দিল্লিব্যাপী বহির্বঙ্গ সাহিত্য আন্দোলনের মাধ্যমে । ২০১০ পরবর্তী সময়ে টেকলজী বুম , সোশাল মিডিয়া ও ইন্টারনেট সেবার জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে একদল তরুণ কবি, বাংলা কবিতার বিভিন্ন আঙ্গিক ও ভৌগলিকতাকে ব্যাবহার করে দিল্লির বুকে এক নতুন সাহিত্য সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন ।
দিল্লিতে একটা সাহিত্য আড্ডা গড়ে উঠেছে, অন-লাইন, অফ-লাইন মিলেমিশে । সোশাল মিডিয়াতে একটা গ্রুপ তৈরি করে, দিল্লিতে বসবাসকারী টেম্পোরারি ও পার্মানেন্ট, চাকরীর সূত্রে বাস করতে আসা সরকারী ও বেসরকারি, দিল্লির বুকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের বাঙালিদের নিয়ে । আমাদের পত্রিকাগুলির এইভাবে জন্ম যে আমরা প্রতিদিন যে সাহিত্য যাপনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, আমরা চাইছি, তা পত্রপত্রিকায় ধরা থাক । আরো ছড়িয়ে পড়ুক আমাদের সাহিত্য ভাবনা । দিল্লিবালা হিসাবে বৃহত্তর বাংলা সাহিত্য আমরাও কিছু সংযুক্ত করতে চাই ।
এইবার জেনে নেওয়া যাক, দিল্লিতে সাহিত্য চর্চা বলতে কি কি বুঝি ? দিল্লিতে কি কোনো পত্রিকা নেই ? এতদিন দিল্লিতে কোন সাহিত্য আড্ডা কি ছিলো না ? আমরা কিএটা আবিষ্কার করলাম, নাকি আগেও ছিলো ? প্রশ্ন থাকতে পারে, সাহিত্যে দিল্লির কোন অবদান আছে নাকি ? কিংবা দিল্লির বাংলা সাহিত্য ? নেই । সাহিত্যের কোন আবার দেশ হয় নাকি ? কিংবা কোন ভৌগলিক বিভাজন ? আমিও মনে করি নেই । যেভাবে জাপানেরও কোন নিজস্ব সাহিত্য নেই, কোরিয়ার সাহিত্যও আলাদা নয় । ব্রাজিলেরও কোন পৃথক সাহিত্য নেই, স্পেনেরও কোন নিজস্ব সাহিত্য নেই । সাহিত্যে কোন ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য থাকে নাকি ? রুশ ভাষার সাহিত্যে এমন কি আছে ? কিংবা ইজরায়েলের তো কোন সাহিত্য থাকতে পারে না । কারণ সাহিত্যের কোন ভৌগলিক সীমারেখা নেই । অন্ততঃ তাই মেনে নিয়েছি প্রথমে । কিন্তু এইবার তার উত্তর দেওয়া যাক ।
দিল্লির সাহিত্যের ইতিহাস অনেক দিনের । বাংলা চর্চার ইতিহাসও আমার জন্মের আগের । চিত্তরঞ্জন পাকড়াশীর "দিল্লির বাঙ্গালি" বইটিকে যদি রেফারেন্স ধরি, ১৮৩৭ সালের প্রথম বাঙ্গালি হিসাবে উমাচরণ বসুর নাম উল্লেখ করতে হয় , আর ছাপাখানার উল্লেখ করতে গেলে তারিখ আসে ১৮৮৩ সালে আই এম এইচ প্রেস প্রতিষ্ঠানের । সাহিত্য আড্ডার সন তারিখ হিসাবে ১৯৩০ সালের কথা আসে যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এসেছেন দিল্লিতে । চণ্ডালিকা, শ্যামা ইত্যাদি নিয়ে রিগ্যাল সিনেমা হলে নানান নৃত্যানুষ্ঠান করেছেন যেখানে অনুষ্ঠান দেখতে এসেছিলেন মহাত্মাগান্ধী নিজে । নাটকের কথা হলে, ১৯৩৩ সালে নিউ দিল্লি বেঙ্গলি ক্লাব বাংলা নাটক মঞ্চস্থ করে । ছবি আঁকার মোটামুটি একটা তারিখ পাওয়া যাচ্ছে ১৯১৮ । সারদা উকিল আর দিল্লির রাইস আদমি সুলতান সিং মিলে রুক্ষ-শুষ্ক-অতীত ঐশ্বর্যের ভগ্নস্তূপে ভরা দিল্লিতে চিত্রকলাপিঠে পরিণত করেন । লিখিত সাহিত্য আড্ডার যেরকম তারিখ পাওয়া যাচ্ছে তা স্বাধীনতা পরবর্তী যুগে । চাণক্য সেনের 'ইন্দ্রপ্রস্থ' সাহিত্য পত্রিকা কে দিয়ে শুরু করলে তা মোটামুটি ১৯৬০ সালের দিকে পড়ে।
