মধুময়তায়
হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ মেথি, মেদিনীপুর থেকে পেড়ে আনা সমাদ্দার। তুমি তার ইশারাটুকু বোঝো। তার মগ্নতার ইঙ্গিতে বেজে ওঠো। এতোটা পথ অতিক্রম করে এসে কেন বা জিজ্ঞাসাঃ রতন কাকে বলে? রতনে রতন চেনে, আর ভাল্লুক চেনে মধু। এ এক আদিম জ্ঞান, পুস্তক-বহির্ভূত প্রজ্ঞা। যে জ্ঞান পুঁথির ভাঁজে নিজেকে লুকিয়ে রাখে না, বরং মাটির সোঁদা গন্ধে, ভোরের প্রথম শিউলির সৌরভে বা বর্ষার জলে ভেসে যাওয়া খড়কুটোর অসহায়ত্বে নিজেকে উন্মোচিত করে। রত্নপারখির চোখে যে হিসেবি ঔজ্জ্বল্য, সেখানে হৃদয়ের স্থান সামান্যই। সে মূল্য বোঝে, কদর বোঝে না। কিন্তু ভাল্লুকের এই মধু চেনা, সে তো বিশুদ্ধ প্রাণের টান, বেঁচে থাকার এক অনিবার্য ও মধুময় তাগিদ। তার কাছে মধুর কোনও বাজারদর নেই, আছে কেবল তার অস্তিত্বের প্রতি একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণ। এই আত্মসমর্পণেই সমস্ত জঙ্গলমহল যেন যুগ যুগ ধরে এক অমোঘ সত্যকে লালন করে চলেছে।
জঙ্গল মহলে খুব হালচাল। জঙ্গল বোলে তো অরাজকতা। ক্যাওস। এই কদিন আগেই একটি ক্যাওস নামের লিটল ম্যাগাজিন ধুম মাচালো। হারিয়েও গেলো। সামান্য তার ধূলিবসন মেদিনীমধ্যে ঈষৎ মুহ্যমান, অথচ জঙ্গল এতোটাই গভীর যে সেখানে দর্প ছাড়া কিছুই দৃশ্যমান না। ওই যে ‘ক্যাওস’ পত্রিকাটি, তার জন্ম যেন এক ঝোড়ো রাতের বিদ্যুৎচমকের মতো। কয়েকজন কলেজ পড়ুয়া তরুণ, চোখে তাদের বিপ্লবের আগুন আর পকেটে শূন্যতার হাহাকার, তারা ভেবেছিল শব্দের আগুন দিয়ে এই স্থিতাবস্থাকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে। শালবনীর মোড়ে চায়ের দোকানে বসে কত তর্ক-বিতর্ক, কত বিনিদ্র রাত কেটেছে কবিতার শরীর কাঁটাছেঁড়া করে। তাদের লেখায় উঠে আসত প্রান্তিক মানুষের কথা, মহাজনের ঋণে জর্জরিত আদিবাসী কৃষকের গলায় ঝুলে থাকা দড়ির কথা, কেন্দুপাতার আড়ালে লুকিয়ে রাখা চোরাই বন্দুকের কথা। তাদের ক্যাওস ছিল নগরজীবনের পরিপাটি ভণ্ডামির বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ। প্রথম সংখ্যায় তারা ছেপেছিল এক তরুণ কবির কবিতা—‘আমার ঈশ্বর এখন খাদানে কাজ করে’। এই একটি পংক্তিই নাড়িয়ে দিয়েছিল অনেককে। কিন্তু যা কিছু তীব্র, যা কিছু সৎ, তার আয়ু যেন বড়ই স্বল্প হয় এই বঙ্গে। অর্থের অভাব, পাঠকের ঔদাসীন্য আর নিজেদের মধ্যেকার সংঘাত—সব মিলিয়ে পত্রিকাটি যেন জঙ্গলের এক নাম না জানা ঝর্ণার মতো উৎসমুখেই শুকিয়ে গেল। আজ তার কথা আর কেউ মনে রাখেনি। তার ধূলিবসন, অর্থাৎ ছেঁড়া কয়েকটি কপি, হয়তো মেদিনীপুরের কোনও পুরনো বইয়ের দোকানের এক কোণে আত্মগোপন করে আছে। জঙ্গল যেমন করে নিজের গভীরে কতকিছুকে হারিয়ে ফেলে, সেভাবেই এই সাহিত্য-প্রচেষ্টাকেও সে নিজের গভীরে স্থান দিয়েছে।
