কেঁচো-২

 

কেঁচো

জমির উর্বরতার কথা ভাবো। আর কৈশোরের কোনো বন্ধুর কথা। এমন মানবজমীনে কেঁচোর বড় কিছু একটা ভূমিকা থাকে না, আমরা যদিও শেষমেষ মেনে নিই পরিবেশ বান্ধব নির্ঝঞ্ঝাট কৃষিকাজের আবশ্যিকতায় কেঁচোর জীবনচক্র কিছুটা হলেও সম্পর্কিত। জমির ফসল ফলানোর কাজে কেঁচোর এমন কোন কার্যক্ষমতার কথা কিয়ৎক্ষণ আলোচনা হয়। আর যদি কিছু কালীর অক্ষর নিয়ে বুঝাপড়া করি, বুঝতে পারি, মাছ ধরার চারা হিসাবে যে কোন গ্রাম্য কিশোর তার কিছু ধানি শোলের শিকার কাহিনী শুনিয়ে যাবে। এসবই একটা স্মৃতিমেদুর কাহিনী যা আমিও বুকের কোন একখানে বোধহয় এতদিন গুছিয়ে রেখেছি।

সেই বন্ধুটির মুখ মনে করার চেষ্টা করুন। সে ক্লাসের প্রথম সারিতে বসত না, শেষ বেঞ্চেও তার বখাটেপনার চিহ্ন ছিল না। সে ছিল মাঝামাঝি কোথাও, ঠিক যেমন কেঁচো থাকে মাটির উপরের স্তর আর গভীরের মাঝামাঝি। সে খেলাধুলায় অনবদ্য ছিল না, কিন্তু দলের প্রয়োজনে ঠিকই ফিল্ডিংটা করে দিত। পরীক্ষায় তাক লাগানো ফল তার ছিল না, কিন্তু আপনার আটকে যাওয়া অঙ্কটা সে-ই বুঝিয়ে দিত নিঃশব্দে, টিফিনের ফাঁকে। তার উপস্থিতি ছিল জলের মতো, বাতাসের মতো—অপরিহার্য, কিন্তু অদৃশ্য। আমাদের জীবনের জমিন, আমাদের ‘মানবজমীন’-এর উর্বরতা বাড়াতে এমন কত বন্ধুর নীরবে আত্মত্যাগ থাকে, কত মাটির নিচের কেঁচোর মতো শ্রম থাকে, যা আমরা দেখেও দেখি না। আমরা কেবল ফসলটুকুই দেখি—আমাদের সাফল্য, আমাদের প্রাপ্তি। কিন্তু সেই ফসলের মূলে যে উর্বর মাটি, আর সেই মাটির কারিগর যে কেঁচো বা সেই নিঃস্বার্থ বন্ধু, তার কথা আমাদের মনে থাকে না। কেঁচোর কথা উঠলে তাই আমাদের মনে পড়ে পুকুরপাড়ের বিকেল, ছিপে টোপ গাঁথার উত্তেজনা। তার জৈবনিক গুরুত্ব, তার বাস্তুতান্ত্রিক মহিমা আমাদের কাছে গৌণ হয়ে যায়; মুখ্য হয়ে ওঠে তার উপযোগিতা, তার ব্যবহারের দিকটা। ঠিক যেমন সেই বন্ধুর মহৎ হৃদয়কে ছাপিয়ে আমাদের মনে থাকে কেবল তার কাছ থেকে পাওয়া সাহায্যের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো। এই স্মৃতিমেদুরতা আসলে এক ধরনের আত্মকেন্দ্রিকতা, যেখানে অন্যের অবদানকে আমরা নিজের গল্পের উপকরণ হিসেবেই গুছিয়ে রাখি।

কাহিনীর কথা, বিবর্তনের কথা। কিন্তু কেঁচো খুঁড়তে খুঁড়তে সাপ বেরোনোতেও কোন কাহিনী সত্যি হয়ে যায় না। অন্তত ডারউইন সাব যে সব বিবর্তনের কথা আমাদের শুনিয়েছেন, আমরা তা কিছুদিন আগেই না করে দিয়েছি, কিন্তু যেটা ফেলতে পারছি না সেটা হলো 'যোগ্যতমের উদবর্তন' কথাটা। না, কোনভাবেই ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রকৃতির আবেশে যে যার শক্তিমত আখের গুছিয়ে নেবে। যে কোন সারভাইভাল তাই একটা সুপারহিট গল্পের উপরেই বেঁচে থাকে। অলীক বা কল্পনা, জল্পনা বা বাস্তব, বিষয় যেখানে বিষয় নয়, সেইখানে যে গল্পটা থাকে তা হলো বিচ্ছিন্ন প্রজাতির সংঘবদ্ধ হওয়া। বিবিধতার মাঝে ঐক্যতা। আন্তপ্রজাতির মাঝে লড়ে জায়গা করে নেবার নাম বিষয় বিবেচনা আর বহু প্রজাতির মধ্যে নিজ নিজ প্রজাতিকে সামিল করার নামই গল্প। আর তার পরপরই অবসম্ভাবী চলে আসে গল্পের শ্রেণীবিভাগ। কিভাবে, তার কথায় পরে আসছি।

