আবিদ আজাদের উপর লেখা

 নিভৃতের পাখি


সবাই পাখি নয়, কেউ কেউ পাখি । আরশোলা সেই দৌড়ে নেই । তার ডানা আছে, পালক নেই । সে উড়তে পারে, তার উড়াল নেই । গন্তব্য বলে যেখানে আমরা যেটুকুই মানি, আমরা ঢের বুঝেছি,  তাহাই শেষ কথা নয় । আরশোলা তার আকার ও আয়তনে বরং একটি অস্তিত্ব । তা অস্বীকার করা যায় না । এই সংসার, উভয়বঙ্গ,  ভাষা অভিধানে আরশোলার ততটুকুই অধিকার, যতটুকু অধিকার একটি পাখির ।  তুমি তাকে বঞ্চিত করতে পারো না । 

একজন কবি,আসেন সেই নিয়তি নিয়ে । আসেন, লেখেন, এবং জয় করে নেন । আমাদের উপরে সে ভরসার ভরে দেন । বিশ্বাসে ফুঁ দিয়ে ওঠেন ।  অধিকার করে নেন মগ্নতা । আমাদের মানসমঞ্চে তিনি পাঠ করে ওঠেন কবিতা । আমরা সেইসব কবির গল্প শুনতে চাই, যার কাছে ক্রমশ নত হয়ে আসে শির । আজ একজন কবির গল্প বলা যাক, নিভৃতের ।   


গল্পে গ থাকে গলারউপরে । যদি তাকে কণ্ঠগত করা যায় , অনর্গল ভেসে আস আবিদ আজাদ । তার শব্দই স্বর, তার বাক্যই কবিতা । শব্দমুর্ছনায় তাঁর টেলিং যেন চকমকি পাথর, কোন অট্টালিকার গায়ে তাঁর লিখে রাখা গল্প । জয়বাংলার  আনাচে কানাচে তবু যেন সারি সারি ক্রমাগত মাল্টিস্টোরি বাড়ি , তাঁর সজ্জাগত নাম । আমার এমনই একটা ধারণা হয়েছে তার কবিতা পাঠ করার সময়, বলা যায় এমনই একটা উর্ধমুখী স্রোত আর আকাশ্চুম্বন নিয়ে এই লিখন প্রক্রিয়া  । আশা করি আজ, পাঠকেরা সঙ্গ দেবেন। আসুন, দেখে নিই এক মুহূর্ত তাঁর অমোঘ কবিতা যাপন, আর এক সন্ধ্যা পাঠ করা যাক ।  


"কবিতা লেখার আগে"