জঙ্গল মানে তো শুধু শাল পিয়াল সর্বদা নয়। শালপাতা আর নির্জনতার ভিতর শ্রাব্য শুধুই বন্দুকের আওয়াজ। মানুষের ঘাস পাতা বিচুলি-জীবন এখন আর দাগ কাটে কই। সেই বন্দুকের আওয়াজ কখনও আসে শিকারির দোনলা থেকে, যা একটি নিরীহ খরগোশের দৌড় থামিয়ে দেয়। কখনও বা আসে উর্দিধারী সেপাইয়ের রাইফেল থেকে, যার লক্ষ্য কোনও ছায়ামূর্তি, যাকে তারা ‘মাওবাদী’ বলে চিহ্নিত করে। আবার কখনও সেই আওয়াজ আসে উল্টো দিক থেকে, সেইসব ছেলেদের বন্দুক থেকে, যারা মনে করে এই রাষ্ট্র তাদের সবটুকু কেড়ে নিয়েছে। এই শব্দতরঙ্গের মাঝে চাপা পড়ে যায় ঝিঁঝির ডাক, রাতজাগা পাখির কান্না, এমনকি প্রসবযন্ত্রণায় কাতর কোনও হরিণীর আর্তনাদও। এখানে জীবন মানে ঘাস-পাতা-বিচুলির মতোই সস্তা, পদদলিত। পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামের পর গ্রাম, ধর্ষিতা নারীর নীরব কান্না, ঘরছাড়া মানুষের অসহায় মুখ—এসব খবরের কাগজের ভেতরের পাতায় এক কলামের সংবাদ হয়েই থেকে যায়। নগরপ্রান্তে এতো প্রাচুর্যের ভিড়, এতো তার রোশনাই। রাতের পর রাত চাঁদ উঠে কেঁদে কেঁদে গেছে, ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শহরসমেত অথচ সে জ্যোৎস্না দেখার মতো অবসর এখন আর অবসর কই?
শহরের মানুষ ব্যালকনিতে দাঁড়ায় বটে, তবে চাঁদ দেখার জন্য নয়। তারা দাঁড়ায় মোবাইলের নেটওয়ার্ক খুঁজতে, কিংবা নীচের রাস্তায় ছুটে চলা গাড়ির স্রোত দেখতে দেখতে একঘেয়েমি কাটাতে। তাদের চোখে চাঁদের আলো পড়ে, কিন্তু সেই আলো তাদের হৃদয়কে ছুঁতে পারে না। তাদের হৃদয়ের জমিন বড় কঠিন, বড় বেশি কংক্রিটে মোড়া। সেখানে জ্যোৎস্নার মতো নরম কিছুর প্রবেশাধিকার নেই। তাদের জীবনে রোশনাই আছে, কিন্তু সে আলো নিওনের, বিজ্ঞাপনের, শপিং মলের। সে আলো চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, কিন্তু আত্মার অন্ধকার দূর করতে পারে না। তারা প্রাচুর্যের মধ্যে থেকেও এক অদ্ভুত শূন্যতায় ভোগে। তাদের দামী সোফায় বসেও ঘুম আসে না, তাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরেও তারা ঘেমে ওঠে অস্তিত্বের সংকটে। তারা জানে না, কয়েকশো কিলোমিটার দূরে এই জঙ্গলে চাঁদ উঠলে কেমন করে শালগাছের পাতা থেকে রুপোলি আলো ঠিকরে পড়ে, কেমন করে মহুয়ার গন্ধ মেখে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। তারা সেই মায়ার জগৎ থেকে স্বেচ্ছানির্বাসন নিয়েছে।