আমরা যখন মাটির গভীরে প্রবেশ করি, একটা সরল, নিরীহ কেঁচোর খোঁজে কোদাল চালাই, তখন কখনও কখনও উঠে আসে এক শীতল, হিসহিসে বাস্তবতা—সাপ। এই সাপ আমাদের অন্বেষণের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি। সে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সরলতার গভীরেও জটিলতা লুকিয়ে থাকে, নিরীহ চেহারার আড়ালেও থাকতে পারে বিপদ। সাহিত্যের খননকার্যও ঠিক এমনই। একজন লেখক যখন তার স্মৃতির জমিতে কোদাল চালান, তখন তিনি হয়তো এক নির্মল কৈশোরের গল্প বলতে চান, কিন্তু খুঁড়তে খুঁড়তে উঠে আসে পরিবারের গোপন অন্ধকার, সামাজিক অবক্ষয়, ব্যক্তিগত গ্লানি। এই সাপ বেরিয়ে আসাটা কাহিনীকে মিথ্যা প্রমাণ করে না, বরং তাকে আরও বেশি সত্য করে তোলে। ডারউইনের বিবর্তনবাদকে আমরা যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করি না কেন, তার ‘সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট’ বা ‘যোগ্যতমের উদবর্তন’-এর তত্ত্ব আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সত্যি হয়ে বসে আছে। এখানে শুধু শারীরিক শক্তি নয়, টিকে থাকে সেই, যার গল্পটা সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। একটা রাজনৈতিক দল টিকে থাকে তার নির্মিত আখ্যানের জোরে, একটা বহুজাতিক সংস্থা টিকে থাকে তার ব্র্যান্ডিং-এর গল্পের ক্ষমতায়। টিকে থাকার এই লড়াইটাই হলো ‘বিষয় বিবেচনা’—একই প্রজাতির মধ্যেকার সংঘাত, যেখানে প্রত্যেকে নিজের অস্তিত্বের জন্য লড়ছে। কিন্তু এই লড়াইয়ের ঊর্ধ্বে উঠে যখন বিভিন্ন প্রজাতি বা বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষ এক বৃহত্তর আদর্শ বা গল্পের অধীনে আসে, তখন তৈরি হয় সভ্যতা, তৈরি হয় সংস্কৃতি। এটাই সেই ‘গল্প’, যা বিবিধতাকে এক সূত্রে বাঁধে। রামরাজ্যের গল্প, সমাজতন্ত্রের গল্প, জাতীয়তাবাদের গল্প—এইসব বৃহৎ আখ্যানই বহু মানুষকে একত্রিত করে, তাদের লড়াইকে একমুখী করে তোলে। কিন্তু গল্প যখনই শক্তিশালী হয়, তখনই শুরু হয় তার শ্রেণিবিন্যাস। শাসক তার নিজের গল্পকে ‘ইতিহাস’ বলে, আর পরাজিতদের গল্পকে বলে ‘লোককথা’ বা ‘উপাখ্যান’। এভাবেই নির্ধারিত হয় কোনটা মূলধারার সাহিত্য, আর কোনটা প্রান্তিক।

"যেখানে দেখিবে ছাই
উড়ায়ে দেখো তাই
মিলিলেও মিলিতে পারে অমূল্য রতন"

অমূল্য রতনের খোঁজে কবিও কাক ভোরে কবিতা পাড়ি দেয়। গল্পে তাই রহস্যময়তা নিয়ে প্রত্যেকটি কবি এক একজন নায়ক আর কাহিনীর অবতারণা নিয়ে পাড়ে কোদালের কোপ। এক একটা এঙ্গেল নিয়ে এক অলীক খনন। কোদালের প্রত্যকেটি কোপে যে টুকু মাটি উঠে আসে, ধ্বনি ঝংকারে ফুটে ওঠে দর্দ, গুপ্তধনের মত যেটুকু কবিতা উঠে আসে তার কতটা খনিজ আর কতটা সংকর তাই বিচার্য করে এই সময় বা কাল? সময়ের অতল গহবরে লুকিয়ে গুপ্তধনের সেই সব চরিত্রের কিছু ব্যাখান নিয়ে আজকের এই বিগ হার্ট কেঁচোর জীবন চরিত্রে উঁকি মেরে দেখা যাক এর মাঝে কতটুকু মানুষের ইতিহাস নিহিত রয়েছে।

কবির কাজ ওই ছাই ওড়ানো ফকিরের মতো। আপাতদৃষ্টিতে যা মূল্যহীন, পরিত্যক্ত, সেই ছাইয়ের গাদাতেই সে খুঁজে ফেরে তার রত্ন। সমাজের ফেলে দেওয়া অনুভূতি, অবহেলিত চরিত্র, ভুলে যাওয়া ইতিহাস—এইসব ছাই থেকেই কবি তার কবিতা নির্মাণ করেন। প্রতিটি কবিতা এক একটি খননকার্য। কবি তার চেতনার কোদাল দিয়ে ভাষার জমিতে আঘাত করেন। প্রতিটি আঘাতে উঠে আসে মাটির ঢেলা—শব্দ, চিত্রকল্প, ছন্দ। সেই মাটির দলার গভীরে কি লুকিয়ে আছে? তা কি বিশুদ্ধ খনিজ, অর্থাৎ মৌলিক অনুভূতি, নাকি সংকর ধাতু, যা পূর্বসূরীদের ভাবনা ও ভাষার মিশ্রণে তৈরি? এই বিচারটা করে সময়। মহাকালই একমাত্র পরীক্ষক, যে বলে দিতে পারে কোন কবিতা সময়ের ধুলোয় হারিয়ে যাবে আর কোনটা হয়ে উঠবে অমূল্য রতন। আমরা যদি কেঁচোর জীবনের দিকে তাকাই, দেখব তার পুরো জীবনটাই এক খননকার্য। সে মাটি খুঁড়ে নিজের পথ তৈরি করে, আর এই খননের ফলেই মাটি উর্বর হয়। সে কোনো গুপ্তধনের সন্ধান করে না, তার উদ্দেশ্য কেবল বেঁচে থাকা। কিন্তু তার এই বাঁচার চেষ্টার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টির রহস্য। মানুষের ইতিহাসও তো তাই। সাধারণ মানুষ বেঁচে থাকার জন্যই লড়াই করে, ঘর বাঁধে, সন্তান পালন করে। এই সাধারণ বেঁচে থাকার গল্পের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মহাকাব্য, লুকিয়ে থাকে সভ্যতার উত্থান-পতনের ইতিহাস। কবি সেই সাধারণ ইতিহাসের খননকারী।