কবিতা লেখার আগে এক আমি 

কবিতা লেখার পরে-অন্য আমি ।

কবিতা লেখা যেন একটা নদী পার হওয়া 

যে নদীতে জল ও নৌকার দারুণ গোঙানি। 

একটা কবিতা লেখা যেন একটা রাস্তা পার হওয়া। 

যে রাস্তায় ঝড় ও জ্বরের অবিরাম ডানার ঝাপটানি 

একটা কবিতা লেখা যেন একটা ঝকঝকে নতুন সাঁকোয় পা রাখা 

যে সাঁকোটি নিষ্ঠুর আনন্দে অনবরত কাঁপিয়ে দিচ্ছে কেউ। 


এক কবিতা থেকে আরেক কবিতা 

এক নদী থেকে আরেক নদীতে গিয়ে পড়া। 

এবং একটা নদী কিছুতেই আর একটা নদীর মতো নয় 

এক কবিতা থেকে আরেক কবিতা 

এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায় গিয়ে ওঠা। 

এবং একটা রাস্তা কিছুতেই আর একটা রাস্তার মতো নয় 

এক কবিতা থেকে আরেক কবিতা 

এক সাঁকোর দুলুনি বুকে নিয়ে আরেকটি সাঁকোয় পা রাখা, 

এবং একটি সাঁকো কিছুতেই আর একটা সাঁকোর মতো নয় 

এবং সবসময়ই দূরে সরে গিয়ে ঝকঝক করে চূড়ান্ত কবিতা



এই তো হলো সেই অনর্গল, কেউ যেন পাশ থেকে বলে ওঠে "স্বতঃস্ফূর্ত" , কেউ যেন বলে যায় "অবচেতনা" । চেতনের যে কোন জ্যোতি নিয়ে আমাদের পূর্বপুরুষদের খামার , সেখানে অনায়াসে খেলে যায় পৌষ । শাইল ধানের নাড়া । কোন নিয়ম নীতিমালা দিয়ে এই বাক্যধ্বনি ব্যাখ্যা করা যায় না । শুধু বোঝা যায় তাঁর গতি চিহ্ন, আর তাঁর ক্রমবর্ধমান হুইসিল । চূড়ান্ত কবিতা নিয়ে কবি ও চিন্তাবিদ আবিদ আজাদ তাই লিখেছেন বিষয় থেকে বিষয়ান্তরের যাওয়ার শিল্প কথা । এ এক জেনেশুনে বিষয়বস্তু খুন আর ভেঙে ফেলা একুশে আইন । কবিতা সাঁকো পার হয়ে অন্য কোথাও, অন্য কোন মানে নিয়ে হাজির হয় ময়না পাড়ায় । "একটি সাঁকো কিছুতেই আর একটা সাঁকোর মতো নয়" -সেই ভাবে একজন কবিও যেন নন আর একজন কবি । কবি থেকে কবি আলাদা, তার ভেতরে কেউ বাচিক শিল্পী, কেউ ছান্দসিক, কেউ গল্পকার, কেন লেখেন অন্ত্যমিল । কেউ শুধু বলেন শব্দের ভিতর শুধুই ধ্বনি । তাতে কি উড়াল হলো ? 


কেউ কেউ বলে ওঠেন, "হয়ে ওঠা" । কবিতা কি আসলে যে গর্ভজাত ভ্রুণ, তাকে হয়ে উঠতে হবে । তাকে, যোনি ঠেলে বেরিয়ে আসতে হবে । কি হবে উঠতে হবে ? কবিতা বড়ই নিরুদ্ধ ( closed ) ব্যাপার । তাকে, উন্মুক্ত হবার কথা কোন কে বলেরে ভাই ? আর যদি, দশমিনিট ভেবে নিই , কবিতা সত্যিই কোন উন্মুক্ত বিষয় , তবে আরশোলাই বা পাখি হবে না কেন ?  মানব সভ্যতার ইতিহাসে কবিতা একটা এথিক্যাল ভারডিক্ট । সুতরাং, জল, কাদা, শামুক, ঝিনুক সবার সমান অধিকার । এই যে কাঁচা বাদাম, তার নিজস্ব একটি গান রয়েছে । যেখানে বাংলার রয়েছে সেই নিজস্ব ফণীমনসার ছায়া আর উটের গ্রীবার মতো সংখ্যাতত্ব , অগুন্তি পত্রিকা, ব্লগ, ফেসবুক । ছড়াছড়ি কবিতা, ঝাঁকে ঝাঁকে কবি আসবেই । গন্তব্য সত্যিই কোন ব্যাপার ? নাকি উড়তে পারা কোন যোগ্যতা , নাকি উড়াল কোন ভরসার নাম ?একজন কবিকে, আমরা তার কবিতার অধিকার থেকে আমরা বঞ্চিত করতে পারি না । 