অবসর নেই, অভিমুখ আছে। আছে সমাদ্দার। সামান্য দূর্বা। সামান্য ঘাস। কবির হৃদয় আজ ঘাস। কবিতার হৃদয় ও আজ ঘাস। দক্ষিণ আর প্রদক্ষিণে পৃথিবীর তরাই জুড়ে সুদীর্ঘ-তৃণভূমি। হালুম বলে যে কোন সময় ছিটকে সামনে চলে আসে জঙ্গলরাজ। ঘাসপাতা, ঝাটিবাবলা নিয়ে যেন এক অভিমুখ তৈরি হয়। তার পরিবর্তে দাঁড়িয়ে আমাদের এই সামান্য বাডকাল। এই আমাদের সামান্য মঙ্গার। শহরের মানুষের অবসর না থাকলেও অভিমুখ বড় স্পষ্ট। তাদের অভিমুখ সাফল্যের দিকে, টাকার দিকে, ক্ষমতার দিকে। তারা ছুটছে, অবিরাম ছুটছে একটা মরীচিকার পিছনে। আর আমাদের? আমাদের অভিমুখ সমাদ্দারের মতো মানুষদের দিকে। সেইসব মানুষ, যারা কোনও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছাড়াই জ্ঞানের ভাণ্ডার আগলে বসে আছেন। মেদিনীপুরের কোনও এক অখ্যাত গ্রামের সেই সমাদ্দার মশাই, যিনি লোকগান আর পাঁচালির এক জীবন্ত আর্কাইভ। যিনি বলে দিতে পারেন, কোন গাছের পাতা কোন রোগের মহৌষধ। এই সমাদ্দারেরা, এই দূর্বাঘাসেরা—এরাই আমাদের শিকড়। আমরা যত উপরে ওঠার চেষ্টা করি, ততই যেন এই শিকড়ের টান অনুভব করি। কবির হৃদয় আজ ঘাসের মতো হয়ে গেছে, যে শত আঘাতেও মরে না, বরং বর্ষার প্রথম জলে আরও সবুজ হয়ে ওঠে। কবিতা নিজেও আজ ঘাসের মতো—প্রান্তিক, সাধারণ, কিন্তু জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই ঘাস মাটিকে আঁকড়ে ধরে, ভূমিক্ষয় রোধ করে। তেমনই কবিতাও সমাজকে, ভাষাকে, সংস্কৃতিকে ক্ষয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু এই ঘাসপাতার জীবনেও সংকট আছে। ‘মঙ্গা’ বা অভাবের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। জঙ্গলরাজ, অর্থাৎ প্রকৃতির একচ্ছত্র আধিপত্য, যে কোনও মুহূর্তে ‘হালুম’ বলে সামনে এসে দাঁড়াতে পারে। তখন এই সামান্য প্রতিরোধ খড়কুটোর মতো ভেসে যায়।
লিটল মানে আমারও সামান্য কিছু। ভাবলে অনেক, সুদূরপ্রসারী। লিটল মানে, শূন্য থেকে ধনাত্মক। আমাদের এই সামান্য বঙ্গমধু, প্রশাখা প্রশাখায় তার মৌমাছি গুঞ্জয়মান। ওই যে ‘ক্যাওস’-এর মতো লিটল ম্যাগাজিন, তাদের ‘লিটল’ বা ‘সামান্য’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু এই ‘লিটল’ শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক বিরাট দর্শন। যা