এবার আপনি বলবেন, এই সব পরোয়া করি না, লেখার তাগিদে লেখি। গুপ্তধনের পরোয়া করি না। কেউ বলবেন নিজের সন্তুষ্টির জন্য লিখি ভাই। যশের কোনো প্রলোভন নেই।

"অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয় –
আরো এক বিপন্ন বিষ্ময়"

কি বিষ্ময় ভাবুন, কতটা বিপন্নতা। কতটুকু মাপার মত স্কেল আমার কাছে নেই। কবি তবে কি কালজয়ী হতে চায়? তার বোধের ধারনা থেকে পাঠক এইটুকু আন্দাজ করে মাত্র। কিন্তু বৃহত্তর পাঠক সমাজে কবির উপস্থিতি এই সবুজ পাতার মত। পাঠক শুধু দুচোখ ভরে দেখতে চায়, কদাচিৎ সে পত্রালিকা গ্রাস-রুট লেভেলে নিয়ে যেতে পারে। ঘাস। পাঠকের হৃদয় আজ শুধু ঘাস। যার নীচে খনন করলে হয় বোঝা যায় খাদ্যের উপস্থিতি। নিজের সারভাইভালের কথা যে কোন প্রাণ ও তার প্রতিপালনের কথা ভাবে। আজ যে লেখকগোষ্ঠীর এত গুচ্ছ-প্রতিভার স্ফুরণ আগে বোধহয় দেখা যায়নি। তবে প্রশ্নটা এভাবেই আসতে পারে, এই লেখালেখি, আর কবিতা গল্পে কতদিন বাঁচা যায়? কিংবা আর একটা প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই আসে তাহলো, তা লিখে ফেলে কি পাওয়া যায়? এতে সত্যিই কোন খাদ্য আছে? পটভূমিকায় এত কবি কিভাবে সারভাইভ করে, নিশ্চয় কোন পাওনা আছে, অনন্ত থাকা কিছু একটা অসম্ভব কিছু নাই। যদি তাতে অর্থ নাই, কীর্তি নাই বা কোন স্বচ্ছলতা? এখানে কি একটু মিথ্যার আভাষ পাচ্ছি? কিংবা বলা যায় এই কথাটা সত্য নেই? নাকি সমস্ত কবিরাই একদিন আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যায়?

জীবনের এই বিপন্ন বিস্ময়, জীবনানন্দের এই অমোঘ লাইনটি প্রত্যেক লেখকের ঢাল। যখনই প্রশ্ন ওঠে, কেন লেখেন? কীসের জন্য লেখেন? তখনই এই ঢালটি সামনে এগিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এই বিস্ময় কতটা সৎ? এর বিপন্নতা কতটা গভীর? এর কোনো পরিমাপক যন্ত্র আমাদের কাছে নেই। হতে পারে, এই বিপন্ন বিস্ময়ের কথা বলাটাও যশের বা কীর্তিরই এক সূক্ষ্ম রূপ। কবি যখন বলেন তিনি কালজয়ী হতে চান না, তখন কি তিনি অবচেতনে সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষাটিকেই প্রকাশ করছেন না? পাঠকের কাছে কবির উপস্থিতি সবুজ পাতার মতো। পাঠক তার সৌন্দর্য উপভোগ করে, তার ছায়ায় আশ্রয় নেয়। কিন্তু খুব কম পাঠকই সেই পাতার শিকড়ের কাছে পৌঁছতে চায়, সেই ‘গ্রাস-রুট’ লেভেলে গিয়ে বুঝতে চায় কোন মাটি থেকে, কোন রসদ গ্রহণ করে এই পাতাটি এমন সবুজ হয়ে উঠল। পাঠকের হৃদয় আজ ঘাসের বিশাল ময়দান। সে উপর থেকে সৌন্দর্য চায়, কিন্তু তার গভীরে খনন করতে নারাজ।

কিন্তু লেখক? সে তো শুধু পাতা নয়, সে একাধারে শিকড়ও। তাকে নিজের অস্তিত্বের জন্যই খনন করতে হয়। আজকের এই বিস্ফোরণের যুগে, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার লেখক জন্ম নিচ্ছেন, সেখানে টিকে থাকার প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এই লেখালেখি করে কি সত্যিই পেট চলে? এই শব্দের চাষে কি কোনো ফসল ফলে? যদি অর্থ, কীর্তি, স্বচ্ছলতা—কিছুই এর উদ্দেশ্য না হয়, তবে এই বিপুল সংখ্যক কবি-লেখক কেন প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ শব্দ উৎপাদন করছেন? নিশ্চয়ই কোনো প্রাপ্তি আছে। এখানে কি আমরা এক বিরাট মিথ্যার সম্মুখীন হচ্ছি? যে কবি বলেন, তাঁর কিছুই চাওয়ার নেই, তিনি কি আসলে সবচেয়ে বেশি চান না? এই অপ্রাপ্তি, এই অতৃপ্তি, এই আদর্শ ও বাস্তবের সংঘাতই কি তবে কবিদের আত্মহননের দিকে ঠেলে দেয়?