এই এতকথার অবতারণা করা উদ্দেশ্য হলো, এই আমাদের সাহিত্য প্রচেষ্টা দিল্লির বুকে নয়া কিছু না । বরং বলা যায় অপরিষ্কার ধারণা আমাদের মধ্যেই রয়েছে কারণ এই প্রচেষ্টার যথাযথ ডকুমেন্টেশন হয় নি আর সেযুগে গুগল বলেও কিছু ছিলো না । কলকাতাপ্রেমী বাংলা সাহিত্য অন্য এলাকার ভাষা বা সাহিত্যকে তেমন গুরুত্ব কখনোই দেয়নি । বাংলা মিডিয়া বলতে যা বোঝায় তা কলকাতা বা ঢাকার, তারা এই এতদূর দিল্লির শহরের সাহিত্য নিয়ে কেনই বা মাথা ঘামাবেন ? এই ২০২৩ তে দাঁড়িয়ে এখনো যদি আমরা ডকুমেন্টেশন ও সাহিত্য প্রচেষ্টা ডিজিটাইজড না করি আমাদের এই সাহিত্য প্রয়াস ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বলে অকালেই কালের অন্ধকার পাতালগৃহে ধুলো গড়াগড়ি খাবে ।
কারা দিল্লির লেখক ? দিল্লিতে ঠিক কতজন বাঙালি লেখক আছেন ? কতগুলি পত্রিকা ? আমার কাছে সঠিক তথ্য নেই । অনুমান আছে । এ ছাড়াও বিভিন্ন ক্লাব, সমাজ, কালীবাড়ি, এসোসিয়েশন দুর্গাপূজার ব্রোসিওর বের করে থাকেন । তাতেও অনেক লেখকের আনাগোনা থাকে । এছাড়াও দিল্লিতে রয়েছে নাট্যগোষ্ঠী যারা নিজেদের নাটক নিজেরাই লিখে চলেছেন । আমার আন্দাজ মতো দেড়শত সিরিয়াস কবি/ গল্পকার/নাট্যকার দিল্লিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন আর অন্যান্য শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার সুবাদে অভিনেতা, চিত্রকর, সঙ্গীতকার, বাচিক শিল্পী, গৃহবধূরাও কবিতা লিখছেন । এই সমস্ত লেখার কি গুণাগুণ, কালের বিচারে তারা কোথায় অবস্থান করবে সেই সিদ্ধান্ত আমার কাছে নেই, আমি মোটামুটি নিজের দায়িত্বজ্ঞানে বুঝলাম , এই সাহিত্য প্রয়াস কোথাও লিপিবদ্ধ থাক ।
এইবার দিল্লির সাহিত্যের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা যাক । বর্তমান দিল্লির বিভিন্ন-কোণে চলছে সাহিত্য প্রয়াস । বিভিন্ন পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গ্রুপ ও লিখিত সাহিত্যের বিকাশ ঘটছে । পত্রিকাগুলি পৌঁছে যাচ্ছে কলকাতা, শিলিগুড়ি, মুম্বাই, পুনে, ব্যাঙ্গালোর । দিল্লির বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডা ও সঙ্গীত এর উচ্চতা সম্পর্কে আর ২২ লক্ষ বাঙ্গালির সন্দেহ নেই । সি আর পার্ক, নয়ডা, দ্বারকা, বসন্তকুঞ্জ, মুক্তধারায় সারাবছর চলছে বাংলা অনুষ্ঠান । বাংলাদেশ হাই কমিশনে ঢাকার বাঙালি শিল্পীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলা অনুষ্ঠান পরিবেশন করছেন দিল্লির সাহিত্য-গ্রুপ । এই সমস্ত সাহিত্য প্রয়াস এত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, আর সহস্র সাল পুরানো দিল্লি শহরের এত ব্যাপ্তি যে এতটা এলাকার কবি, শিল্পী, নাট্যকারদের প্রচেষ্টাকে একসাথে করাটা একটা চ্যালেঞ্জ । ছোট ছোট গ্রুপে কাজ করে দিল্লির সাহিত্য গোষ্ঠী গুলো । শ্রেণী বিভেদ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, ইগোক্লাস, অর্থনীতি, অন্যান্য ভাষার প্রাধান্য মূল সমস্যা । বাংলা ছাত্র কমে যাচ্ছে স্কুল থেকে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে যাচ্ছে