লাল ডায়েরি

লাল ডায়েরি


ব্যর্থতা মানুষকে ব্যথিত করে না। ব্যথিত করে তার নেশা । অতিরিক্ত উদ্যোগ। শতভাগের বেশী দেবার চেষ্টা করা ।শতভাগের দেওয়ার প্রচেষ্টায় ক্রমে ক্রমে ক্ষয়ে যাচ্ছি। আমার এই ক্ষয়টুকু, এই ক্ষরণটুকু বোঝার মতো কোনো দশমিক নেই । আমার কর্মক্ষেত্রের দেওয়ালে ঝোলানো চার্টারে। তারা কেবল সাফল্যের গ্রাফ বোঝে, বোঝে অগ্রগতির ঊর্ধ্বমুখী রেখা। ক্ষয়ের যে একটা নিম্নমুখী জ্যামিতি আছে, তা তাদের সিলেবাসের বাইরে। তথ্যপ্রযুক্তিতে কাজ করি। এখানে প্রতিদিনই অতিরিক্ত কাজ, ডেডলাইন। বিশ্রামের জায়গা নেই। কবিতা লেখার ইচ্ছে থাকে। অফিসের আর একটি ডেডলাইন ও তা পূরণ না করার ব্যর্থতা আমাকে নিংড়ে নেয়।

আমার নামটা এখানে অবান্তর, ধরা যাক আমি অনির্বাণ। অথবা হয়তো কোনো নাম নেই আমার। আমি এই তথ্যপ্রযুক্তির মায়াবী দুর্গের লক্ষ লক্ষ কর্মীদের মধ্যে এক অদৃশ্য সত্তা, এক আই.পি. অ্যাড্রেস। আমার ডেস্ক নম্বর ৭-বি। আমার জানলার বাইরে আকাশ দেখা যায় না, দেখা যায় পাশের বিল্ডিং-এর ধূসর দেওয়াল, যেখানে একটা নিঃসঙ্গ পায়রা মাঝে মাঝে এসে বসে। সেই পায়রাটার দিকে তাকিয়ে আমার মাঝে মাঝে এক অদ্ভুত ঈর্ষা হয়। তার কোনো ডেডলাইন নেই, কোনো ক্লায়েন্ট কল নেই। তার জীবন দুটো সরল বিন্দুতে বাঁধা—খাদ্য আর আকাশ। আমার জীবন বাঁধা পড়ে আছে হাজারো জটিল অ্যালগরিদমে।

ব্যর্থতা জিনিসটা আসলে কী? স্কুলের পরীক্ষায় পাশ নম্বরের থেকে এক কম পাওয়া? ভালোবাসার মানুষটিকে মনের কথা বলতে না পারা? নাকি শেষ ট্রেনটা ধরতে না পেরে প্ল্যাটফর্মে একা দাঁড়িয়ে থাকা? আমার কাছে ব্যর্থতা এসবের চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষ্ম, অনেক বেশি ব্যক্তিগত এক অনুভূতি। আমার কাছে ব্যর্থতা হলো, একটা গোটা কবিতা মাথায় নিয়ে ঘুমোতে যাওয়া আর সকালে উঠে তার একটা শব্দও মনে করতে না পারা। এই ব্যর্থতা আমাকে কষ্ট দেয়, কিন্তু ভাঙে না। কারণ আমি জানি, কবিতাটা হারিয়ে যায়নি। সে আমার আত্মার কোনো এক গোপন কুঠুরিতে ঘুমিয়ে আছে। একদিন হয়তো সে আবার ফিরে আসবে।