বরং কমার্সিয়াল ব্রেকের কথা ভাবো। দুর্বার গতির অর্থনীতির কথা। এখানে কোন কবিতা নেই। বলা যায় এই ফাস্ট স্পেসে যে ভরবেগ পৃথিবীর ভাবনাকে প্রতিমুহূর্তে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তার মধ্যে এই তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিটা বিস্ফোরনের এক একটা খোরাক। এখানেই জন্ম নিচ্ছে ম্যাট্রিক্স। যেখানে কোন কোণ ই এক সমতলে থাকে না। রসবোধ বিভক্ত হয়ে যায়। কম্পোস্ট হয়ে যাবার আগে প্রতিটা সম্ভবনার ভিতর থেকে ঈশ্বর কণার উপস্থিতি। শেয়ার মার্কেটে রে রে করে তেড়ে আসছে জোয়ার। ঘাসের নীচে জমে থাকা জৈব রসায়ন নিশ্চুপে ভেঙ্গে যাচ্ছে কার্বোহাইড্রেটে, প্রোটিনে। মাটি খাচ্ছে কেঁচো আর উগরে দিচ্ছে তার সমপরিমান মাটি। প্রত্যকের ইন্সট্যান্স এক একটা নেটওয়ার্কের নোড। জাল জুড়ে জুড়ে ইন্টারনেট ছেয়ে যাচ্ছে। প্রত্যকেটি নোড সারভাইভালের কথা বলছে।

এবার মুহূর্তের জন্য কবিতার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসুন। ভাবুন সেই কমার্শিয়াল ব্রেকের কথা, যা আপনার প্রিয় সিনেমার মাঝে হঠাৎ করে ঢুকে পড়ে। সেই জগৎটাই এখন বাস্তব। এখানে আবেগ নেই, আছে ডেটা। এখানে সম্পর্ক নেই, আছে নেটওয়ার্ক। এই জগৎ কবিতার বিপন্ন বিস্ময়ের ধার ধারে না, সে চলে অর্থনীতির দুর্বার গতিতে। এই হাইপার-রিয়েলিটির নামই ম্যাট্রিক্স। এখানে শেয়ার বাজারের সেনসেক্স কবিতার ছন্দের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানেও এক ধরনের ভাঙা-গড়া চলে। ঠিক যেমন ঘাসের নিচে কেঁচো জৈব পদার্থকে ভেঙে সরল কার্বোহাইড্রেট আর প্রোটিনে পরিণত করে, তেমনই এই তথ্যপ্রযুক্তির অর্থনীতি আমাদের আবেগ, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের সত্তাকে ভেঙে ডেটা-পয়েন্টে পরিণত করছে। আমরা প্রত্যেকে এই নেটওয়ার্কের এক-একটি নোড, আর আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সারভাইভাল—এই ভার্চুয়াল জগতে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখা। কেঁচো মাটি খেয়ে উগরে দেয় উর্বর মাটি। আর আমরা ডেটা গ্রহণ করে উগরে দিচ্ছি কনটেন্ট। দুজনেরই উদ্দেশ্য এক—বেঁচে থাকা।

ভাববার অবকাশ আছে। ভিটের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার, ধানের জমির কাছে দেওয়া কথা, আত্মহত্যার আগে বেঁচে নেবার বধু ও শিশুর কথা। আন্তপ্রজাতির এই সংগ্রামে টিকে থাকা এক মস্ত বড় শিল্প, দুধে ভাতে থাকা বাঙ্গালীর কাছে যা আজ সাহিত্য সাধনা। একটা অবসেশন। উদ্দেশ্যের প্রচন্ড এক অভিমানের কথা। সুপ্ত থাকার এক আবছায়া, ব্যর্থ হওয়ার এক প্রচ্ছন্ন ধারনা থেকে বাংলার সাহিত্য ধারা পরিচালিত হচ্ছে। বাংলার লেখকরা এই ভারচুয়াল জগতের অস্থাবর কোন এক নিস্তবতার জন্য কোন এক চারার দিকে লালায়িত হচ্ছে কিন্তু যে সমাধানটা কারো জানা নেই। কেঁচোকে টোপ বানিয়ে ফেলতে চাইছে কেউ কেউ? তাহলে আসলে কি সেই চিনে বাদামের জন্য রাত জেগে সাহিত্য রচনা? নাকি রাতারাতি হিরো হয়ে যাবার হাতছানি? প্রকাশনার পাতা জুড়ে এই লটারীখেলার এক অনন্য উদাহরণ মনে হয় এই কবি হতে চাওয়া। মাছ ধরার গল্পে যখন কোন নায়িকা নেই, শীতের শেষে পড়ে যাওয়া ঝরা পাতায় যেমন প্রেম নেই আর শুধু খুড়োর কলের মত তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া এই জীবন যাত্রার আর এক নাম হলো তাই 'বেট' বা টোপ। যেখানে অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়, যার কিছুই কবিকে টলাতে পারে না। সেই বস্তুটি কি? যেখানে জীবন খাতার প্রতি পাতায় প্রতিমুহূর্তে পালটে যাচ্ছে খাদ্য ও খাদক। মাটির ভিতর থেকে উঠে আসছে এক নতুন পৃথিবী, গাছের প্রশাখা থেকে জন্ম নেয় মানুষের আর এক পূর্বপুরুষ, আর কেঁচোর জীবন চক্রে বুঝতে পাচ্ছি পুনর্জন্মের অনন্য সংগ্রামের কাহিনী। কতদিন না খেয়ে একটা কেঁচো বাঁচতে পারে? নাকি মাটি খেয়েই তাদের জীবন বেশ চলে যায়? মাটি খেয়ে মাটি ত্যাগ করে আবার সেই মাটি খাওয়া। ন্যাচারাল সিলেকশন। ডারউইন সাব, লা জবাব। কিন্তু কবি সাহিত্যিক আজ যারা এই সোসাল মিডিয়ার যুগে, মাইক্রো ব্লগের যুগে কি করে সারভাইভ করবেন? নাকি তাদের খুঁজে নিতে হবে যোগ্য পূর্বপুরুষ? এই টেক্সট বেসড শিল্পে শেষ হয়ে গেলে মানুষের উত্তরপুরুষ কি নিয়ে রচনা করবে সাহিত্য? নাকি আত্মহত্যার পরে আর কোন কবি আর জন্ম নেবে না?