বাংলা বিভাগ । এমত অবস্থায় নিয়মিত সাহিত্য আসর চালিয়ে যাওয়া, লাইক-মাইন্ডের লোকদের সাহিত্য আলোচনা প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে । এই সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে দূরত্ব আর যানজট সমস্যায় জর্জরিত দিল্লি দারুণ ইঁদুর দৌড়ের যাপনে সাহিত্য প্রয়াস বিচ্ছিন্ন প্রায় । দিল্লি-কেন্দ্রিক কোন সঠিক মিডিয়া বা নিয়মিত সংবাদপত্র না থাকায় দিল্লির সাহিত্যের লাইফ-লাইন ধরা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে । দিল্লির সাহিত্য সম্পর্কে জানার মত আজ গুগলেও কিছু গড়ে ওঠেনি । দিল্লি এন সি আর এলাকার কবি, গল্পকারদের মিলন মেলার জন্য একটা ভার্চুয়াল আড্ডার দরকার ছিলো যা এখন 'দিল্লির বাংলা সাহিত্য' গ্রুপের মাধ্যমে বাস্তবায়িত। এই সঙ্গে জুড়ে আছেন লেখক ও পাঠক দুই গোষ্ঠীই । তাদের কমিউনিকেশনের জন্য আজ বোধহয় টেকনোলোজি বড় হাতিয়ার কিছু নেই । ইন্টারনেট আমাদের এই প্রয়াসকে অনেক সহজ করে দিয়েছে ।
দিল্লির হাতে গোনা লিটল ম্যাগাজিন, ওয়েবজিন, তাদের দুএকটি ম্যাগাজিন ছাড়া প্রায় পত্রিকাগুলি অনিয়মিত, এবং তা চরম ভাবেই স্বাভাবিক । এটাই দিল্লির বাংলা সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য । দিল্লির কি নিজস্ব সাহিত্য চরিত্র থাকতে পারে ? সাহিত্যে কি ভৌগলিক বলে কিছু হয় ? যেখানে ভাষাটা এক ।
এ এমন একটা জরুরী বিষয়, যেখানে কোন স্ট্যাম্প মারা সিদ্ধান্ত দেওয়া যাচ্ছে না দিল্লি বাংলা সাহিত্যের কাছে বিরাট কিছু দৃষ্টান্ত, কিন্তু একটা বিশ্বাস তো করাই যায় যে দিল্লির নিজস্ব একটা বিষয় আছে ? বৃহত্তর বৃত্ত থেকে আলাদা করে ক্ষুদ্রতর গণ্ডির ভিতর কিছু কি সৃষ্টিশীল থাকতে পারে ?
ডায়াস্পোরা নিয়ে কথা হয়, দিল্লির বাংলা শব্দে হরিয়ানভি ঠাট্ , বরিশালের গাংচিল আর রংপুরের লালমাটির মত স্পষ্ট । তো জাহির হে, বাংলাকে শুদ্ধ বাংলা বলতে যত প্রয়াসই হোক, আমরা আরাবল্লির মাটির গন্ধকে কি করে ভুলে যাই ?
তাহলে দিল্লি থেকে এতদিন ধরে আর কি লিখছি আমরা ? কিছুটা ক্লোন, কিছুটা স্মৃতি, নাকি ঢাকা কলকাতা থেকে আগত সাংস্কৃতিক চর্চা । এটা দিয়েই শুরু, কিন্তু এইভাবে রিং রোড বরাবর হাঁটতে থাকলে আপনি একটা ডেভিয়েশন দেখতে পাবেন, জলবায়ু থেকে কিভাবে জলীয়বাষ্প উধাও । এই শহরে এসে ঘিরে বসেছে রাজধানী , সি আর পার্ক, কালকাজী , গোল মার্কেট, কারোল বাগ, দ্বারকা, মহাবীর এনক্লেভ, নয়ডার বিভিন্ন সেক্টরে বাঙালি কলোনি । ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বাংলা বসতি । লোক মুখে শোনা বাইশ লক্ষ বাঙ্গালির বাস । তো এতো বাঙ্গালী দুই দুটো বাংলা(প্র)দেশ থাকা স্বত্বেও এখানে কি করছে ?
যেটা করছে, সেটা উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, বিহারেও করছে । যেটা নিয়ে তর্ক সেটা রাজনৈতিক, যেটা নিয়ে সমস্যা সেটা জনসংখ্যা, যেটা নিয়ে প্রশ্ন সেটা খাদ্য আর যেটা নিয়ে যাপন তা হল বাংলা । সুতরাং যেটা হারালো , সেটা দেশ, যেটা আক্রান্ত সেটা ভাষা, আর যেটা নিয়ে বাঁচা তা হল বিশ্বাস , তা হল নিজস্বতা । আমাদের নিজের কি কোন চরিত্র আছে ?