কবিতা কি সহজ জিনিস তবে ? নাকি তাহা লিখে ফেলা কঠিনতর ব্যাপার ? মোটেই না । বরং আমি বলবো ।  কবিতা পাঠ একটি কঠিন বিষয় । প্রগল্ভ বাচিক একটা ভন্ডামি । পাঠক হওয়া অনেক বড় দায়িত্বের বিষয় । প্রত্যেকটি সহজ পাঠ একটি কঠিন পাঠ প্রস্তুতির দাবী রাখে । কবি বন্ধুরা আবার হতাশ হয়ে বলবেন, কবিতা বোঝার ব্যাপার, কবিতা কি করে 'সহজ' হয় ? আসুন দেখে নেওয়া যাক আবিদ আজাদের একটা সহজ কবিতা ।


"সহজ কবিতা  


একটি চিত্রও যদি ভাল লাগে তোমার শাহনাজ

তাহলেই ভাবব আমি এ কবিতা সার্থক আমার

যখন তোমার খুশি নির্জন ছাত্রীর মতো বসে

পড়ার টেবিলে নুয়ে, পাঠ্যবইয়ের ভিতর ঝুঁকে 

চালাক মাছির মতো টুকে ফেলে দ্রুত নোটবুকে, 

বলপেন কামড়ে দাতে রুল টেনে মনের মার্জিনে, 

লুকিয়ে, পড়তে পারো নিষ্পলক দিনে 

তটস্থ মুরুব্বিদের লাল নীল অবুঝ শাসন 

বাঁচিয়ে, পড়তে পারো দুলে-দুলে-জানলায় আসন



পেতে-দেয়ালে হেলান দিয়ে কিংবা পিঠ রেখে গ্রিলে

ছন্দে ঢুকে-স্পিডে ছেড়ে দিয়ে ফ্যান-অন্ত মিলেটিলে

ঘুরে, ঝলোমলো চুলে, কামরার সিটকানি 

আটকিয়ে, পড়তে পারো চিৎ হয়ে বিছানায় শুয়ে-রিনিঝিনি 

কাঁপিয়ে চোখের পাতা জিহ্বা ছুঁয়ে নিঃশব্দ আঙুলে 

আবার পড়তে পারো নিষিদ্ধ ছবির মতো খুলে, 

ফুরফুরে নাইটি পরে বালিশ বুকের নিচে নিয়ে। 

সাদা ফোয়ারার মতো পা দুটি নাচিয়ে 

চোখ বুজে-আবার চোখ না-বুজে-সহসা ঝিলকিয়ে 

দাড়িকমা ছেড়েছুড়ে হাটু বা কনুই চুলকিয়ে 

একবার উপুড় হয়ে আবার সটান উঠে বসে 

শব্দ আর চরণগুলোকে সব তছনছ ছড়িয়ে

ছিটিয়ে, থুথুর আঠায় মেখে-চুমোয় জড়িয়ে 

ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে দলামচা করে ভেজা স্বপ্নে-লোলে 

আবার পড়তে পারো পুরো কবিতাটি ছিড়ে-জড়ো করে কোলে 

একটি লাইনও যদি ভাল লাগে তোমার শাহনাজ 

তাহলেই ভাবব আমি এ কবিতা সার্থক আমার " ।



এই হলো, সেই সমস্ত "হয়ে ওঠা" কবিতার চাবিকাঠি । কবিতার বরমালা, কাব্যরসের হাড়ি । এই হলো, সেই উড়াল, তার জন্য কোন ডানাই তার মায়বাপ নয় । কোন তথাকথিত কবিতার ফরমুলা ছাড়াই এইটি সম্পূর্ণ আপাদমস্তক কবিতা । আর সেই উড়ালের সঙ্গে লক্ষ্য করে দেখুন , হয়ে ওঠার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্যারালাল ভাবে দাঁড়িয়ে গেছে গতি । দুরন্ত ডেলিভারি । শোয়েব আখতারের জোরালো গতির বলও ঠিক এই ভাবে ধুরন্ধর ব্যাটসম্যানকে বিপন্ন করে । এই যে গতির কথা বলছিলাম, যাকে ক্রমাগত টক্কর দিচ্ছে সাবলীলতা । যে কোন কবিতা তাই লিখে ফেলা মুস্কিল । শব্দভাণ্ডারে ভিড়ে আটকে থাকা শব্দগুচ্ছ ওত পেতে থাকে , শব্দগুচ্ছকে একটি অভিমুখ দেন কবি । আর গতি তাদেরকে দেন সাবলীলতা ।  