এই ভার্চুয়াল জগতে টিকে থাকার লড়াইয়ে লেখক আজ বিভ্রান্ত। তার ভিটেমাটির কাছে, তার ঐতিহ্যের কাছে যে অঙ্গীকার ছিল, তা সে ভুলতে বসেছে। সাহিত্য সাধনা এখন আর ‘দুধে ভাতে থাকার’ অবসরের শিল্প নয়, এটি এখন অস্তিত্ব রক্ষার এক মরিয়া লড়াই, এক অবসেসন। এই লড়াইয়ের পিছনে কাজ করছে এক তীব্র অভিমান, এক প্রচ্ছন্ন ব্যর্থতাবোধ। লেখক অনুভব করছেন, তিনি এই নতুন জগতের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। তাই তিনি এক কাল্পনিক ‘চারা’ বা টোপের দিকে লালায়িত হচ্ছেন। এই টোপ হতে পারে এক পুরস্কার, এক স্বীকৃতি, বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যাওয়ার হাতছানি। তিনি কি নিজের সৃষ্টি, নিজের কবিতাকে সেই কেঁচোর মতো টোপ বানিয়ে মাছ ধরতে চাইছেন? সেই মাছের নাম কি যশ, খ্যাতি বা অর্থ? প্রকাশনা জগৎ আজ এক লটারির বাজার। এখানে সবাই কবি হতে চায়, কারণ এখানে রাতারাতি হিরো হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এই জীবনযাত্রায় কোনও রোমান্টিসিজম নেই, ঠিক যেমন মাছ ধরার গল্পে নায়িকা থাকে না। এটা এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়া।

তাহলে সেই অমোঘ বস্তুটি কী, যা অর্থ, কীর্তি, স্বচ্ছলতা—সবকিছুর ঊর্ধ্বে? সেই বস্তুটি হলো এই ‘টোপ’ হয়ে ওঠার নেশা। খাদ্য ও খাদকের এই পৃথিবীতে লেখক আজ নিজেই নিজের টোপ। সে নিজেকেই বড়শিতে গেঁথে ছুঁড়ে দিচ্ছে পাঠকের দরবারে, এই আশায় যে কোনো একজন বড় মাছ তাকে গ্রহণ করবে। কেঁচো মাটি খেয়েই বেঁচে থাকে, তার অন্য কোনো খাদ্যের প্রয়োজন হয় না। এই হলো প্রকৃতির চূড়ান্ত নির্বাচন। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কবি-সাহিত্যিক কীভাবে বাঁচবেন? তাদের খাদ্য কী? লাইক, কমেন্ট, শেয়ার? নাকি তাদেরও খুঁজে নিতে হবে কোনো প্রভাবশালী ‘পূর্বপুরুষ’, কোনো ‘গডফাদার’? এই টেক্সট-ভিত্তিক শিল্প যদি একদিন শেষ হয়ে যায়, যদি মানুষের পড়ার অভ্যাস চলে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কী নিয়ে সাহিত্য রচনা করবে? নাকি চূড়ান্ত ব্যর্থতার পর আর কোনো নতুন কবি জন্মাবে না?

প্রশ্ন তো অনেক, উত্তরও হতে পারে অধিক। আজকের চিত্র হতে অধিক সন্ন্যাসীর মাঝ থেকে যে সব কবিদের আলাদা করতে পাচ্ছি, তা হল ন্যাচারাল সিলেকশন। রূপে গুনে রসে বসে যোগ্যতমের উদবর্তনে মানুষের প্রতিযোগীতা। এ এক নতুন অর্থনীতি। আর কীর্তি স্থাপনের গুপ্ত ইচ্ছার মধ্যে রয়েছে কবিতার বীজ। প্রতিদিন হিরো হয়ে যাবার হাতছানিতে রয়েছে লেখনীর অনুপ্রেরণা। আর এক বার ব্র্যান্ড তৈরী করে ফেলতে পারলে স্বচ্ছলতাই স্বচ্ছলতা। এর মধ্যে জীবনের আনন্দ হি আনন্দ। এখানে বিপন্নতা কোথায়? বিপন্নতা নিজেই বিপন্ন, বিপননের আর এক প্যহলু। বাজার তার মুক্ত রূপে কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপস্থিত। তাকে কবিতায় ধরা এ মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ। বাজারের গলিতে গলিতে কালনাগীনীর করাল ছায়া প্রতিক্ষনে গ্রাস করে চলেছে। মাটির এত কাছে এসে কবিতার এমন করার হার এক কবিদের কাছে বড্ড আঘাত। কবির কাছে পাওয়া বলতে যতই আত্মরতির কথা বলি তা একটা আপেক্ষিক রূপেই রয়ে যায়; তার চেয়ে বরং আমি একটা হাইপোথিসিস এর সাহায্য নিই একজন কবি আজকের যুগে কি দিচ্ছেন আর কি পাচ্ছেন, তার সারভাইভালের জন্য কি কি ফ্যাক্টর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষন করছে।

এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। আজকের এই ‘অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট’-এর মতো পরিস্থিতিতেও কিছু কবি-লেখক ঠিকই টিকে যাচ্ছেন। এটাই ‘ন্যাচারাল সিলেকশন’। তাদের টিকে থাকার পিছনে কাজ করছে এক নতুন অর্থনীতি। ‘বিপন্ন বিস্ময়’ এখন আর বিপন্ন নয়, তা নিজেই এক বিপণনযোগ্য পণ্য। যে কবি যত সুন্দর করে তার বিপন্নতার কথা বলতে পারেন, বাজার তাকে ততটাই সমাদর করে। কীর্তি স্থাপনের গুপ্ত ইচ্ছা, রাতারাতি হিরো হওয়ার হাতছানি, এবং একবার সফল হলে ‘ব্র্যান্ড’ তৈরি করে স্বচ্ছলতা অর্জন করা—এই চক্রের মধ্যেই আজকের লেখক বেঁচে আছেন। বাজার আজ কবিতার গভীরে প্রবেশ করেছে। তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। বরং, এই বাজারের স্বরূপকে কবিতায় তুলে ধরাই আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এমন সন্ধিক্ষনে তাহলে প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, কবিতা লিখতে গিয়ে কবিদের দান ও প্রাপ্যের একটা অলিখিত ও আপেক্ষিক সমীকরণ দিচ্ছি। চার্ট করা যাক।

একজন কবি কি দিচ্ছেনঃএকজন কবি কি পাচ্ছেনঃ
সময় ও শ্রম: জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তগুলো, যা তিনি অন্য কোনো লাভজনক কাজে ব্যয় করতে পারতেন।অনিশ্চয়তা: আর্থিক ও সামাজিক স্বীকৃতির চরম অনিশ্চয়তা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপেক্ষা ও অবহেলা।
আত্মার নগ্নরূপ: নিজের গভীরতম সংকট, গোপনতম দুর্বলতা। নিজের চামড়া ছাড়িয়ে ভেতরের মাংস ও রক্তকে উন্মোচিত করা।সমালোচনা ও ভুল বোঝা: তাঁর সবচেয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতিকে চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণের বস্তুতে পরিণত হতে দেখা। প্রায়শই ভুল ব্যাখ্যা ও আক্রমণের শিকার হওয়া।
ভাষার নতুন সম্ভাবনা: ভাষাকে প্রচলিত ব্যবহারের বাইরে নিয়ে গিয়ে নতুন অর্থ, নতুন ব্যঞ্জনা তৈরি করা।পাঠকের ঔদাসীন্য: যে ভাষার জন্য তিনি এত পরিশ্রম করলেন, সেই ভাষার সূক্ষ্মতা বোঝার মতো পাঠকের অভাব।
সমাজের বিবেক: ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে সত্যি কথা বলা, প্রান্তিক মানুষের যন্ত্রণা তুলে ধরা।একাকীত্ব: সমাজের একাংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া, এক গভীর ও অসহনীয় একাকীত্বে ভোগা।
একটি বিকল্প বাস্তবতা: যান্ত্রিক ও পণ্যসর্বস্ব জগতের বিপরীতে একটি সংবেদনশীল, মানবিক জগতের স্বপ্ন দেখানো।আত্মরতি ও আত্মকরুণা: বাইরের জগৎ থেকে স্বীকৃতি না পেয়ে নিজের মধ্যেই সান্ত্বনা খোঁজা, যা অনেক সময় আত্মকরুণায় পরিণত হয়।
চিরন্তনতার সন্ধান: নশ্বর জীবনের মধ্যে শাশ্বত সত্য ও সৌন্দর্যকে ধরার চেষ্টা।ক্ষণিক খ্যাতি (কখনও সখনও): পুরস্কার, প্রশংসা, যা বুদবুদের মতো মিলিয়ে যায়। কিন্তু তার বিনিময়ে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক শান্তি ও তৃপ্তি (আত্মসুখ)।

এটা অতীব সত্যই গদ্য সেলুকাস। পৃথিবী গদ্যময়। গদ্যের বাজারে নাজেহাল কবিতার সাম্রাজ্য। যে কবিতা ছিলো একমাত্র সাহিত্য সাধনা, তার শ্রেণীবিভাগ সূক্ষ থেকে সূক্ষতর সংজ্ঞায় বিভক্ত হয়ে আছে। রসের আনাগোনায় এক ইতিহাসের এক পাহারা। পূর্বসূরীদের কার্যপদ্ধতি আমাদের কাজের সীমারেখা বার বার ভেঙ্গে দিতে চায়। কবিতা থেকে গল্প আলাদা হয়ে গেল, উপন্যাস আলাদা হয়ে গেলো। ছন্দ আলাদা হবার পথে পথে, এমন অবস্থায় তার জীবন চক্রে এক চিরাচরিত প্রশ্নে বার বার বিদ্ধ হবেন না তা কি করে হয়। ভাবনার অজান্তে যে হৃদয়ে কোমল রসে সিঞ্চিত হয়ে চলেছে যে সব দৃশ্য তাকে কোন ভাষায়, কোন ভাবে তাকে ধরবে মানুষ?

