দিল্লি, এক কথায় এক ঐতিহ্যমণ্ডিত মহানগরী। রসিকজনেরা যাকে অভিহিত করেন 'দিলওয়ালো কা শ্যাহের' বা হৃদয়বানদের নগরী রূপে। এর গভীরতা ও বহুমাত্রিকতা অনুধাবন করতে গেলে হয়তো এক জীবনও পর্যাপ্ত নয়। এই দিল্লিতে বসেই যখন বাংলা সাহিত্যের নিবিড় চর্চায় নিমগ্ন, যখন মন পড়ে থাকে মূলত বঙ্গভূমির শ্যামলিমায়, তখন এক আশ্চর্য স্ববিরোধিতায় ভুগতাম – একেবারে সন্নিহিত লাল কেল্লার সুপ্রাচীন প্রাচীর স্পর্শ করার অবকাশ হয়নি, সিরি ফোর্টের ঐতিহাসিক অলিন্দে দাঁড়িয়ে উত্তর ভারতের সমৃদ্ধ সাহিত্যধারায় অবগাহন করার সুযোগ ঘটেনি। অথচ, জীবনের তিনটি মূল্যবান দশক এখানেই অতিক্রান্ত হয়েছে।
সাহিত্য অকাদেমির বিশিষ্ট ফেলো এবং পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিতা শ্রীমতি অজিত কৌর পাঞ্জাবি তথা উত্তর ভারতীয় সাহিত্যের এক প্রোজ্জ্বল নক্ষত্র, এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীরও অধিক সময়ব্যাপী নিরলস সাহিত্য সাধনা, প্রগাঢ় সমাজ চেতনা এবং অবিচল রাজনৈতিক অবস্থান তাঁকে এমন এক ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা ও অনন্য উচ্চতা প্রদান করেছে, যা অত্যন্ত বিস্ময়মিশ্রিত শ্রদ্ধার বিষয় । দক্ষিণ এশীয় সাহিত্য পরিমণ্ডলে তিনি স্নেহ ও শ্রদ্ধায় 'আম্মা' নামে সুপরিচিতা।
কলকাতাকেন্দ্রিক একটি স্বনামধন্য বাংলা পত্রিকার পক্ষ থেকে তাঁর একটি বিশদ সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য আমার কাছে সানুগ্রহ অনুরোধ আসে। এর পূর্বে, সার্ক সাহিত্য উৎসবে কবি হিসেবে স্বরচিত কবিতা পাঠের দুর্লভ সৌভাগ্য অর্জন করলেও, এমন বিদুষী ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নিবিড় সাহিত্য আলাপের অবকাশ ঘটেনি। অবশেষে, গতকাল এক পরম সৌভাগ্যময় মুহূর্তে সেই সুযোগ উপস্থিত হলো। তাঁর বাসভবনে, ঘরোয়া পরিবেশে জলজিরা ও ব্রেড পাকোড়ার আন্তরিক আতিথেয়তার সঙ্গে চলল দীর্ঘ সাক্ষাৎকার পর্ব। আমাকে সম্মুখে এগিয়ে দিয়ে এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করে এক মধুর কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন দিল্লির সুকবি শ্রী প্রাণজি বসাক এবং মোস্তফা তারিকুল আহসান (বাংলাদেশের কবি ও কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ) । আমাকে সম্মুখে এগিয়ে দিয়ে এই কঠিনতর কাজ করার বিপদে ফেলে দিয়েছেন তারা। এর বদলা নেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কবি শ্রী প্রাণজি বসাক এই জ্ঞানগর্ভ আলোচনাচক্রে শেষ পর্যন্ত আমাকে মূল্যবান সঙ্গ দিয়েছেন। আলোচনার পরিধি বিস্তৃত ছিল দিল্লির সুপ্রাচীন ইতিহাস থেকে শুরু করে পাঞ্জাবি সাহিত্যের বিবর্তন, উর্দু লেখকগোষ্ঠীর অবদান, গদ্য ও পদ্যের ধারা, হিন্দি ভাষার ব্যাপ্তি, গুরুমুখি লিপির ঐতিহ্য এবং পার্শ্ববর্তী পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, ভুটানের কবি-সাহিত্যিক ও তাঁদের সৃষ্টিকর্ম পর্যন্ত। ৯০-ঊর্ধ্ব এই 'লৌহমানবী', যাঁর দৃষ্টিশক্তি হয়তো কিছুটা ক্ষীণ, কিন্তু যাঁর শ্রুতি ও স্মৃতিশক্তি অভাবনীয়ভাবে প্রখর, প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিলেন অনায়াস দক্ষতায় ও গভীরতায়। এতটা অমূল্য সময় তিনি সাধারণত কাউকে দেন না, যা তিনি আমাদের সানন্দে প্রদান করলেন। উপরন্তু, উপহার দিলেন স্বরচিত তিনটি মূল্যবান গ্রন্থ। আমি, দিল্লির বাংলা সাহিত্যের একজন নগণ্য প্রতিনিধি হিসেবে, আমাদের সীমিত প্রয়াস 'দেহলিজ' পত্রিকাটি তাঁর করকমলে অর্পণ করলাম। দিল্লি থেকে প্রকাশিত এই ক্ষুদ্র প্রয়াসটিকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করে, মাথায় ছুঁয়ে, যত্ন করে পড়ার টেবিলে সাজিয়ে রাখলেন – এ আমাদের পরম প্রাপ্তি।
প্রায় দুই দশক পূর্বে যখন এই দিল্লিতে সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলাম, তখন এক গভীর সংশয় ছিল মনে – এই আপাত বঞ্জর প্রান্তরসম রাজধানীতে বাংলা সাহিত্যের সুকুমার কুসুম আদৌ প্রস্ফুটিত হবে কি? আজ, এই সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাহেন্দ্রক্ষণে, বারবার স্মৃতিপটে ভেসে উঠছিল উনুচ্চ আরাবল্লী রিজের কথা, যমুনার কালিন্দীকুঞ্জের জলধারার কথা, আর আর আমার নগ্ন পায়ে হেঁটে আসা দেহলিজের কথা । এই অর্জন যেন সেই সংশয়ের মেঘ সরিয়ে এক নতুন প্রত্যয়ের সূর্যোদয়।
Comments
Post a Comment