কিন্তু যে জিনিসটা আমাকে ভাঙে, গুঁড়িয়ে দেয়, তা হলো ওই একশত শতাংশের বেশি দেওয়ার নিরন্তর প্রচেষ্টা। আমাদের অফিসের মটো হলো ‘গো বিয়ন্ড’। অর্থাৎ, সীমার বাইরে যাও। কিন্তু কেউ বলে দেয় না, সেই সীমার বাইরে ঠিক কতটা যেতে হবে। ১০০ শতাংশ হলো সেই লক্ষ্মণরেখা, যার মধ্যে থাকলে তুমি সুরক্ষিত। তুমি তোমার কাজ করেছ, দায়িত্ব পালন করেছ। কিন্তু যেই মুহূর্তে তুমি ১১০ শতাংশ দেওয়ার জন্য ওই রেখাটা পার হও, তুমি রাবণের অদৃশ্য ফাঁদে পা দাও। এই অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কোনো পুরস্কার নিয়ে আসে না, নিয়ে আসে ক্ষয়। এ হলো সেই পেট্রোল পাম্পের কর্মীর মতো, যে ট্যাঙ্কি ভর্তি হয়ে যাওয়ার পরেও আরও কিছুটা তেল ঢালার জন্য গাড়ির বডিটাকে ঝাঁকাতে থাকে। তাতে লাভ হয় না, শুধু কিছুটা তেল বাইরে ছলকে পড়ে নষ্ট হয়। আমার জীবনটা থেকেও প্রতিদিন অমনই কিছুটা করে ছলকে পড়ে যাচ্ছে।

আমার জগৎটা বাইনারিতে চলে। শূন্য আর এক। হয় ‘কমপ্লিটেড’, নয় ‘পেন্ডিং’। হয় ‘সাকসেস’, নয় ‘এরর’। এখানে ‘প্রায় হয়ে গেছে’-র কোনো জায়গা নেই। এখানে ‘চেষ্টা করেছিলাম’-এর কোনো মূল্য নেই। এই বাইনারি লজিকের বাইরে আমার একটা জগৎ আছে। কবিতার জগৎ। সেখানে কোনো শূন্য বা এক নেই। সেখানে আছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। সেখানে একটা ভাঙা লাইন, একটা অসমাপ্ত স্তবকও ব্যর্থ নয়। তা হলো এক নতুন কবিতার ভ্রূণ। আমার ব্যাকটুব্যাক কল আমার কাছ থেকে এই সম্ভাবনাকে কেড়ে নিতে চায়। সে চায়, আমার আত্মাও যেন বাইনারি হয়ে ওঠে।

এই মুহূর্তে আমি কাজ করছি ‘প্রোজেক্ট ফিনিক্স’ নিয়ে। নামটা বেশ কাব্যিক। ফিনিক্স পাখি যেমন ছাই থেকে জন্মায়, তেমনই এই প্রোজেক্ট নাকি আমাদের কম্পানিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এই ফিনিক্সকে ছাই থেকে তোলার দায়িত্ব পড়েছে আমাদের টিমের উপর। আর আমার উপর দায়িত্ব তার হৃদপিণ্ডটা তৈরি করার, অর্থাৎ মূল কোডিং মডিউলটা লেখার। প্রোজেক্ট ম্যানেজার সান্যাল সাহেব প্রায়ই বলেন, "অনির্বাণ, দিস ইজ আ গেম-চেঞ্জার। উই হ্যাভ টু গিভ আওয়ার টু হান্ড্রেড পার্সেন্ট।" আমি মনে মনে হাসি। দুইশত শতাংশ বলে কি কিছু হয়? মানুষের শরীর, তার মস্তিষ্ক, তার আত্মা—এগুলো তো অসীম নয়। এগুলো ব্যাটারির মতো। তুমি তাকে একশো পার্সেন্ট চার্জ দিতে পারো। তারপরও যদি প্লাগ ইন করে রাখো, ব্যাটারিটা ফুলতে শুরু করবে, তার আয়ু কমতে থাকবে। আমি টের পাই, আমার ভেতরের ব্যাটারিটা ক্রমশ ফুলে উঠছে।

