সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়


সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীল

--পীযূষকান্তি বিশ্বাস


সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। এই নামটা শুনলেই আমার মনে একরাশ মুগ্ধতা আর ভালোলাগা ভিড় করে আসে। আমি তার লেখার একজন নিবেদিত পাঠক। শুধু পাঠক বললে ভুল হবে, আমি তার সাহিত্যের একজন অন্ধ ভক্ত। রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। কবি হিসেবে তিনি আকাশছোঁয়া খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, কিন্তু যখন তিনি উপন্যাস ও ছোটগল্পের জগতে প্রবেশ করলেন, সেখানেও তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখলেন। কিশোর সাহিত্যও; সেখানেও তিনি সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছিলেন। প্রবন্ধ, নাটক, এমনকি কলামিস্ট হিসেবেও তিনি ছিলেন স্বচ্ছন্দ। ছোটবেলা থেকেই আমি তার উপন্যাস পড়ে বড় হয়েছি। আমার স্কুল জীবনে ‘সুদূর ঝর্ণার জলে’ উপন্যাসটি পড়ার অভিজ্ঞতা আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। পূজাবার্ষিকীতে তার লেখা উপন্যাসগুলো ছিল আমার কাছে একপ্রকার উৎসবের মতো। আর ‘নীলোহিত’ ছদ্মনামে লেখা তার কাজগুলো ছিল অসাধারণ। এই ছদ্মনামের আড়ালে তিনি যেন নিজের এক ভিন্ন সত্তা তৈরি করেছিলেন।

‘নীলোহিত’ সিরিজের প্রতিটি গল্পেই নীললোহিত নামক চরিত্রটি কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকত। আমি তার লেখার একজন অনুরাগী পাঠক। আজ আমি আমার জবানবন্দীতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গদ্যের সেই জাদুস্পর্শের কিছু কথা তুলে ধরব। আমার এই জবানবন্দীটি কোনো সমালোচনা নয়, বরং একজন ভক্তের হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা শ্রদ্ধাঞ্জলি।

একটু বড় হয়ে বুঝতে শিখলাম, তখন জানলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় শুধু একজন লেখক নন, তিনি একাধারে কবি ও সম্পাদক। পশ্চিমবঙ্গ কেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যের তিনি ছিলেন যেন একজন অভিভাবক। যেকোনো সাহিত্য সভায় তার উপস্থিতি ছিল বিশেষ আকর্ষণীয়। তার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া। ২০১২ সালে মৃত্যুর আগে প্রায় চার দশক ধরে তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বাংলা ভাষায় এই ভারতীয় সাহিত্যিক ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সম্পাদক, সাংবাদিক এবং কলামিস্ট। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার জীবনানন্দ-পরবর্তী পর্যায়ের অন্যতম প্রধান কবি। একইসঙ্গে তিনি ছিলেন আধুনিক এবং রোমান্টিক। তার কবিতার বহু পঙ্‌ক্তি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘নীলোহিত’, ‘সনাতন পাঠক’, ‘নীল উপাধ্যায়’ ইত্যাদি ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। আমরা বাঙালি পাঠকেরা তার লেখার জাদুতে মুগ্ধ হয়ে থাকতাম। তার ভাষা, কাহিনী বলার ভঙ্গি, চরিত্র চিত্রণ, ঘটনার বুনন, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, প্রেম, ভালোবাসা—সবকিছুই যেন বাংলার সংস্কৃতির বিভিন্ন স্তর ছুঁয়ে যেত। এই সবকিছুই আমাকে গভীরভাবে মোহিত করত। তার লেখার মধ্যে আমি যেন নিজেকে খুঁজে পেতাম। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি যা লিখেছিলেন, তা যেন আজও আমাদের সমাজের প্রতিচ্ছবি।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় শুধু একজন সাহিত্যিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন কর্মঠ মানুষ। বিদেশি সাহিত্যিকদের সঙ্গে তার ছিল গভীর সম্পর্ক। বিদেশি সাহিত্য, বিদেশি চরিত্র, তাদের সংস্কৃতি, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, যৌনতা—সবকিছু তিনি খুব সহজেই নিজের লেখায় ব্যবহার করতেন। পশ্চিমা সাহিত্যকে তিনি যেন আত্মস্থ করেছিলেন। এই কারণে তার গল্পগুলো ছিল টানটান উত্তেজনায় ভরপুর। একবার শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যেত না। তার লেখাগুলো যেন এক একটি জানালা খুলে দিত, যেখান দিয়ে পাঠক প্রবেশ করত এক নতুন, রোমাঞ্চকর জগতে। এই বিষয়টি আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করত। তার লেখার মধ্যে একটি বিশ্বজনীনতা ছিল, যা খুব সহজেই যেকোনো পাঠকের মন জয় করে নিত। তিনি যেন বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রাকে এক সূত্রে গেঁথে দিতেন।

ঔপন্যাসিক হিসেবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কাজ নিঃসন্দেহে ‘প্রথম আলো’। সময়কে নায়ক করে লেখা এই ঐতিহাসিক উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। এই উপন্যাসটি পড়ার সময় মনে হত, আমি যেন সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে ফিরে গেছি। এছাড়াও ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসটিও আমার খুব প্রিয় ছিল। এটি যখন দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হত, তখন আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। উপন্যাস ছাড়াও তার কবিতাগুলোও ছিল অসাধারণ।