আছে । বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর । একবার কুতুব মিনারের গায়ে হাত দিয়ে দেখুন, একবার যমুনায় পা ডুবিয়ে দেখুন, এক মধ্য রাতে ইন্ডিয়া গেট, এক দুপুরে খুনি দরবাজা , এক জানুয়ারিতে লোধী গার্ডেন, এক ফেব্রুয়ারিতে হুমায়ুন টমে বোঝা যায় ভারতবর্ষের কৈশোর, ইতিহাসের যৌবন, আর পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের অবয়ব রাইসিনা হিলস । এই হলো দিল্লি ।
আর যারা আরাবল্লির মাটির গন্ধ পাননি, যমুনার জলে স্রোতের আওয়াজ শোনেননি, লাল কিলার পাথর ছুঁয়ে ইতিহাস অনুভব করেন নি , তিনি এতো বছর রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই জলবায়ুর নমক খেয়েও এখনো দিল্লিকে গ্রহণ করে উঠতে পারেন নাই । না ঘরকা , না ঘাট কা ।
দিল্লি শান্ত হয়ে এসেছে । চারিদিকে এত পল্যুশন, তাতেও রাজধানীতে রাজনীতির কোন বিরাম নেই । ক্ষমতালোভী আর চেয়ারপ্রিয় মানুষের দিনলিপিকায় একরকম গরমগরমী । কেউ ছত্রিশ, কেউ ছেচল্লিশ বছরের রাজপাঠ নিয়ে কেশর ঝেড়ে তেড়ে আসছেন সাহিত্যের আখড়াতেও । যমুনা কাউকেই ফেরায় না। হিণ্ডন ও বয়ে চলেছে মানবজঙ্গলের কংক্রিট নিয়ে । হাইওয়ে চলেছে পবনপুত্রের গতি নিয়ে দিক্বিদিক । সুতরাং একদা এই পৃথ্বীরাজের গ্রিন দিল্লিতে যা বাকি থাকে তা হলো মৃত বহ্নিশিখার হলুদ আস্ফালন । আগুন ছড়িয়ে পড়ছে হাইওয়ের দুপাশের পাঞ্জাবী ধাবায়, আগুন লেগে আছে তরুণ প্রজন্মের লেখনীর ক্ষুরধারায় , যাকিছু পরবাস, যাকিছু ছিন্নমূলের কথা, তাতেই লেখা হচ্ছে অলিখিত মাইগ্রেটেড জনমানসের জীবনকথা । দলবাজিতে বাজীমারা মোটা মাথা মানুষদের কোন ধারণাই হচ্ছে না সাহিত্যে কোথা থেকে উঠে এলো ডায়াস্পোরা চিন্তা ধারা, ভাষা সংকরায়নের বীজ, শাহি দিল্লির মৌলিক অনুষঙ্গ । ইন্দ্রপ্রস্থের উপকণ্ঠে দিল্লির বাংলা সাহিত্যের চোরা স্রোত কখন যে যমুনায় এসে একান্ত নিজস্ব মৌলিক চেহারা নিয়েছে । খেয়াল করে নাই কেউ ।
একটা কথা যেটা সবার জানা, যমুনা দিয়ে চলে গেছে অনেক ইড্রাস্ট্রিয়াল ওয়েস্ট মিশ্রিত জল । যমুনার কালো নিয়ে যখন দিল্লির পথযাত্রীগণ নিজেরাই থমকে দাঁড়ায় না, তবে ভিন প্রদেশের চোখে সেই কালোর বৈশিষ্ট্য কি করে ধরা পড়বে ? দিল্লির সাহিত্যকারেরা সত্যিই কি চিন্তিত এই বিষয় নিয়ে ? নাকি রাজ্য দখলের লড়াইয়ে কাটিয়ে দেবেন নিজেদের বাংলা ও বাঙ্গালী জীবন ? অবশ্য এই কথাও জানবেন , যে কোন উত্থানেই নিহিত রয়েছে সম্ভাব্য পতনের বীজ । সে আপনি পঞ্চাশ বছর রাজত্ব করুন বা পঁয়তাল্লিশ ।
এ হেন একটা পারপ্লেক্সড সিচুয়েশনে একটা প্রশ্ন উঠে আসে । দিল্লির বাংলা সাহিত্যটা কি বস্তু । প্রশ্নটা স্বাভাবিক । দিল্লি থেকে লেখা সাহিত্য কেই কি বলা যেতে পারে দিল্লির বাংলা সাহিত্য ? দিল্লির বাংলা সাহিত্যের একটা সীমা নির্ধারণ করা যাক । "হ্যাঁ" আরও একটু সংজ্ঞায়িত করা যাক ।
