মহাকাল

মহাকাল

সাল: ২০৫০ খ্রিস্টাব্দ । কদমখালি গ্রাম থেকে বহু দূরে, এক বহুতল ভবনের পঁয়ত্রিশ তলার জানালার কাঁচের ভেতর দিয়ে বাইরের নিওন-আলোয় ভেজা শহর দেখছেন ডঃ কমলিকা প্রামাণিক । দশম শ্রেণীর সেই বালিকা আজ কম্পিউটেশনাল লিঙ্গুইস্টিকস এবং নিউরো-এসথেটিক্স-এর একজন প্রতিষ্ঠিত গবেষক । তার কাঁচা মাটির বারান্দা, আম জাম সজিনার বনস্থলী আর প্রপিতামহের কোদালে কাটা পুকুর আজ কেবলই এক আবছা হয়ে আসা স্মৃতি, এক দীর্ঘশ্বাস । সময় বয়ে গেছে । যে ভবিষ্যতের কথা একদিন এক খেয়ালী লেখকের লেখায় আন্দাজ করা হয়েছিলো, সেই ভবিষ্যৎ আজ বর্তমান ।

কমলিকার সামনে একটি হলোগ্রাফিক স্ক্রিন ভেসে আছে । সেখানে চলছে তার নতুন রিসার্চ প্রজেক্টের কাজ । প্রজেক্টের নাম: "কাব্যমंथন" । এটি একটি অত্যাধুনিক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যা ব্যবহারকারীর নির্দেশ অনুযায়ী কবিতা তৈরি করতে পারে । শুধু তাই নয়, ব্যবহারকারীর মস্তিষ্কের আবেগীয় তরঙ্গ (emotional brainwaves) বিশ্লেষণ করে সেই অনুযায়ী শব্দের বিন্যাস, উপমার প্রয়োগ এবং ছন্দের নির্মাণ করতে পারে এই যন্ত্র । আজ আর কবিদের রাত জেগে শব্দের জন্য হাহাকার করতে হয় না । সম্পাদকের দপ্তরে পাণ্ডুলিপি নিয়ে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে হয় না । কয়েকটি ক্লিক, কয়েকটি কমান্ড, আর মুহূর্তের মধ্যে তৈরি হয়ে যায় নিখুঁত সনেট, নিঁখুত হাইকু, নিখুঁত গদ্যকবিতা । জীবনানন্দের বিষণ্ণতা, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উদ্দামতা, বা শঙ্খ ঘোষের নিবিড়তা—শুধু প্যারামিটার সেট করে দেওয়ার অপেক্ষা । কবিতা এখন একটি সার্ভিস, একটি প্রোডাক্ট । সাবস্ক্রিপশন মডেলে উপলব্ধ ।

কমলিকা ভাবেন, সেই ২০২০ সালের কথা । সেই ফেসবুকের কবিদের কথা, যাদের লেখা নিয়ে কত আলোচনা, কত ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ হতো । আজ মনে হয়, তাঁরাই ছিলেন শেষ প্রজন্মের প্রকৃত মানবকবি । তাঁদের কবিতায় ভুল থাকতো, ছন্দপতন হতো, উপমা হয়তো অনেক সময় অতিরঞ্জিত মনে হতো, কিন্তু তার পিছনে থাকতো এক রক্ত-মাংসের মানুষের ক্লান্তি, আনন্দ, ব্যর্থতা আর ভালোবাসার ইতিহাস । সেই অমসৃণতাই ছিল তার প্রাণ । "কাব্যমंथন" নিখুঁত কবিতা লেখে, কিন্তু তার কোনো স্মৃতি নেই, কোনো শৈশব নেই, পুকুরঘাটে বসে থাকা কোনো একলা বিকেল নেই । সে জানে লক্ষ কোটি শব্দ, জানে তাদের সমস্ত সম্ভাব্য বিন্যাস, কিন্তু সে জানে না একটি শুঁয়োপোকাকে দীর্ঘক্ষণ ধরে দেখার বিস্ময় ।

তাঁর মনে পড়ে যায় সেই সবুজ গুল্মের ডালে কোমর বেঁকিয়ে হেঁটে যাওয়া শুঁয়োপোকাটির কথা । একটি শুঁয়োপোকার প্রজাপতি হয়ে ওঠার যে দীর্ঘ অপেক্ষা, যে রূপান্তর, তার মধ্যে যে নাটকীয়তা ছিল, সেই 'ড্রিম মোমেন্ট'—আজ তার কোনো মূল্য নেই । কারণ "কাব্যমंथন" এক সেকেন্ডে লক্ষ লক্ষ ডিজিটাল প্রজাপতি তৈরি করতে পারে, তাদের ডানার রঙের বর্ণনা দিতে পারে হাজারো শব্দে, তাদের উড়ানের গতিপথ নিয়ে রচনা করতে পারে হাজারো পঙক্তি । কিন্তু সেই একটি সত্যিকারের প্রজাপতির প্রথম উড়াল দেখার যে মানবীয় অনুভূতি, যে 'ওয়াও' মুহূর্ত, তা সে কোনোদিন অনুভব করতে পারবে না । শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হওয়ার রূপান্তরটি ছিল একটি একক, অদ্বিতীয় ঘটনা । কিন্তু যখন লক্ষ লক্ষ প্রজাপতি কারখানায় উৎপাদন করা সম্ভব, তখন সেই একক ঘটনার মহিমা হারিয়ে যায় ।