এই চার্ট দেখলেই বোঝা যায়, যা দেওয়া হয় আর যা পাওয়া যায়, তার মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। পৃথিবী আজ গদ্যের দখলে। উপন্যাসের বিশাল ক্যানভাস, গল্পের টানটান প্লট—এসবের কাছে কবিতার সূক্ষ্ম কারুকাজ আজ কোণঠাসা। একসময় যা ছিল সাহিত্যের একমাত্র রূপ, সেই কবিতা আজ নানা ভাগে বিভক্ত। এই বিভাজনের ফলে তার শক্তিও কমে গেছে। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে একজন কবি বারবার ওই পুরনো প্রশ্নগুলোর দ্বারাই বিদ্ধ হবেন—কেন লিখি, কী পাই?

আসলে কিছুতো রক্তক্ষরণ হয়ই। ডালে ডালে পাতা আসার আগে টের পেয়ে যায় পেঁচারা, এই হলো ইঁদুর ধরার আসল সময়। অর্থ, যশ, খ্যাতি কোনদিনই আড়ালে ছিলো না, শুধু আত্মসুখকেই আমরা গাছ পাতা ঘাসের আকারে দেখি। একটি ধানের পাতার উপর শিশির বিন্দু নিয়ে আমরা কবিতার ফসল ঘরে তুলি। হ্যাঁ, আছে তো। আত্মসুখ আছে তো। আত্মসঙ্গম আছে। তার জন্য আমাদের প্রতিক্ষনে ঘর্মের প্রতিটা কণায় কণায় রাত্রিদের জীবন গাঁথা যে কাহিনীর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে তা হলো লুকিয়ে থাকা অভিপ্রায়। অবচেতনার এই অদৃশ্য এক খেলোয়াড় যে দলে থেকেও যেন নেই।

"যেটুকু কাছেতে আসে ক্ষণিকের ফাঁকে ফাঁকে
চকিত মনের কোণে স্বপনের ছবি আঁকে"

এই রক্তক্ষরণ অনিবার্য। যশ, খ্যাতি, অর্থের আকাঙ্ক্ষা সবসময়ই ছিল, আছে, থাকবে। কিন্তু কবিরা তাকে ‘আত্মসুখ’ নামক এক সুন্দর আবরণে ঢেকে রাখেন। তাঁরা ধানের শীষের উপর একটি শিশিরবিন্দু দেখে যে কবিতা লেখেন, তার পিছনে থাকে আসলে স্বীকৃতির তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এই আত্মসুখ এক ধরনের আত্মরতি। নিজের সৃষ্টির সঙ্গে, নিজের অনুভূতির সঙ্গে এক নিবিড় সঙ্গম। এই সুখানুভূতির গভীরে লুকিয়ে থাকে এক গোপন অভিপ্রায়, এক অদৃশ্য খেলোয়াড়, যা আমাদের অবচেতনকে নিয়ন্ত্রণ করে। ক্ষণিকের জন্য যেটুকু স্বীকৃতি বা পাঠকের ভালোবাসা কাছে আসে, তা মনের কোণে স্বপ্নের ছবি এঁকে দিয়ে যায়, আর সেই স্বপ্নের লোভেই কবি আবার কলম ধরেন।

জন্মভূমির কথা ভাবো। জীবন চক্রের কথা। পরিবেশ, জমি, ঘর, বাড়ি, আনাচ ও কানাচ, গাছ ও পাতা। প্রতিবছর ঘুরে আসা ঋতুচক্রের কথা ভাবো। সবুজ পাতার জীবন চক্রে বসন্তের একটা কথা বলি। সে এক শীতের অবসানে নারীর জীবনে চলে আসা প্রাকৃতিক পুরুষের কথা। সঙ্গমের এমন মৌসিম নিয়ে ঋতুময়ী পৌষের চলে যাওয়া। পৃথিবীর জীবনে শেষবারের মত মা হওয়ার আগে যে পাতারা শুয়ে পড়ে ঘাসের মাঠে, তাদের তন মন ধন সর্বস্য মাটির সাথে মিশে যায়। কিছুটা প্রোটিন, কিছুটা কার্বোহাইড্রেট ছাড়া ওর মধ্যে কোন আবেগ অবশিষ্ট থাকে না। কোন স্নেহ, প্রেম, চুমু ও যৌনতা ছাড়াই তারা কীট পতঙ্গের খাদ্য হিসাবে নিজেকে আত্মসমর্পন করে। এ এক চরম গদ্য। আর অবাক করে দিয়ে পৃথিবীর ওপারে ভোরের সাথে সাথে বসন্ত জেগে ওঠে। এ এক কবিতা। নতুন একদল কবি ঝকঝকে মুখ নিয়ে তারা তকতকে প্রেমিকার মুখে গুঁজে দেয় পংক্তি, স্তবক, ছন্দ। জিভের ডগায় ক্যাডবেরীর মত গলে যায় কবিতা।