দিল্লির বাংলা সাহিত্য একটা কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট । সামাজিক ও ভৌগলিক অবস্থান । একটা ইকো-সিস্টেম যা বেড়ে ওঠে বহুস্বরে । ন্যাচারাল প্রসেস । কেউ সেখানে চোখ রাঙায় না, চেয়ার বাঁচানোর জন্য সাহিত্যধারাকে জলাঞ্জলি দেয় না । মতপ্রকাশের অবাধ অধিকার থাকে । কেউ কাউকে ভয় পায় না । ধর্ম, জাতি, ধনী, গরীব, অফিসার কেরানী ভেদাভেদ থাকে না । সাহিত্য ধারনাকে সামনে রেখে বেড়ে ওঠে কমিউনিটি ।
দিল্লির অনুষঙ্গে লেখা সাহিত্যের নাম দিল্লির বাংলা সাহিত্য । এর জন্য সত্যিই দিল্লিতে বাস করা বাধ্যতামূলক নয় । দিল্লি অঞ্চলের বাংলা কবি , লেখক, নাট্যকারদের নিয়ে এই সাহিত্য কমিউনিটি গঠন করা হলেও এর মূলে থাকছে সাহিত্যে দিল্লির নিজস্ব স্বাদ । কি করে ধরা যাবে দিল্লির নিজস্ব স্বাদ ? কি করে আলাদা করা যাবে দিল্লির বাংলা সাহিত্য ? কিংবা দিল্লির সাহিত্য ও কলকাতার সাহিত্য আলাদা হয় নাকি - এই রকম প্রশ্ন চলে আসছে । কেন এই আঞ্চলিক বিভাজন ?
বিভাজন তো একটা আছে । বিভাজনটা মানুষ বা দলবাজির নয় । দিল্লির বাংলা সাহিত্য একটা বিশ্বাস । দিল্লিকে বিষয় করে নিয়ে লেখা সাহিত্য । সেটা হতে পারে গল্প, হতে পারে কবিতা, উপন্যাস । দিল্লির পটভূমিকায় আঁকা ছবি, অভিনয় করা নাটক ও হতে পারে । দিল্লির ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক অবস্থান যা যেকোনো দিন ঢাকা বা কলকাতা থেকে আলাদা । সুতরাং দিল্লির অনুষঙ্গ, বিষয়, চিন্তা, ভূত ভবিষ্যৎ আলাদা হবে । দিল্লির খাবার, দিল্লির পোশাক, দিল্লির স্লোগান আলাদা হবে । এমন কি চুমু খাওয়ার ধরন ও চুমু খাওয়ার সময় ঠোঁটে লবণের মাত্রায় ফারাক নজরে আসবে ।
এখানেই প্রবাস, এখানে বাসরুট । এখানেই প্রবন্ধ । এখানেই বিংগো । ডিজিটাল ভবিষ্যতের অঙ্কুরোদগমের অবকাশ । ডকুমেন্টেশন হয়ে ওয়েবে ওয়েবে ছড়িয়ে পড়বে দিল্লির সাহিত্য চিন্তাধারা । লাইব্রেরীর কালকুঠুরীর অতল তলে ধুল খাওয়া পত্রিকায় উইপোকার খাদ্য না হয়ে গুগল, বিং , ইয়াহু সার্চে উঠে আসবে দিল্লির কবিদের নাম । দিল্লির সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হবে ফোরামে ফোরামে ।
যতটা না ছিলো গুটি গুটি পা, নিন্দুকের চোখে বন্দুক রেখে ততটাই রুখে দাঁড়ায় বারুদবরণ আরাবল্লি রিজ । ওখানে গ্রীষ্ম, ওখানে বর্ষা । ওখানে সাতচল্লিশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড । তবুও পত্রে পত্রে সবুজের প্রজ্বলিত আভা, কণ্টকময় বৃক্ষের রুক্ষ প্রশাখায় নীড় বাঁধে তবুও বিহঙ্গ - সযত্নে ডিম পাড়ে , যারা নিজেরাই কোন একসময় ঘুমন্ত ছিলো উক্ত ডিমের ভিতরে । অভিভাবকহীন বেড়ে ওঠা এই সাহিত্যপত্র । মালিকানাহীন বঞ্জর পানিপথে যখন যমুনা ছুটেছে একলা, কোন আফগানী শেরশাহ এইসব বৃক্ষের গায়ে এঁকে দিলেন শিলমোহর । গ্র্যাডিয়েন্ট বরাবর ক্রমশ ছুটে যাওয়া সমগ্র মুঘল বাহিনী, ধুলোয় ভরে ওঠা মেহরাম-নগর । অস্পষ্ট হয়ে আসে দিল্লির শতাব্দী পুরানো খাপ । চারিদিকে আকাশচুম্বী বাড়ি, ব্যস্ত সড়কে বেড়ে ওঠা গতিবেগের প্রতিযোগিতা, জমি দখলের লড়াই । এর ভিতর জন্ম নিলো দিল্লির বাংলা