কিছু বৃহৎ, যা কিছু মহীরুহ, তার শুরু তো এক ক্ষুদ্র বীজ থেকেই। লিটল ম্যাগাজিন হলো সেই সম্ভাবনার বীজ। হয়তো সে অচিরেই হারিয়ে যায়, কিন্তু যাওয়ার আগে সে কিছু মননে ভাবনার পরাগরেণু ছড়িয়ে দিয়ে যায়। সেই পরাগরেণু থেকেই জন্ম নেয় নতুন ভাবনা, নতুন কবিতা, নতুন বিদ্রোহ। আমাদের এই বঙ্গসংস্কৃতির যে মধু, তা তো কোনও একক মৌচাকে সঞ্চিত নয়। তা ছড়িয়ে আছে অগণিত ছোট ছোট মৌচাকে—বাউলের একতারায়, পটুয়াসংগীতে, ছৌ নাচের মুখোশে, গম্ভীরা গানের সুরে। এই ছোট ছোট ধারাগুলোই এক বৃহৎ মধুবনকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এর প্রশাখা প্রশাখায় হাজার হাজার মৌমাছি—অর্থাৎ শিল্পী, কবি, গায়ক, কারিগর—তারা নীরবে গুঞ্জরণ করে চলেছে, মধু সংগ্রহ করে চলেছে। তাদের হয়তো কোনও স্বীকৃতি নেই, পুরস্কার নেই, কিন্তু তাদের গুঞ্জরণ থেমে গেলে এই বঙ্গভূমি এক মুহূর্তে রসহীন, মধুনিরপেক্ষ হয়ে পড়বে।
কোথায় গেলে হে মধুসূদন, কোথায় সে মণিভাণ্ডার। আমার এই অবোধটুকু ক্ষমা করো, কবি। এই ভাল্লুক নামের পাঠক্ষুধাকে কি করে লিখিত করি। আর ব্যঘ্রনামের মামাকে কি করে চোখরাঙ্গিয়ে বলি, দূর হটো এই বন্দুকধারী, বকশো এই ভাঁটিফুলের ঝাড়। এই আমাদের ছাতিম, এই আমাদের অমলতাস। আমরা এখানে মধু সংগ্রহে এসেছি। আহা, মধু আর মননের মধু পানের পিয়াসা আমাদের। মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই যুগটাই ভালো ছিল। যখন মধুসূদনের মতো কবিরা ভাষার ভাণ্ডার উজাড় করে দিতেন। যখন ‘রত্ন’ আর ‘মধু’র মধ্যে কোনও বিভেদ ছিল না। মেঘনাদবধ কাব্যের ছত্রে ছত্রে যে ঐশ্বর্য, যে মণিভাণ্ডার, তা আজকের দিনে কোথায় পাবো? আজকের কবিতা বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক, বড় বেশি অস্পষ্ট। তাই অবোধ ভাল্লুকের মতো আমার এই পাঠক্ষুধা মেটে না। আমি শব্দের জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই একটু মধুর আশায়, কিন্তু পাই শুধু কাঁটাঝোপ আর শুকনো পাতা। আর একদিকে আছে ‘ব্যঘ্রনামের মামা’—অর্থাৎ রাষ্ট্রশক্তি, ক্ষমতা। সে বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সে চায় না আমরা ভাঁটিফুলের মতো বুনো সৌন্দর্যের স্বাদ নিই, ছাতিমের তীব্র সুবাসে বুঁদ হয়ে থাকি বা অমলতাসের হলুদ রঙে চোখ জুড়াই। সে চায় আমরা তার দেখানো পথে চলি, তার তৈরি করা কৃত্রিম মধু পান করি। কিন্তু আমরা যে মধুর নেশায় পাগল! আমরা এই বন্দুককে ভয় পাই না। আমরা তার চোখে চোখ রেখে বলতে চাই, “পথ ছাড়ো। আমরা এখানে লুঠ করতে আসিনি, আমরা এসেছি আমাদের প্রাপ্য মধু সংগ্রহ করতে। আমাদের মননের যে তীব্র পিপাসা, তা মেটাতেই হবে।”