ক্যাফেটারিয়া আছে, চা খাওয়ার সময় নেই। এই কথাটা আক্ষরিক অর্থেই সত্যি। আমাদের অফিসে ‘রিলাক্সেশন জোন’ আছে। সেখানে ক্যারাম বোর্ড আছে, প্লে-স্টেশন আছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে রিল্যাক্স করার মতো মানসিক অবস্থাটাই তো নেই। সেখানে বসেও মাথার মধ্যে কোডের বাগ কিলবিল করতে থাকে। ডেডলাইনটা ঘড়ির কাঁটার মতো টিকটিক করে মাথার ভেতরে। বাড়ি ফিরেও শান্তি নেই। ল্যাপটপটা যেন শরীরেরই এক বর্ধিত অঙ্গ হয়ে গেছে। ডিনার টেবিলে বসেও আমি ক্লায়েন্টের পাঠানো ইমেলের উত্তর দিই। আমার স্ত্রী, রাকা, মাঝে মাঝে বলে, "তোমার কি মনে হয়, তুমি ছাড়া এই কম্পানিটা একদিনও চলবে না?"

আমি জানি, চলবে। খুব ভালোভাবেই চলবে। আমি না থাকলে আমার জায়গায় অন্য কেউ এসে বসবে। ৭-বি ডেস্কটা খালি থাকবে না। কিন্তু এই সহজ সত্যিটা জেনেও আমি নিজেকে থামাতে পারি না। কারণ ওই ‘অতিরিক্ত উদ্যোগ’-এর নেশাটা আমাকে পেয়ে বসেছে। এটা এক ধরনের জুয়া। তুমি জানো তুমি হারবে, কিন্তু তারপরের দানটা খেলার জন্য তুমি মরিয়া হয়ে ওঠো। এই অতিরিক্ত উদ্যোগই হলো আজকের কর্পোরেট জগতের আফিম। সে তোমাকে দায়িত্বের নামে, স্বীকৃতির নামে, ইনসেনটিভের নামে এই নেশায় বুঁদ করে রাখে। আমি জানি আমার ভিতরে, একটা আমি কাজ করে ।

আমার একটা ডায়েরি আছে। লাল রঙের, পেপারিকার তৈরি। রাকা জন্মদিনে দিয়েছিল। তার প্রথম পাতায় রাকা লিখে দিয়েছিল, "তোমার নির্বাসিত শব্দদের জন্য।" সেই ডায়েরিতে আমি কবিতা লিখি। বা বলা ভালো, লেখার চেষ্টা করি। গত তিন বছর ধরে সেই ডায়েরিটা আমার অফিসের ব্যাগে বন্দি। তাকে বের করার সময় পাই না। মাঝে মাঝে রাতে যখন কোডিং করতে করতে চোখ জ্বালা করে, তখন ড্রয়ারটা খুলি। লাল মলাটটার উপর হাত বোলাই। মনে হয়, ওটা শুধু একটা ডায়েরি নয়, ওটা আমার আত্মা। আমি তাকে এই কংক্রিটের জঙ্গলে বন্দি করে রেখেছি।

‘প্রোজেক্ট ফিনিক্স’-এর ডেডলাইন এগিয়ে আসছে। সান্যাল সাহেব প্রায় রোজ মিটিং ডাকেন। হোয়াইট বোর্ডে নানা রকমের চার্ট, গ্রাফ এঁকে বোঝান আমাদের অবস্থান। তার কথার মধ্যে বারবার ফিরে আসে ‘অ্যাজাইল’, ‘স্ক্রাম’, ‘স্প্রিন্ট’—এইসব শব্দ। আমার মনে হয়, এই শব্দগুলো আসলে এক একটা চাবুক। এগুলো দিয়ে তিনি আমাদের মতো ক্লান্ত ঘোড়াদের আরও দ্রুত দৌড়তে বাধ্য করেন। শেষ ‘স্প্রিন্ট’-এর আগের রাতে আমাদের গোটা টিম অফিসে থেকে গেল। পিৎজা আর কফির দৌলতে আমরা জেগে রইলাম। সার্ভারের একটানা গুঞ্জন, কি-বোর্ডের খটখট শব্দ আর সান্যাল সাহেবের চাপা টেনশনের দীর্ঘশ্বাস—এই নিয়ে আমাদের রাতটা কাটল। ভোরের দিকে যখন কোডটা কম্পাইল করে রান করালাম, তখন সেটা কোনো ‘এরর’ দেখাল না। আমাদের ক্লান্ত মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। আমরা ১০০ শতাংশ দিয়ে ফেলেছি।

কিন্তু সান্যাল সাহেব খুশি হলেন না। তিনি বললেন, "অনির্বাণ, কোডটা চলছে ঠিকই, কিন্তু এর অপটিমাইজেশন আরও বেটার হতে পারত। ক্লায়েন্ট ডেমোর আগে আমরা কি আর একটু পুশ করতে পারি?"