সাহিত্য, যার নিজস্ব শরীর দিয়ে তৈরি নিজেরই তোরণ, যার নিজস্ব গতি দিয়ে সামান্য এই সাহিত্য যাত্রা । যে কেউ আরোহী এর হতে পারেন, যে কেও সারথি । এই পুরানো ইটের চাতাল, এই রুক্ষ প্রেমের বুদ্ধ-জয়ন্তী পার্ক, আবহাওয়ায় কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিয়ে দিল্লির বাংলা সাহিত্যের সহবস্থান । যে কেউ হতে পারেন দিল্লির বাংলা সাহিত্যের লেখক কবি । দিল্লিতে বসবাসকারী বাঙালি প্রথম জন্ম, দ্বিতীয় জন্মের কবি । দিল্লির বাংলা সাহিত্য মানে সারভাইভ্যাল, ভৌগলিক চেতনার অভিপ্রকাশ, দিল্লির বাংলা সাহিত্য মানে সবুজের হাতছানি, মুহূর্তযাপনের নাগরিক চিত্রকল্প, র্যাটরেসের প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে বেরোনো ব্যাঘ্র শাবক ।
দিল্লির সাহিত্য জগত বলে নানান বিভ্রান্তি আছে । দিল্লির বাংলা সাহিত্য নিয়ে আরো বিভ্রান্তি । সাহিত্যে ভাষার এটাচ করা যায় না । নাকি যায় ? সাহিত্যে শহরও এটাচ করা যায় না । নাকি যায় ? কত কিছুই তো করা যায় না । কেউ কেউ বলছে যায় । খাণ্ডবদাহে যখন পুড়ে যাওয়া জঙ্গল একটা বিশ্বাস মাত্র । ইন্দ্রপ্রস্থ একটা বিশ্বাস । কি বলছেন , বিশ্বাস তো । সেই রকম বিন্দু বিন্দু রেখা একটা বিশ্বাস, দ্রাঘিমা একটা বিশ্বাস । সময় ? সময় তো একটা বিশ্বাস ! সময় অনেক কিছু বদলে দেয়, সময় অনেক কিছু নির্ধারণ করে । দিল্লির সাহিত্যপিপাসু জনতা নিজেরাই নিজেদের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলো ।
যে কোন শহরের এই চরিত্র হতে পারে । গ্রাম কেটে শহরে পাড়ি দেন জনপ্রবাহ । শহরের নিজের কোন নন্দন-তত্ব থাকে না । আপাত দৃষ্টিতে, তার কোন ব্যথা, দুঃখ, বিষাদ নেই । তার চোখে এক উদাসীনতা, তার অধরে এক ধুসর জগতের শুষ্কতা , যার চোখের পাতায় পাতায় এক ক্রমবিকাশের রক্তক্ষরণ । তার কান্না নাই । আগুনে ঝলসে ওঠে লাল কোট, পানিপথের বুকে দ্রুত শুকোতে থাকা যমুনা , কোন সম্রাট জাহাঙ্গীর বুঝি তার বজরা নিয়ে পৌঁছাবেন না কালিন্দিকুঞ্জের ঘাটে । আগুন নিয়ে খেলতে থাকেন আজকের শিশু, আবহাওয়ায় জ্বলতে থাকে দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস । দিল্লির পথে পথে পড়ে আছে সেই ইতিহাস চিহ্ন, রাজঘাটে সমাধি হয়ে জ্বলতে থাকেন মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী ।
কি গল্প হবে ? কাহিনীর বিপরীতে চাইতো এক খলনায়ক । যার অভিঘাতে রাখা হবে একটি তরমুজ কাটার আখ্যান । সর্বহারার সার্বভৌমতা । কোমল ভাবে মিশিয়ে দেওয়া হবে কড়ি, শৈশবের অপূর্ণ অভিলাষ, কৈশোরের প্রেম নিবেদনের ব্যর্থতা, যৌবনের বাংলা , মধ্যমেধার বাঙ্গালি ও বিষয় বিবেচনায় সমাজসেবা । হায় ! সেই রামও নাই , সেই রাবণ ও । ইংরাজ বিদায় নিয়েছে, তাই সেই স্লোগানও আর নাই । হায় থ্যানোস - কি লিখি তোমায় ? গ্যালাক্সির অর্ধ জনসংখ্যার আচমকা হ্রাস কোন কাব্যরস হতে পারে না । কোন রূপ রস গন্ধ হতে পারে না । কাব্যকথার জন্য যা চরমভাবে প্রয়োজনীয় । যদি ধরা হয়, আর ২৮ কোটি বাঙালি, অর্ধ জনসংখ্যা ১৪ কোটি । যাদেরকে আমরা ধরে নিতে পারি যে, তাদের কাছে একটি স্মার্ট ফোন আছে । মানে, প্রত্যেকের কাছে একটি একটি ফেসবুক অ্যাপলিকেশন রয়েছে । এইমতো অবস্থায়, প্রত্যেক ফোনের মালিক হবেন একজন বাংলা সাহিত্যের পাঠক । এবং সে একটি গল্প চায় ।
