প্রকাশকের
কথাঃ
যাপনের
একটা অধিকার যে কোন শিল্পেই সুপ্ত থাকে, তা সে যে কোন ভৌগোলিকেই হোক ।
চারিদিকে ঘিরে থাকে সময় পরিধি । আর তাকে পরিভ্রমণ করেন সভ্যতার একক জীবন, আমাদের অন্তরবীণার তার বেজে ওঠে । একটা তার, দুটো তার । সহস্র তার । সুর সঙ্গমে বেজে ওঠে পাত্র ও পাত্রী । স্থান কাল
পাত্রে যাপিত হয় শিল্প । ইন্দ্রপ্রস্থের এহেন শিল্পের ভূমিকায় কখন যেন দিল্লির কবিতা বেজে ওঠে ।
কবিতায় দিন হয়, কবিতায় চাঁদ হয়, কবিতা হয় মোহিনীমনোহর সোহাগ ।
কবি সুতপা ঘোষ দস্তিদার এমন এক ছন্দ-ছায়ার কবি, শাহজানাবাদের নূর । দিল্লির মাটিতে বসে বাংলা ভাষায় কবিতার চর্চা তার দীর্ঘদিনের । কবিতাগুলো আশ্চর্য ভাবে এক অনুভূতির, বিস্ময় ভাবে ভেবে দেখার এক গভীরতম উপলব্ধির । মনের মানসে লুকিয়ে থাকা শব্দপ্রাচুর্য, চেতনায় সুপ্ত থাকা অবিরল কথার মাঝে শিল্প ঘুমিয়ে থাকে । তাকে জাগাতে হয়। কবি তার যাপনসিদ্ধকলায় তাকে মূর্ত করে তোলেন । দীর্ঘদিনের পথ আর নাগরিক জীবনের বেড়ে ওঠা, পরিপার্শ্ব, দেশ, পরিবেশ নিয়ে চলে তার অক্ষর যাপন । বাংলা বর্ণমালায় তাকে দেন অবয়ব । কবির কথায়ঃ "সে আলো আমি / গায়ে মাখি, মাথায় বুকে / আরও গভীরের কোনো চোরা কুঠুরিতে / কয়েদী হয়ে আছে যে কথারা / বহু যুগ ধরে, তারা আজ / আলোকস্নান করে আশ্লেষে " ।
দিল্লি, ভারতের রাজধানী । প্রায় ২২ লক্ষ বাঙালির বাস । দিল্লি
এনসিআর, অর্থাৎ বৃহত্তর দিল্লির প্রাঙ্গণে
একটি বিশাল ইকো সিস্টেমে বাঙালী যাপন করাই একটি চ্যালেঞ্জ । সেইখানে বাঙালি অস্তিত্ব বজিয়ে রাখা আমাদের
অহংকার । রুক্ষ আরাবল্লির শুষ্ক পরিবেশে একজন সুজলা সুফলা বাঙ্গালিকে ছেড়ে দিলে সে দিশাহারা হয়ে ওঠে । যেখানে শ্যামল বলতে বাবলা গাছ , নদী বলতে ইন্ডাস্ট্রি বর্জ্য পদার্থ ডাম্প করা কালো জলের
যমুনা । রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস নিয়ে দিল্লির মাটি যেন পুড়ে রক্ত রাঙা লাল হয়ে আছে । সেখানে বসে
বাংলা ভাষায় কবিতা লেখা একটি সাধনাসম প্রয়াশ । পাথরে ফুল ফোটানোর সমান ।কয়েক শতাব্দী ধরে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ,ত্রিপুরা থেকে চাকরি ও ব্যবসা
সূত্রে দিল্লিতে চলে আসছে বাঙালী । তারা এসে বাসা বাঁধছে কেউ গুরুগ্রাম, ফরিদাবাদ, রোহিনি, নয়ডাতে । পড়শি হিসাবে মেনে নিচ্ছে পাঞ্জাবী, বিহারী, রাজস্থানি, হরিয়ানা সংস্কৃতির মানুষজনকে । এই বিবিধতায় আর নানা জাতির সমন্নয়ে বাঙালির মানস মনে এক অন্য ধরনের বিষয় বিবেচনা, শিল্প ভাবনার জন্ম দিচ্ছে । যে বাঙালী সংস্কৃতি শান্তিনিকেতনে বড় হয়ে এসেছে, সে দিল্লি শহরে ফরিদাবাদে এসে নতুন করে শিল্পকার্যের জন্ম দিচ্ছে ।