তার ‘নীরা’ চরিত্রটি নিয়ে লেখা প্রেমের কবিতাগুলো আজও আমার মনে গেঁথে আছে। ‘হঠাৎ নীরার জন্য’ এবং ‘নীরা, হারিয়ে যেও না’—এই দুটি কবিতার বইয়ের কথা আমার আজও মনে পড়ে। এই কবিতাগুলোতে তিনি যেন এক গভীর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, যা আজও আমাকে ছুঁয়ে যায়। নীরা যেন এক রহস্যময় চরিত্র, যাঁর প্রতি সুনীলের ভালোবাসা আজও আমাদের মুগ্ধ করে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আজও এক বিস্ময়। তার লেখা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি আজও জনপ্রিয়। তিনি আমার পড়া সেরা ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম। তার লেখার মধ্যে আমি এমন এক জাদু খুঁজে পাই, যা আমাকে আজও মুগ্ধ করে। তার লেখার গভীরতা, চরিত্রগুলোর জটিলতা এবং গল্পের বাঁকগুলো আমাকে আজও বিস্মিত করে। তিনি যেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন, তাই আজও তার লেখা এত প্রাসঙ্গিক।

আমি মনে করি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা। তিনি ছিলেন একজন সংস্কৃতি-সচেতন মানুষ। তার লেখায় যেমন ছিল আধুনিকতার ছোঁয়া, তেমনই ছিল শিকড়ের প্রতি গভীর টান। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, সম্পাদক এবং সাংবাদিক। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তার অবাধ বিচরণ ছিল। তিনি যেন একাই একটি প্রতিষ্ঠান ছিলেন।

কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার কবিতাগুলো যেমন রোমান্টিকতায় ভরপুর, তেমনই তার উপন্যাসগুলোতে ফুটে উঠেছে সমাজের নানা চিত্র। 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল তার ভাষা। তিনি অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় লিখতেন, যা খুব সহজেই পাঠকের মন জয় করে নিত। তার চরিত্রগুলো ছিল জীবন্ত, যাদের সঙ্গে পাঠক সহজেই একাত্ম হতে পারত। তিনি নারী-পুরুষের সম্পর্ক, প্রেম, ভালোবাসা, যৌনতা—এই বিষয়গুলো নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতেন, যা সেই সময়ের প্রেক্ষিতে ছিল খুবই সাহসী পদক্ষেপ। তিনি যেন সমাজের লুকানো দিকগুলো তুলে ধরতে দ্বিধা করতেন না।

‘নীলোহিত’ ছদ্মনামে তিনি যে লেখাগুলো লিখেছেন, সেখানে তিনি যেন নিজের এক ভিন্ন সত্তাকে প্রকাশ করেছেন। ‘নীলোহিত’ চরিত্রটি ছিল তার নিজেরই প্রতিচ্ছবি। এই চরিত্রটির মাধ্যমে তিনি যেন নিজের মনের কথাগুলো প্রকাশ করতেন। এই চরিত্রটি যেন এক আধুনিক, বিদ্রোহী এবং অনুসন্ধিৎসু মনের প্রতীক।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বিদেশি সাহিত্যকে খুব ভালোভাবে আত্মস্থ করেছিলেন এবং তার লেখায় তার প্রভাব দেখা যায়। তিনি পশ্চিমা সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয় যেমন—নারী-পুরুষের সম্পর্ক, যৌনতা, আধুনিকতা—এগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা বাংলা সাহিত্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তিনি যেন প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের সাহিত্যকে এক সূত্রে গেঁথেছিলেন।




আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমার জীবনে এক গভীর প্রভাব ফেলেছেন। তার লেখা আমাকে সাহিত্য এবং জীবনের প্রতি নতুন করে আগ্রহী করেছে। তিনি শুধু একজন লেখক নন, তিনি আমার কাছে একজন পথপ্রদর্শক। আমি মনে করি, বাংলা সাহিত্যের প্রতি তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি আমাদের মাঝে আজও বেঁচে আছেন তার লেখার মাধ্যমে। আমি যখনই তার লেখা পড়ি, মনে হয় যেন তিনি আমার সঙ্গেই কথা বলছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্য একটি বিশাল সমুদ্রের মতো, যার গভীরে ডুব দিলে নিত্য নতুন রত্ন খুঁজে পাওয়া যায়। তার লেখার মধ্যে এক ধরনের জাদু আছে, যা পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। তিনি যেমন আধুনিকতাকে ধারণ করেছেন, তেমনি ঐতিহ্যকেও সম্মান জানিয়েছেন। তার সাহিত্য আমাদের সমাজের দর্পণ, যেখানে আমরা নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। তিনি যেন এক যুগের প্রতিনিধি, যাঁর লেখা আজও আমাদের পথ দেখাচ্ছে।

পরিশেষে, আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একজন মহান সাহিত্যিক ছিলেন এবং থাকবেন। বাংলা সাহিত্য যতদিন থাকবে, ততদিন তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তার সাহিত্য আমাদের সকলের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। এই ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রতি আমার জবানবন্দী। আমি আশা করি, এই জবানবন্দী তার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার প্রকাশ করতে পেরেছে।

--
Pijush Biswas
Mahavir Enclave
New Delhi-110045
Ph: 9871603930

Comments