ক্রিয়েটিভ লেখনীর ভৌগলিক চরিত্র মাল্টিপ্লাই করছে ভাইরাসের গতিতে । দিল্লির বাংলা সাহিত্য সেখানে চাইছে, নিজস্ব পরিচয় । নিজের রক্তের ভিতর ঘুরতে থাকা এক বিশ্ব । নিজের আবর্তনে বুঝে নিতে চায় অস্তিত্ব । যেভাবে দিল্লি ফিরে আসে গল্পে । সহস্রবছরের দিল্লি, খাণ্ডবদাহের আগুনখেলা, ময়দানবের ইন্দ্রপ্রস্থ, অনঙ্গপালের লাল-কোট, চৌহান রাজের রাই কিলা পিথোরা । ইলতুতমিসের কুতুবমিনার । শূন্যকালের পরে যদিও কোন কাল থাকে না । গল্প তো এক প্রবহমান । না আশীর্বাদ, না অভিশাপ । মহানগরীর চরিত্রে এক নাটক বদল । দিল্লির বাংলা সাহিত্য স্ট্যান্স নেয় সেই ব্যস্ত বাজারে । রাজপথে ওলা, উবের, সি এন জি অটোদের ভিড় । প্রেস কর্নারে চুটিয়ে চলছে রাজধানীর রাজনৈতিক বাকবিতণ্ডা , দিল্লি হাটে বিদেশী পসরার বিকিকিনি । দিল্লি হাটার্সদের পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে তরুণ প্রজন্মের দিল্লির বাংলা সাহিত্য ।
দিল্লি এক অদ্ভুত শহর । লাল কিলার পাথর ছুঁয়ে দেখি - এক ইতিহাসের মর্মরধ্বনি । দিল্লির সেই গল্পের কোন ঘাটতি নেই । দিল্লির বাংলা সাহিত্যের কাছে তার এই প্রার্থনা , দিল্লির নিজস্ব চরিত্র, রূপ, রং, পান, পিক, দেওয়াল, অট্টালিকা এই হোক তার সাহিত্য অনুষঙ্গ । যে রক্ত এতদিন ধুয়েছে গঙ্গা অববাহিকার বিন্দু জল, তাতে মিশে যাক যমুনার কালো । যাকে আমরা মঞ্জিল বলে মানিনি, যাকে আমরা ভাগ্য বলে গ্রহণ করিনি, অথচ খাদ্য বস্ত্রের সন্ধানে মাইগ্রেশন করে আমাদের পার করে আসতে হয়েছে শোন, সরযূ ফল্গু । এই এত দূর, দিল্লি দিলওয়ালোঁ কা শেহ্র । আমাদের রক্তে ক্রমশ প্রবেশ করছে - সারভাইভাল, আমাদের রক্তে মিশে যাচ্ছে বিজাতীয় জাতীয়তাবোধ । মননে, চিন্তনে রং ধরেছে দিল্লির ধূসরতা, চেতনায় ফুটে উঠেছে ইন্দ্রপ্রস্থের সবুজ । দিল্লির বাংলা সাহিত্য চায় তাদের একাত্ম করতে । যে কোন পরবাসে অবশ্যম্ভাবী দেওয়াললিখনকে গ্রহণ করার নাম ভাগ্য, আর তাকে ভালোবাসে আপন করে নেওয়ার নাম দিল্লির বাংলা সাহিত্য । সাহিত্য ধারনার এই ভঙ্গুর কিনারায় বসে আমরা দেখতে চাই তার ঐতিহাসিক উত্তরণ ।
দিল্লি বাংলা সাহিত্যকে কি দিতে পারে ? বাংলা সাহিত্যের কিছু কম পড়িয়াছে বলে ঢাকা মনে করে না । তেমনই মনে করে না নন্দন কাননের কলিকাতার বাংলা সাহিত্য । বাংলা নিজেই যারা বলছিলো, বাংলা ইউনিভার্সাল । সেখানে ঢাকা ও কলকাতা আলাদা আলাদা অবস্থান করছে। দিল্লি কেন নয় ? কেন দিল্লির দিলীপ ফৌজদার, গৌতম দাশগুপ্ত, প্রাণজি বসাক, চাণক্য সেন, আদিত্য সেন, মনিরত্ন মুখোপাধ্যায়, সেবাব্রত চৌধুরীরা কলকাতায় ব্রাত্য । কেন তাদের ঢাকার কবিতা আড্ডায় পড়া হবে না ? নাকি তাদের পরখ করা হবে না । কেন না তারা 'প্র' নামের দরজা দ্বারা 'বন্ধ' ? যারা নিজেরাই আওয়াজ তুলছেন সাহিত্য হবে উন্মুক্ত, বিশ্বময় তারা কেন এতো গন্ডীবদ্ধ ? কিসের এই উন্নাসিকতা ? একবার 'বিষ বাগিচায় ফুল ফুটে আছে' অথবা 'শাহরান পুরের চিঠি' পড়ে দেখুন । দেখুন বাংলা ভাষার প্রতি তাদের কি দায়িত্ববোধ । প্রশ্ন হচ্ছে , এই প্রবাস যাত্রায় - ডায়াস্পোরা কবিতা লেখা কি ঠিক ? কারা পড়বেন এই কবিতা ? দিল্লিতো নিজেই নিজের অহমিকায় রাজধানী । রাজার কাছে কবিতা পড়ার জন্য সময় নাই । যদি, প্রজার কাছে যাই, তার ঘরে খাবার নাই, তাকে ছুটতে হয় টোয়েন্টি ফোর বা সেভেন । দিল্লি তাঁকে খাবার দেবেন, তবে প্রজা খাবেন । প্রজা দিল্লিকে লিখবেন । বড় কঠিন হেঁয়ালি ভাই । রাজা গদি বাঁচাবেন নাকি ক্ষেতখামার করবেন সেতো ইতিহাস বলবেন, এই মুহূর্তে সঠিক মার্গ আমাদের কারো জানা নেই । স্বয়ং ঈশ্বরের ঘরে তালা মারা । এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে খুঁজতে আলফা সেঞ্চুরির কোন এক সাম্রাজ্য কোন এক আলোকবর্ষ দূরে আমাদের ঈশারা করে । আমরা তার গোপন গতি দেখি । ঐ দ্যাখো চাঁদ পূবের আকাশে আবার উঠেছে ।
এমনই একটা সময়, ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্রতা । সংবাদ আর সংবেদন যখন মুঠো মুঠো বাজারে বিকোচ্ছে । এমন বিস্তারিত বোধহয় সুররিয়ালিজমও আকার পায় না । যে সমস্ত ব্রেন ও ব্রেভ এইরকম ভেবেছিলো, প্রকাশ করেছিলো এই এক দশক আগেও, তাদেরকে সেই সময় আমরা ফুত করে উড়িয়ে দিয়েছি । আজ আমরা বুঝতে পারি আমাদের অগ্রজরাই এই সমস্ত প্রেডিক্ট করে গেছেন । সমগ্রতা এখন বলা যায় একটা সম্পৃক্তির দিকে যাচ্ছে । এতো ইনফরমেশন বুম, মানব সভ্যতার ইতিহাসে দেখা যায় নি । এতোটা বাজার সর্বস্বতা, পণ্যময় পৃথিবী, ধবনিময় কবিতা আগে দেখা যায়নি । কবি দীপঙ্কর দত্ত আমাদেরকে ইশারা করেছেন পাওয়ার পোয়েট্রির দিকে । যখন আধুনিক সাহিত্যধারা পর্যায়ক্রমে উত্তর আধুনিক সাহিত্যের গতিপথে যাত্রা করলো, অথচ বিলীন হয়ে গেলো না। বরং একটা গতির সমান্তরাল দেখা দিলো । এবং গতিটা এক রৈখিক না । জ্যামিতিক হওয়ার দিকে এগিয়ে গেলো । ভৌগলিক হবার দিকে পাড়ি দিলো । কবি, দীপঙ্কর দত্ত বললেন হাটের মাঝে কবিতা পড়ে, হাটের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সময় এসেছে । এখানেই পাওয়ার পোয়েট্রি । পাওয়ার একটি গণিত বিশেষ । সমগ্রতার কবিতা ।
দিল্লির নিজস্ব চিন্তা, আপনাপন, ভাষা, ছন্দ, দূর-অবস্থান নিয়ে কোন স্থির ম্যানিফেস্টো নেই । স্থিরও নেই । স্থিরতা একটি ভঙ্গুর ধারনা । যাত্রাই একমাত্র ধ্রুব । হে, সেভেন সিক্সটি ফোর, হে আমার বাসরুট, তুমি এই ধারণাকে মহান করো । নিজে পবিত্র হয়ে যাও । ইতিহাস বলে যাদের হাত কামড়ালো, তারা হরিষেনের বাউলিতে এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে । সবুজ টিয়া আর বসন্তের এই হাওয়া নিয়ে তাদেরকে এক শূন্যতর সাহিত্যের পাঠ দাবী করে । তুমি তাদের পড়ো ।
Comments
Post a Comment