‘পুশ’—এই শব্দটা আমার বুকে এসে বিঁধল। আর কতটা পুশ করা যায় একটা মানুষকে? একটা রাবার ব্যান্ডকে তুমি একটা সীমা পর্যন্ত টানতে পারো, তার বেশি টানলে সেটা ছিঁড়ে যাবে। আমি বলতে পারতাম, "সান্যাল সাহেব, এটা সম্ভব নয়।" কিন্তু আমি বললাম, "হ্যাঁ, স্যার। আমি দেখছি।"

এই ‘হ্যাঁ’ বলাটাই ছিল আমার লক্ষ্মণরেখা পার করার মুহূর্ত। আমি আরও ১০ শতাংশ দেওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়লাম। আরও ভালো অ্যালগরিদম, আরও এফিসিয়েন্ট কোড—এইসব ভাবতে ভাবতে আমার বাইরের জগৎটা লুপ্ত হয়ে গেল। আমি দু-দিন প্রায় না ঘুমিয়ে, শুধু কফি আর স্যান্ডউইচের উপর বেঁচে থেকে কোডটাকে নতুন করে লিখলাম। আমার সহকর্মীরা অবাক হয়ে দেখছিল। কেউ কেউ বলছিল, "অনির্বাণদা, ছেড়ে দিন। যা হয়েছে, ভালোই হয়েছে।" আমি শুনিনি। আমার মাথায় তখন ওই অতিরিক্ত উদ্যোগের ভূত চেপেছে।

ক্লায়েন্ট ডেমোর দিন সকালে আমি যখন ফাইনাল ভার্সনটা সাবমিট করলাম, তখন আমার শরীর আর চলছে না। চোখ দুটো জ্বলছে, মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে। মনে হচ্ছে, আমার সত্তার সমস্ত রস কেউ নিংড়ে শুষে নিয়েছে। আমি শুধু একটা জীবন্ত কঙ্কাল, যে অভ্যাসের বশে কি-বোর্ডে আঙুল চালাচ্ছে।

ডেমো শুরু হলো। আমেরিকার ক্লায়েন্টরা ভিডিও কনফারেন্সে। সান্যাল সাহেব প্রোজেক্টের ভূমিকা ব্যাখ্যা করছেন। আমার হৃদপিণ্ডটা ধকধক করছে। তারপর তিনি আমার তৈরি করা মডিউলটা রান করানোর জন্য ক্লিক করলেন।

স্ক্রিনটা কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইল। তারপর... তারপর গোটা বড় বড় অক্ষরে মেসেজ এলো 'এপলিকেশন এরর, সিস্টেম এডমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করুন'। একটা স্ক্রিনে কিছু দুর্বোধ্য স্ট্যাকট্রেস ফুটে উঠল, যাকে আমরা বলি ‘আনহ্যান্ডলড এরর’।

আমার পৃথিবীটা যেন দুলে উঠল। এটা কীভাবে সম্ভব? আমি তো সবরকম টেস্ট করে দেখেছি। আমার দু-দিনের অক্লান্ত পরিশ্রম, আমার ওই অতিরিক্ত দশ শতাংশ—সবকিছু এক মুহূর্তে শূন্য হয়ে গেল। আমি ব্যর্থ।