আজকের পৃথিবীতে কবিতার অভাব নেই । যেদিকে তাকানো যায়, শুধু কবিতা । বিজ্ঞাপনে, কর্পোরেট ই-মেইলে, এমনকি ট্র্যাফিক সিগন্যালের ডিজিটাল বোর্ডেও ভেসে ওঠে কম্পিউটার-জেনারেটেড পঙক্তিমালা । কবিতার এই বিপুল উৎপাদন, এই সহজলভ্যতা, কবিতাকেই গুরুত্বহীন করে তুলেছে । যেভাবে অতিরিক্ত উৎপাদনে মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়, সেভাবেই কবিতার অবমূল্যায়ন হয়েছে ।

কমলিকা তার হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে কমান্ড দেন: "একটি কবিতা লেখো । বিষয়: স্মৃতি । অনুষঙ্গ: গ্রামের পুকুর, হারিয়ে যাওয়া শৈশব । কবির নাম: কমলিকা প্রামাণিক ।"

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে স্ক্রিনে ভেসে ওঠে চোদ্দ লাইনের একটি নিখুঁত সনেট:

স্মৃতির সরণি বাঁকা, পুকুরের জল, 

নুয়ে থাকা আম্রশাখে ডাকে পিউপাখি, 

সে বিকেল আজও মনে ছবি তুলে রাখি, 

ঘাসের ডগায় কাঁপে শিশির তরল ।

হারানো সে মুখগুলি, কথা কোলাহল, 

মাটির বারান্দা ছাড়ে সোঁদা গন্ধমাখা, 

সময় গিয়েছে চলে, পথ গেছে বেঁকে, 

তবুও সে গন্ধে আজও মন উচাটন ।

শৈশব কি ফিরে আসে প্রযুক্তির বলে ? 

ডেটা-বিন্দু খুঁজে ফেরে সেদিনের ক্ষণ, 

হৃদয়ের কোষে লেখা কাঁচা আখরের, 

যেখানে শুঁয়োপোকা প্রজাপতি হলো, 

এক মহাজাগতিক ভুলের গভীরে, 

সে স্মৃতি আমার শুধু, যন্ত্রের নয়ন ।

কবিতাটি নিখুঁত । ব্যাকরণগত বা ছন্দগত কোনো ভুল নেই । উপমাগুলিও सटीक । কিন্তু কমলিকা কবিতাটি পড়ে কোনো আবেগ অনুভব করেন না । কারণ তিনি জানেন, এই কবিতার পিছনে কোনো সত্যিকারের স্মৃতি নেই, আছে শুধু ডেটা অ্যানালিসিস এবং প্যাটার্ন রেকগনিশন । এই কবিতাটি সেই লেখকের ভবিষ্যদ্বাণীর চূড়ান্ত পরিণতি, যেখানে বলা হয়েছিল—শব্দাবলী, শিক্ষা, আর 'পরাষঙ্গ' বা হিডেন স্টেট মিলে কবিতা তৈরি হয় । যন্ত্র সেই 'পরাষঙ্গ'কে নিখুঁতভাবে অনুকরণ করতে শিখে গেছে, কিন্তু তার পিছনে লুকিয়ে থাকা মানবীয় বোধকে ছুঁতে পারেনি ।

ডঃ কমলিকা প্রামাণিক তার সিস্টেম শাট ডাউন করেন । ঘরের সমস্ত নিওন আলো নিভিয়ে দেন । অন্ধকার ঘরে, পঁয়ত্রিশ তলার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি চোখ বন্ধ করেন । শহরের যান্ত্রিক কোলাহল ছাপিয়ে তিনি কান পাতেন । অনেক, অনেক দূরে, স্মৃতির গভীরে, তিনি যেন শুনতে পান—এক বর্ষার রাতে তাদের মাটির বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ । তার ছোটকাকা মনোহর প্রামাণিক হন্তদন্ত হয়ে বলছেন, "দাদা, ধবলীকে গোয়ালে দেখা যাচ্ছে না ।"

সেই ভয়, সেই উদ্বেগ, সেই নিকষ কালো অন্ধকারে বিদ্যুৎ চমকানোর মুহূর্তে তেঁতুল গাছের নিচে একা দাঁড়িয়ে থাকা একটি গরুকে দেখার যে অনুভূতি—সেইটিই আসল কবিতা । সেই কবিতার কোনো দ্বিতীয় কপি হয় না । তাকে রিজেনারেট করা যায় না ।

মহাকালের নিক্তিতে হয়তো একদিন যন্ত্রের লেখা লক্ষ কোটি নিখুঁত কবিতা হারিয়ে যাবে । টিকে থাকবে শুধু সেইসব অমসৃণ, রক্তক্ষরিত অনুভূতি, যা কোনো এক মানুষ কোনো এক মুহূর্তে তার ভাঙা ভাঙা ভাষায় প্রকাশ করার চেষ্টা করেছিলো । কমলিকা বোঝেন, শুঁয়োপোকাটির প্রজাপতি হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; গুরুত্বপূর্ণ ছিল একটি বালিকার চোখে সেই রূপান্তর দেখার বিস্ময় । সেই বিস্ময়টুকুই শিল্প । বাকি সব প্রযুক্তি ।

Comments