এভাবেই কেটে গেলো দক্ষিণ বছর, আমাদের কবিতাপত্র এখন অনেকটাই হলুদ, আমরা নিজেরাই এপ্রিল। আমি কি কথা, কারে বা কবো? মধু লেহন করার ঈপ্সা এখন একান্ত ও গোপন। তোমার কাছেও গোপন রেখেছি, অথচ তুমিও তো আপন, ইশারা করোনি। সময় বয়ে যায়। দক্ষিণের বাতাস কতবার এলো আর গেলো। আমাদের সেই যৌথ কবিতার খাতাটা এখন হলদে হয়ে গেছে, পাতাগুলো ভঙ্গুর। আমরা যারা একসঙ্গে পথচলা শুরু করেছিলাম, তারা আজ একে অপরের থেকে কত দূরে। জীবন আমাদের অনেককে এপ্রিলের মতোই বোকা বানিয়ে দিয়েছে। কত স্বপ্ন ছিল, কত পরিকল্পনা ছিল—সব যেন ধুলোয় মিশে গেছে। এখন আর আগের মতো চিৎকার করে কবিতা পড়ি না, আগের মতো পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখি না। মধু লেহন করার, অর্থাৎ সৃষ্টিসুখের উল্লাসে মেতে ওঠার ইচ্ছাটা এখন বড় ব্যক্তিগত, বড় গোপন। সেটা আর পাঁচজনকে দেখিয়ে বেড়ানোর মতো কিছু নয়। এমনকী তুমি, যে আমার সবচেয়ে কাছের ছিলে, তোমাকেও সবটা বলে উঠতে পারিনি। হয়তো তুমিও তোমার ভেতরের পিপাসার কথা আমাকে বলোনি। আমরা দুজনেই আপন, কিন্তু আমাদের মধ্যে এক অদৃশ্য দেওয়াল উঠে গেছে। আমরা পাশাপাশি থেকেও একা। একে অপরকে ইশারা করার ভাষাটাও হয়তো ভুলে গেছি।
এই বঙ্গমালায়, জীবনকে দীর্ঘ করে রেখেছো মধু। স্বল্পতায় তো তেমন ক্ষতি নেই। আছে নাকি? বাবুমশাই, আনন্দ নশ্বর নহে। আনন্দ তুমি জেনেছো স্বল্পতার সেই স্বাদ, রক্ত ক্লেদ মাখা ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজে বেঁচে থাকার চেয়ে অন্য এক মেন্টোস জিন্দেগী। জিন্দেগী, এই ক্যায়সে প্যাহেলি হে। জীবনকে দীর্ঘ মনে হয়, যখন তাতে মধু থাকে। সেই মধুอาจจะ স্বল্পক্ষণের জন্য, এক মুহূর্তের জন্য, কিন্তু তার রেশ থেকে যায় আজীবন। স্বল্প আয়ু নিয়ে কোনও ক্ষতি নেই, যদি সেই জীবনে মধুর আস্বাদ পাওয়া যায়। শহরের বাবুরা দীর্ঘজীবী হতে চায়। তারা ডায়েট করে, যোগা করে, হাজার রকমের নিয়ম মেনে চলে। কিন্তু তাদের জীবনে কি সেই মধু আছে? তারা তো ইঁদুরের মতোই এক গর্ত থেকে আরেক গর্তে ছুটে বেড়ায়—বাড়ি থেকে অফিস, অফিস থেকে বাড়ি। ঘাড় গুঁজে বেঁচে থাকা। তাদের জীবনে আনন্দ নেই, আছে শুধু স্বস্তি। কিন্তু আনন্দ আর স্বস্তি এক জিনিস নয়। আনন্দ নশ্বর নয়, তার অনুভূতি অমর। স্বল্পতার মধ্যেই সেই আনন্দের আসল স্বাদ লুকিয়ে আছে। এক ঝলক