গতি, কি করে আসে ?  আর আটকায় ই বা কোন বাঁকে । আর কখন সেই বাঁক ভেঙে এগিয়ে যায় নদী ? সেই সব হলো, দার্শনিকতার কথা । কবি তাহা, লিখে ফেলেন । তাহাই কবিতা । অজান্তে । চিন্তার অভিযোজন দরকার প্রভু । সমস্তই কি প্রজ্ঞা ? নাকি, তা কোন পাশ্চাত্য পুঁথির অযূতপত্রে  লিপিবদ্ধ রয়েছে ?  আর, তাই যদি সত্য হয়, তবে এই চরাচরে এতো স্তাবকতা কেন ? কেন বারবার সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলা দর্শন ? কবিতা কি দর্শন (Philosophy)? নাকি দর্শনের দ্যাখা ? (Observation) মাত্র , নাকি দৃশ্য (View) ? কি সেই অভিজ্ঞান, কি সেই কবিতার কাব্যরস ? কোনটাই বা ভালোলাগা আর কোনটাই বা নৈসর্গিকতা যা পদ্মার জলে চন্দ্রের কিরণ লেগে চিকচিকে ঢেউ খেলে যায় । তুমি কি দেখেছো সেই সব ? কবিতার সার্থকতা নিয়ে বেশী বিতর্ক ঠিক না । যারা আজও ঠিক করতে পারেন নাই চা (Tea) ভালো , না কফি ( Coffee) ? আমি বলবো, আবিদ আজাদের কবিতা হতে লুতফর কর্নারে কফিশপে ডাগর শাহনাজকে নিয়ে মুখোমুখি বসুন । তাঁর চোখের দিকে তাকান । তাঁর চুলের অন্ধকারে আর টর্চের আলো ফেলে কি হবে ?


সেই সূত্রে আবিদ আজাদকে আমি বেশীদিন আগে থেকে পড়িনি । আমাকে পড়তে দেওয়া হলো কিছুদিন আগে । কবি, অরবিন্দের চেষ্টা ও চরিত্রে সেটা সম্ভব হলো । কবি আবিদ আজাদের  চিন্তাসূত্র, সূত্রাবলী, সূত্রসমূহের একটি নেটওয়ার্কের খোঁজ পাওয়া গেলো । ভাবে ও ভঙ্গিমায় কয়েকটা রাত খুব ভাবলাম । মনে হচ্ছিল, আবিদ আজাদ যেন আমারই পরিণত রূপ । তাঁর যেন কিছু প্যাটার্ন , অচেনা, আবছা, অবচেতন । কোথাও দেখেছি অথবা সম্পূর্ণ দেখিনি । কিছুটা নিজের ভাবনা চরিত্রের সঙ্গে মিলে যাওয়া আবহাওয়া মিছিল । এত সাবলীল, অনায়াস । আমি নিজেও অনেকবার এইরকম লিখতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছি । বোধ হয়েছে সে হোঁচট, লেখা ফেলে দিয়ে মাসের পর মাস নির্জলা কাটিয়েছি। কবিবন্ধুরা লেখা চেয়েছেন, আমি লজ্জা দিতে পারি না । লজ্জাটা আর কারো কাছেই না, নিজেরই কাছে । আত্মবিশ্বাসের কাছে হেরে যাওয়া আর অনায়াস না হতে পারা একজন আরশোলার কোথাও একটা ঝিঁ ঝিঁ কানের কাছে বাজে ।



কানে বাজা, চোখে ফোটা, গায়ে গা মাখা ঐসব আর কি,  এই সব নিয়ে আমাদের রন্ধনশালায় নানান রস-ব্যঞ্জন । একটা অণু-গল্প শোনাই:


"ডাকসাইটের কবি, ফজলু মিয়াঁর খান তার বাইশতম কবিতার বই প্রকাশ করছেন । রুপ্সা-পার প্রকাশনীর স্টলে প্রচুর ভিড় দেখতে পাচ্ছি ।  কতিপর বঙ্গললনা সসজ্জিত ডাগর ডাগর সঙ্গীকে নিয়ে ফজলু মিয়াঁ এই বইমেলায় প্রবেশ করছেন । চার পাশে খিলখিল শব্দ , মনের ভিতর চাকুস চাকুস ধ্বনি উঠেছে । আমি, ফজলু মিয়াঁকে হিংসা করি । তাঁর এতগুলো নারীসঙ্গ প্রকৃতই ঈর্ষার । প্রত্যেকটি নারী একটি গোলাপ । আর সে নারী যদি কবিতাপ্রেমী হয়ে ওঠে, কবি বুঝতে পারেন গোলাপটি লাল হয়ে উঠেছে । " । 


গল্পটি শেষ হলো ।  এবং সহচর্যে একটি কবিতার অংশ আমরা পড়ে নিই কবি আবিদ আজাদের । 



"পৃথিবীর শেষ দুঃখী সম্রাজ্ঞর মতো

 না, উঠবেন না- আরো কষ্ট হবে- কী বলতে চান আমি জানি

একদল মূর্খ শিল্পমালিকের উইক এন্ড আওটিং-

এর সুন্দরী সঙ্গিনী হয়ে যেতে হয়েছিল মধুপুর?

ফরেস্ট বাংলোয় মদালসা অভিনয় ওরা একটু বেশি চেয়েছিল

ভিসিআরে ব্লুফিল্মে অপূর্ব গোলাপ যোনির তোড়া দেখে-দেখে খুব উত্তেজিত হয়ে শেষে

ওরাও বাঘের মতো মানুষের বেশে 

প্রকৃত গোলাপ ফেলে টলতে-টলতে জ্যান্ত  গোলাপের খোঁজে বনে চলে যায়

গোলাপের দুঃখ আমি বুঝি, ব্যবহার বুঝি বলে 

বুঝি পৃথিবীতে তবু কোথাও গোলাপ গাছ আছে


প্রকৃতির মতোই সবুজ মানুষের পাতার আড়ালে আজো ফুটে চলে

অজস্র গোলাপফুল গোলাপের গাছে।

তাই একটি মেয়ে যখন আটার রুটির সাথে সাদা মিহি সুজি

পাতে দিয়ে নিজের আড়ালে গিয়ে সেজেগুজে রোজ

লুকিয়ে প্রকৃত মুখ গোলাপের মতো ঘুরে-ঘুরে খোজে রুটিরুজি

তোমার মতোই তাকে দেখে-আমাদের সমাজের 

হয়ে আমি তার সেই ব্যথিত দেউলিয়া যৌবনের

পরাজয় দেখে-দেখে লুকিয়ে নিজের কাছে ক্ষমা চাই–

বলি গোলাপ, ও প্রেমিকার সমূহ সংকট, তুমি হও 

আজ গোলাপের নিখিল রোগের নিরাময়

একটি গোলাপের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি সেদিন 

মানুষের দুঃখই প্রকৃত অর্থে একেকটি ডাগর গোলাপ "