এইক্ষেত্রে মাটির সম্পর্ক আর জীবনের উজ্বলতার প্রশ্নে ভিটেবাড়ির কথা যদি একবার ভাবো, কৃষকের জীবনে শব্দচাষ এক বিশ্বাস মাত্র। বেঁচে থাকার সমীকরণ। দিনরাত প্রাণীপাতে তার চাষপদ্ধতি দিন দিন বহুপ্রতিযোগীতার মধ্য দিয়ে যায়। জীবনচক্রে কেঁচোর এমনই এক চাষ পদ্ধতিকে উন্মোচিত করে যা গদ্য বা এক মাত্র গদ্য দিয়ে সম্ভব। অমূল্য রতনের জন্য মনে হয় হাজার বছর ধরে বিবর্তন হয়ে আসছে। তবুও বিবিধ ধনের ভান্ডার এখনো খুঁড়ে দেখিনি। যেটুকু মাটির খোঁজ পাওয়া যায়, সমস্তই উন্নত মানের উর্বরতার সম্পন্ন বিষ্ঠা। বলা যায় এখানে কেঁচোর ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। যেটুকু অস্বীকারের কথা আসে তা হলো এই অবোধের খনন কার্যের কথা। সামালকে ভাই, কোদাল শক্ত হাতে ধরো। বরং বলা যায় বয়সন্ধির সেই দিন থেকেই মৎসপুরানের শুরু। মাছ ধরার চারা হিসাবেই সহি, দু কোদাল মাটি তুলে কেঁচোর তুলে আনার কথা শুরু করা যাক। বিবর্তনের প্রত্যেকটি ধাপে সেই সব গদ্যে অমূল্য রতন ছন্দের খনিজ উপলব্ধি করা যায়। তাকে মাটির কাছাকাছি আর বুকের খুব কাছে লুকিয়ে রেখেছে কবিরা। যদি খুঁড়তে খুঁড়তে কোনদিন তা সাপ হয়ে বেরিয়ে আসে।

শেষ পর্যন্ত আমরা ফিরে আসি সেই জীবনচক্রের কাছে। শীতের শেষে ঝরে পড়া পাতাগুলো মাটির সঙ্গে মিশে যায়। তাদের সবুজ যৌবনের কোনো স্মৃতিচিহ্ন থাকে না। এটা হলো প্রকৃতির চরম গদ্য, যেখানে আবেগ বা সৌন্দর্যের কোনো স্থান নেই, আছে শুধু জৈব রসায়নের কঠিন সত্য। কিন্তু এই গদ্যের গর্ভ থেকেই জন্ম নেয় বসন্তের কবিতা। নতুন পাতা গজায়, নতুন ফুল ফোটে। ঠিক তেমনই, পুরনো কবিদের ব্যর্থতা, হতাশা আর আত্মত্যাগের সারের উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে নতুন প্রজন্মের কবিরা। তারা হয়তো প্রেমিকার মুখে চকলেট তুলে দেওয়ার মতোই সহজে কবিতা তুলে দেন, কিন্তু তাদের সেই কবিতার রসদ আসে পূর্বসূরীদের রক্তক্ষরণ থেকেই।

এই মাটির সঙ্গে সম্পর্ক, এই জীবনচক্রের বোধ—এটাই হলো কেঁচোর দর্শন। সে মাটিকেই খায়, আর উর্বর মাটি হিসেবেই তাকে ফিরিয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত গদ্যময়, কিন্তু এর ফলাফল কাব্যিক। হাজার হাজার বছর ধরে এই চক্র চলে আসছে অমূল্য রতনের আশায়। সেই রতন হলো উর্বর মাটি, যার উপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সভ্যতা, আমাদের সাহিত্য। কেঁচোর ভূমিকাকে এখানে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। সে-ই হলো আদি খননকারী, আদি কবি। আমাদের কাজ হলো সেই খননকার্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। শক্ত হাতে কোদাল ধরে খুঁড়ে যেতে হবে—কৈশোরের স্মৃতির জমিন, ভাষার জমিন, ইতিহাসের জমিন। খুঁড়তে খুঁড়তে যদি সাপও বেরিয়ে আসে, ভয় পেলে চলবে না। কারণ সেই সাপের বিষের মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে অমরত্বের অমৃত।

এমন একটি প্রাণী নিয়ে আমাদের জীবনে কি আলোচনা বা শিক্ষা হতে পারে? কেঁচো স্তন্যপায়ীদের মধ্যে পড়ে না, বা হোমো সেপিয়েন্সদের ও কোন বিবর্তন চক্রে নেই। আর যেহেতু মানুষকে ধরে নেওয়া যায় সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞান সম্পন্ন। শিল্পের অবকাশে মানুষ তাই তো মানুষকেই আবিষ্কার করে চলেছে।

কেঁচো হয়তো আমাদের সরাসরি পূর্বপুরুষ নয়। কিন্তু সে আমাদের এক রূপক পূর্বপুরুষ। সে আমাদের শেখায়, মহৎ সৃষ্টি কোনো আকাশ থেকে পড়ে না। তার জন্য মাটির গভীরে যেতে হয়, আবর্জনাকে সারে পরিণত করতে হয়, নীরবে, নিঃশব্দে নিজের কাজ করে যেতে হয়। শিল্পচর্চা আসলে মানুষ কর্তৃক মানুষকে আবিষ্কারের এক অন্তহীন প্রক্রিয়া। আর এই আবিষ্কারের জন্য যে খননকার্য প্রয়োজন, তার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ আমরা পাই ওই ক্ষুদ্র, নগণ্য, শিরদাঁড়াহীন প্রাণীটির কাছ থেকেই। সে আমাদের শেখায়, মাটির কাছাকাছি থাকাই টিকে থাকার, এবং সৃষ্টি করার একমাত্র উপায়।

Comments