সাহিত্য বিষয়টাই এই রকম, যুগে যুগে মানুষ নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছে । মানুষ কে অন্য প্রাণীর থেকে এই সৃষ্টি ক্ষমতাই আলাদা করে । সেই খানে দিল্লির এহেন সাহিত্য প্রতিকূলতা আসলে দিল্লি স্থিত বাঙালীকে একটা সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ দিয়েছে । সেখানেই সৃষ্টিসুখের ফল্গু বয়ে চলেছে । ইন্টারনেটের দৌলতে দেশ রাজ্যের দূরত্ব কমে আসছে । পশ্চিমবঙ্গ থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার দূরের দিল্লিতে বাংলা সাহিত্যের একটা বিস্তার দেখা যাচ্ছে । গত দুই দশকে (২০০০-২০২০) বাঙালী কবি ও লেখকদের ছাপার অক্ষরে বের হওয়া গ্রন্থের সংখ্যা গুণিতকহারে বৃদ্ধি পএয়েছে । দিল্লির বাংলা সাহিত্যের একটি স্বর্ণযুগের ভিতর দিয়ে আমরা যাচ্ছি । দিল্লির এই সাহিত্য বিকাশের শরিক হতে পেরে আমাদের গর্ব অনুভব হচ্ছে । আমাদের সাহিত্য কমিউনিটি ডেভেলপ করে একটি উজ্জল সংস্কৃতির নিদর্শন হয়ে উঠেছে । দিল্লির বুকে বাংলা সাহিত্যের একটি মুখ দেহলিজ, আজ থেকে ৭ বছর আগে পত্রিকার হিসাবে জন্ম নিয়েছে। দিল্লির বাঙালি কবি ও সাহিত্যিকরাই চেয়েছিলেন, দিল্লি থেকে দেহলিজ বের হোক । প্রথমদিকে দেহলিজ পত্রিকার অনলাইন প্রকাশে ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে নির্বাচিত দেহলিজের প্রিন্ট সংখ্যা বেরোনো শুরু হয়েছে । কমিউনিটির পক্ষ থেকে আজ খুশীর সঙ্গে জানাচ্ছি, দিল্লির কবি ও সাহিত্যিকদের জন্য দেহলিজ পত্রিকা একটি প্রকাশনার ভূমিকা নিয়েছে । কবি, সুতপা ঘোষদস্তিদারের এই কবিতা গ্রন্থখানি প্রকাশ করে দেহলিজ প্রকাশণী দিল্লিবাসী পাঠকের কাছে এই আবেদন রাখতেই পারে, দিল্লির বাংলা সাহিত্য অচিরেই একদিন আত্মনির্ভর হয়ে উঠবে । দিল্লি নিজেই ভারতের রাজধানী, অভিভাবক হিসাবে তার অন্য রাজধানীর দরকার নেই ।
কবিতা গ্রন্থ হিসাবে বলতে হয়ঃ কবি হয়ে ওঠার নেপথ্যে এই কারণে ভৌগোলিকের গুরুত্ব রয়েছে । কবি, যেভাবে বিচরণ করে, যেভাবে তার শিক্ষালাভ হয়েছে, যেভাবে তার জীবন অতিবাহিত করছে । তার দেখার চোখ তৈরি হচ্ছে, তার ভাবনার মন তৈরি হচ্ছে, তার লেখার পরিসর তৈরি হচ্ছে । কবি সুতপা ঘোষদস্তিদার দিল্লির বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে প্রথম থেকেই জুড়ে আছেন । দিল্লির বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায় তার নিয়মিত কবিতার প্রকাশ হয়ে আসছে । অনলাইন দেহলিজ পত্রিকার নিয়মিত কবি তিনি । তার কবিতার উচ্চারণ পরিমিত। তার বিষয় বিবেচনা নিজস্ব । তার কবিতায় আমরা শুনতে পাচ্ছি, ত্রিশ বছরকাল সময়ের অপেক্ষার কথা , তিনি নাগরিক স্বচ্ছন্দ থেকে দূরে অন্য সমাজচিন্তার নতুন গল্প লিখতে চাইছেন । কবি বলছেনঃ "অনেক হল গল্প বলা / ধবল নারীর কপোতোষ্ণ বুকের / এখন বরং ওসব কথা থাক । তাছাড়া পেলেই বা আর কবে / যা খুঁজছ তিরিশ বছর ধরে "! নিজের গণ্ডীকে অতিক্রম করে কবি, নিজেকে অক্ষর ও পঙক্তিমালায় নিজেকে কবিতায় প্রকাশ করতে চলেছেন । এই গল্প, এই কবিতা নিশ্চয় আপনার কাছে নতুন, একজন দিল্লি বালা কবির চোখে দেখা বিশ্ব । একজন বাংলা পাঠকের কাছে এই কবিতা অন্য ভূবনের হদিস করে দেবে । আশা করি, যেখানে যে দেশে, যে রাজ্যেই বাঙালি পাঠক রয়েছেন – এই কবিতা আপনার কাছে এই কবিতা সমাদৃত হবে । বাংলা ভাষার সমগ্র পাঠকের কাছে রাখা হলো দেহলিজ প্রকাশনের এই নিবেদন ।
পীযূষকান্তি বিশ্বাস
সম্পাদক, দেহলিজ পত্রিকা
বি ১, এইচ ৩/ ৮১, বাঙালি কলোনি
মহাবীর এনক্লেভ
নিউ দিল্লি-১১০০৪৫
Comments
Post a Comment