বৃষ্টির পর মাটির সোঁদা গন্ধ, প্রিয় কোনও গানের সুর হঠাৎ কানে আসা, বহুদিন পর কোনও পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়া—এই ছোট ছোট আনন্দগুলোই জীবনকে যাপনযোগ্য করে তোলে। এটাই সেই ‘মেন্টোস জিন্দেয়াগি’—যা বাইরে থেকে ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে এক অদ্ভুত সতেজ অনুভূতি দেয়। জীবন সত্যিই এক অদ্ভুত ধাঁধা। তাকে যত বোঝার চেষ্টা করি, সে তত জটিল হয়ে ওঠে।
তাই বলে, তো জঙ্গল ছেড়ে চলে যাওয়া যায় না। তার অস্তিত্ব, তার মহলকে ক্রমশ ছেয়ে যাওয়া এওতো প্রকৃতি। মানুষই প্রকৃতি, মানুষই মধু, মানুষই জঙ্গলমহল। আমি সেখানে কাঠ কাটি, ট্রেকিং এ যাই, মধু সংগ্রহ করি। মানুষই হরিণ, হরিণীর চোখের কাজলে আমার হৃদয় থমকে দাঁড়ায়। মানুষই কাঠবিড়াল, সম্মুখ চাহনিতে চকিতেই আড়ালে পলায়ন করে, আবার সামনে এসে লেজ নাড়ায়। মানুষই শেয়াল, কখন কার ইক্ষু-ক্ষেতে নিজের হাল চালিয়ে দিয়ে এসে সহাস্যে আমজনতার মাঝে দাঁড়িয়ে, বত্রিশপাটি দাঁত বের করে হা হা হি হি - আমি কিচ্ছুটি করিনি, জানিনি, ফারাক পড়ে না। আমি সাতেও আছি, পাঁচেও আছি, ধর্মেও আছি, জিরাফেও আছি। হে হে হে হে, সর্বযজ্ঞে কাঁঠালিকলা।
এই জঙ্গল ছেড়ে পালানোর পথ নেই। কারণ এই জঙ্গল শুধু বাইরে নয়, আমাদের ভেতরেও আছে। আমাদের সত্তার মধ্যেই আছে এই জঙ্গলমহল। মানুষ নিজেই প্রকৃতির এক ক্ষুদ্র সংস্করণ। তার মধ্যে মধুও আছে, আবার বিষও আছে। সে যেমন মধু সংগ্রহ করতে পারে, তেমনই পারে বন ধ্বংস করতে। এই মানুষের মধ্যেই আমি হরিণের সারল্য খুঁজে পাই। কোনও কোনও মানুষের চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, যেন বনের গভীরে কোনও এক হ্রদের ধারে জল খেতে আসা হরিণীর চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। সেই চোখে কোনও জটিলতা নেই, কোনও ছলনা নেই। সেই দৃষ্টির সামনে হৃদয় এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায়। আবার এই মানুষের মধ্যেই আমি কাঠবিড়ালির চপলতা দেখি। তারা সহজে ধরা দেয় না। কাছে এগোতে গেলেই চকিতে আড়ালে পালিয়ে যায়। কিন্তু একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলে, তারা আবার সামনে এসে দাঁড়ায়, লেজ নেড়ে ভাব জমানোর চেষ্টা করে। এরা বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলতে থাকা মানুষ। আর শেয়ালের মতো ধূর্ত মানুষ তো সর্বত্র। তারা অন্যের সাফল্যের ইক্ষু-ক্ষেতে অনায়াসে নিজেদের স্বার্থের লাঙল চালিয়ে