আবিদ আজাদ কতগুলো পুরস্কার পেয়েছেন তা আমার জানা নেই । কবিতাই তাঁর পরিমাপকাঠি । তাঁর পৌঁছ যে কতদূর, কত গভীরের কবি তিনি, এই সমস্ত আলোচনা হচ্ছে,  হবে, হতে থাক । তাঁর কবিতার লহমা আর প্রকৃত অর্থ আমাদের কাছে একটা গোলাপ হয়ে ধরা দিক । গোলাপটি অবশ্যই হোক রক্তিম লাল । তাঁর, কবিতায় আমরা যেটা পাচ্ছি, তা হলো অবশ্যই "সাহস" । আমরা "আত্মবিশ্বাস" পাচ্ছি । এইভাবেও লিখে ফেলা যায় বিশ্বাসময়তা , চরাচরে ভরে দেওয়া যায় ধনাত্মক । কবিতার আত্মধনে, কবিতা আমাদেরকে শিখিয়ে যায় নিজস্ব যাপন, অদম্য চিন্তার প্রসারন, ভাবনার গাঢ়তা, কল্পনার গভীরতা । কবিতা বলে নয়, যে কোন শিল্পের একটা চাহিদা রয়েছে, মৌলিক হয়ে ওঠার । ভাষার ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়ার । এই পাখি হওয়ার দৌড়ে নিজের পালক ছেড়ে যাওয়া ।  একটি গোলাপ দিয়ে আমরা বুঝে নিতে চাইছি কবি ও প্রতিষ্ঠার ফারাক । অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয় , আমাদের চাই একটি রক্তিম গোলাপ । 


কবি, আবিদ আজাদ এই সব করেছেন । তাঁর যেটুকু কাব্য ও কবিতা আমার নজরে এসেছে, আমি পরিলক্ষন করেছি, তার বাক্য গঠন, শব্দবিন্যাস, ক্রমশচিন্তা, ধারাবাহিকতা, গল্পবলা একটি সুচিন্তিত মেজাজে করা । খুব বেশী পাণ্ডিত্য দেখানোর চেষ্টা নেই, নেই জোর করে চাপানো কোন সাহিত্য সূত্র । সমস্তই প্রাকৃতিক, সামাজিক ও পারিবারিক । যেটা একজন পণ্ডিতের কাছে আপাত অর্থে অর্থহীন - ছন্দহীন ।  এই ঢাকা শহরের ভিড় ও যানজট থেকে মুক্ত আর একটি পৃথিবীর মুখ উন্মোচন করে তুলে ধরেছেন আমাদের কাছে । এখানেই কবি আবিদ আজাদের শিল্পনৈপূন্যতার পরিচয় । কবি আমাদের সেই সব তথাকথিত পুরস্কার থেকে দূরে রাখতে পারছেন ।


এবং, সেই সমস্ত ব্যাকরণ মাখিক পাখি না হতে পারা দূর এবং দূরান্তের কবিবন্ধুদের কথা বলি । শব্দচিন্তায় হয়ে উঠুন রক্তিম, আর পাতা ও পেটালে হয়ে উঠুন গোলাপ । মগ্নতার কাছে নিজের দুঃখকে সমর্পণ করে উঠুন । পাখি না হয়ে উঠতে পারা একটা অসুখ । একজন কবিকে, আমরা তার কবিতার অধিকার থেকে আমরা বঞ্চিত করতে পারি না । মানব সভ্যতার ইতিহাসে কবিতা একটা এথিক্যাল ভারডিক্ট । সুতরাং, জল, কাদা, শামুক, ঝিনুক সবার সমান অধিকার, সবাই নিজের অস্তিত্বে একটি বিষয় । আমি মানি না যে কবিতার বিষয় হয় না । ছন্দ , আঙ্গিক, বিন্যাস, দ্যাখা, চিন্তা, চেতনা, ধ্বনি -এই সমস্তই একটা বিষয় । বিষয় থেকে বিষয়ন্তরে অনায়াসে চলাফেরা করা হলো একটি মুন্সিয়ানা । সেটাই হাতুড়ি, সেটাই বাটালি, সেটাই কলা যেখানে খোঁদিত রয়েছে মিস্ত্রির আর্তনাদ । এইভাবে, নিজের কবিতায় নিজের মুখ কেটে বসিয়েছে স্বয়ং কবি নিজেই, আবিদ আজাদ ।

  






Comments