দেয়। তারপর আমজনতার ভিড়ে মিশে গিয়ে এমন ভান করে, যেন কিছুই হয়নি। এই ধরনের মানুষেরা কোনও কিছুতেই নিজেদের দায় স্বীকার করে না। তারা সব দলেই থাকে, সব মতবাদের সঙ্গেই নিজেদের মানিয়ে নেয়। তাদের কোনও নিজস্ব আদর্শ নেই। ক্ষমতার হাওয়া যেদিকে বয়, তারা সেদিকেই নিজেদের পাল ঘুরিয়ে নেয়। এরাই হলো ‘সর্বযজ্ঞের কাঁঠালিকলা’—সবকিছুতেই উপস্থিত, কিন্তু কোনও কিছুতেই আন্তরিক নয়।
ভাল্লুক সেই হিসাবে শিকারেও তত পটু নয়। নির্ভেজাল প্রতিভাশালী কুম্ভকর্ণ। খানিকটা মধু পেলে সে চুরিয়ে চুরিয়ে উপভোগ করে। ল্যাদ খাওয়া শরীরে তার মধু লেগে আছে। হে ভল্লুরাজ, যতোটা না মধু, ততোটাই মধুমেহ। যতটা না ল্যাদ, ততটাই পাহাড়তলি থেকে গড়িয়ে যাওয়া পাথর। মধুর মিষ্টতার থেকে অধিক উপভোগ্য তার পরশ। এই শহর থেকে দূর মেদিনীপুর ডাকে, ডাকছে পৃথিবীর মধুরতম নিয়তি। আর আমি? আমি ওই শেয়াল বা হরিণ হতে চাই না। আমি ওই ভাল্লুকের মতোই থাকতে চাই। শিকার করার মতো চাতুর্য আমার নেই। আমি বরং কুম্ভকর্ণের মতো নিজের আলস্যকে উপভোগ করি। আমি যখন মধু পাই, অর্থাৎ যখন কোনও ভালো কবিতা পড়ি বা ভালো গান শুনি, তখন সেটাকে লোক দেখিয়ে জাহির করি না। আমি সেটাকে একা একা, নিভৃতে উপভোগ করি। সেই মধুর রেশ আমার সারা শরীরে, সারা সত্তায় লেগে থাকে। কিন্তু এই অতিরিক্ত মধুও কখনও কখনও বিপদের কারণ হয়। যেমন ভাল্লুকের মধুপ্রীতি তাকে মধুমেহ বা ডায়াবেটিসের দিকে ঠেলে দেয়, তেমনই অতিরিক্ত ভাবালুতা, অতিরিক্ত সংবেদনশীলতাও জীবনকে জটিল করে তোলে। আলস্য বা ‘ল্যাদ’ খাওয়াকে আমরা যতই উপভোগ করি না কেন, তা একসময় স্থবিরতা নিয়ে আসে, পাহাড়ের উপর থেকে গড়িয়ে পড়া পাথরের মতো যা কেবল নীচের দিকেই নামতে জানে। তাই মধুর স্বাদ গ্রহণের পাশাপাশি তার পরশটুকু অনুভব করাই শ্রেয়। সেই পরশটুকু নিয়েই আমি পথ চলতে চাই। শহরের কোলাহল ছেড়ে আমার মন বারবার মেদিনীপুরের দিকে ছুটে যায়। সেই জঙ্গল, সেই শাল-পিয়াল, সেই ধুলোমাখা পথ—সেখানেই যেন আমার আসল নিয়তি অপেক্ষা করে আছে।
এই মধুময় নগরে, তুমি যে চাতাল, আমিও সেই বারান্দা। এই তারকার মহাকাশে সবাই তারকা। এই উজ্জ্বলের আকাশে সবাই উজ্জ্বল, এই মধুক্ষণে সবাই আজ কেমন যেন মধু মধু। আমরা সবাই আসলে একই নগরের বাসিন্দা, কিন্তু আমাদের মধ্যে দূরত্ব অনেক। তুমি যদি এক প্রাচীন বাড়ির চাতাল হও, যেখানে কত স্মৃতি, কত ইতিহাস জমা হয়ে আছে, তাহলে আমি সেই বাড়িরই একলা বারান্দা, যে শুধু বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকে। আমরা একে অপরকে দেখি, কিন্তু ছুঁতে পারি না। এই শহরে সবাই নিজেকে তারকা মনে করে। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে সবাই নিজের জীবনের উজ্জ্বল দিকগুলোই শুধু তুলে ধরে। সবাই সুখী, সবাই সফল। এই মিথ্যে উজ্জ্বলতার আকাশে আসল নক্ষত্রকে চেনা দায়। মাঝে মাঝে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, হয়তো কোনও উৎসবের রাতে বা কোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, যখন মনে হয় সবাই যেন খুব কাছাকাছি এসে গেছে। সবার মুখে হাসি, সবার চোখে আনন্দের ঝলক। সেই ‘মধুক্ষণে’ মনে হয়, এই শহরটা সত্যিই মধুময়। কিন্তু সেই মুহূর্ত কেটে গেলেই আবার যে যার খোলসের মধ্যে ঢুকে পড়ে। চাতাল আর বারান্দার দূরত্ব আবার আগের মতোই প্রকট হয়ে ওঠে।
আমি মধু চেটে খাবো সেই অবসর কই। মধুমেহতে গা যেন জ্বলে জ্বলে যায়। বাবুমশাই, জিন্দেগী অধিকতর মিষ্ট হওয়া চায়, মধুমেহ নয়। অনন্তে সুখ আছে, তোমরা থাকো। আমি আমার স্বল্পতা নিয়ে মেদিনীপুর যাবো। শালপাতার বিশালতায় আমি ঝরে পড়া নক্ষত্র দেখবো। শালপাতার সঙ্গে শুক্লা পঞ্চমীর রাতে মিশে যাবো হেমন্তের পিয়ালে। আমার এই ছুটে চলা জীবনে, মধু চেটে খাওয়ার মতো অবসর সত্যিই নেই। আর যদি বা অবসর মেলে, তখন এই শহরের কৃত্রিম মধুর আধিক্যে আমার শরীর ও মন অসুস্থ হয়ে পড়ে। এই মধুমেহ সর্বগ্রাসী। জীবনের কাছে আমার চাওয়া খুব বেশি নয়। আমি জীবনকে আরও একটু মিষ্টি দেখতে চাই, কিন্তু সেই মিষ্টতা যেন অসুস্থতার কারণ না হয়। যারা অনন্ত সুখের পিছনে ছুটছে, তারা ছুটুক। তাদের অট্টালিকা, তাদের বিলাসবহুল গাড়ি, তাদের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স—সব তাদেরই থাক। আমি আমার এই ‘স্বল্পতা’কে নিয়েই খুশি। আমি ফিরে যাবো আমার মেদিনীপুরে। যেখানে শালপাতার থালায় গরম ভাত খাওয়ার মধ্যে যে আনন্দ আছে, তা কোনও পাঁচতারা হোটেলের বুফেতে নেই। আমি সেই জঙ্গলের গভীরে গিয়ে রাতের আকাশে ঝরে পড়া উল্কাপিণ্ড দেখবো। এক একটি নক্ষত্রের পতন যেন জীবনের এক একটি অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাবে। শুক্লা পঞ্চমীর চাঁদের আলোয়, যখন চরাচর ভেসে যাবে এক অপার্থিব জ্যোৎস্নায়, তখন আমি শালপাতার মর্মরধ্বনির সঙ্গে, হেমন্তের হিমেল হাওয়ার সঙ্গে, আর পিয়াল গাছের নিবিড় আশ্রয়ে নিজেকে বিলীন করে দেব। সেখানেই আমার মুক্তি, সেখানেই আমার প্রকৃত মধুময়তা।
Comments
Post a Comment