মিটিং রুমে তখন পিন-ড্রপ সাইলেন্স । ক্লায়েন্টদের মুখের অভিব্যক্তি বোঝা যাচ্ছে না। সান্যাল সাহেবের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। আমি চেয়ারে বসে আছি পাথরের মতো। আমার উঠে দাঁড়িয়ে কিছু একটা বলার কথা, ব্যাখ্যা করার কথা, ক্ষমা চাওয়ার কথা। কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোচ্ছে না।

আমি ব্যর্থ। এই ব্যর্থতাটা আমার গায়ে লাগার কথা ছিল। আমার ভেঙে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু আশ্চর্য, আমার কিছুই হচ্ছে না। আমার মনটা একদম ফাঁকা। যেন এক প্রবল ঝড়ের পর শান্ত হয়ে যাওয়া সমুদ্র। কোনো ঢেউ নেই, কোনো আলোড়ন নেই।

ব্যর্থতাটা আমাকে ততটা আঘাত করল না। কারণ আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, তার থেকেও বেশি করেছি। তাহলে আঘাতটা কোথায়?

আঘাতটা এলো কিছুক্ষণ পর। ক্লায়েন্টরা খুব পেশাদারিত্বের সঙ্গে জানাল, "ইটস ওকে। টেকনিক্যাল গ্লিচেস ক্যান হ্যাপেন। লেটস রি-শিডিউল ইট।" সান্যাল সাহেব মিটিং শেষ করে আমার কাঁধে হাত রাখলেন। আমি ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো চিৎকার করবেন, বা অন্তত হতাশ হবেন। কিন্তু তিনি খুব শান্ত গলায় বললেন, "চিল অনির্বাণ। একটা ছোটো বাগ কোথাও রয়ে গেছে হয়তো। আমরা পরের স্প্রিন্টে ঠিক করে নেব। ডোন্ট টেক ইট টু হার্ট।"

এই কথাটাই আমাকে চুরমার করে দিল। আমার ওই দু-দিনের বিনিদ্র রাত, আমার ওই আত্মক্ষয়ী প্রচেষ্টা, আমার ওই ১১০ শতাংশ—এই সবকিছুর দাম শুধু এইটুকু? "ডোন্ট টেক ইট টু হার্ট"? এই ব্যর্থতাটা যদি একটা বিরাট ঘটনা হতো, যদি এর জন্য কম্পানির বিপুল ক্ষতি হতো, যদি আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হতো, তাহলেও হয়তো আমি এতখানি আহত হতাম না। কিন্তু এই নৈমিত্তিকতা, এই ক্যাজুয়াল মনোভাব—এটাই আমাকে বুঝিয়ে দিল যে আমার ওই অতিরিক্ত উদ্যোগের কোনো মূল্যই নেই এই সিস্টেমে। আমি যে নিজেকে নিংড়ে দিলাম, সেই রসটুকু নর্দমায় ফেলে দেওয়ার মতোই তুচ্ছ এদের কাছে। পরের স্প্রিন্টে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আমার যে ক্ষয়টা হয়ে গেল, তা কি কোনোদিন ঠিক হবে? ব্যর্থতা আমাকে ব্যথিত করেনি। ব্যথিত করেছে আমার উদ্যোগের এই চরম অপমান।

সেদিন বাড়ি ফিরে আমি স্নান করে, খেয়েদেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। রাকা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা আন্দাজ করেছিল, তাই কোনো প্রশ্ন করল না। আমার ঘুম আসছিল না। মাথার ভেতরটা একদম ফাঁকা। কোনো কোড নেই, কোনো বাগ নেই, কোনো ডেডলাইন নেই।

অনেক রাতে আমি উঠলাম। ড্রয়ার থেকে আমার লাল ডায়েরিটা বের করলাম। আজ আমার কবিতা লিখতে ইচ্ছে করছে। আমার এই শূন্যতার কথা, আমার এই ক্ষয়ের কথা, আমার এই অপমানের কথা—সব আমি শব্দে ধরতে চাই। আমি পাতা ওল্টালাম। একটা নতুন পাতা বের করলাম। কলমটা হাতে নিলাম।

তারপর... তারপর আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে রইলাম। একটাও শব্দ আমার মাথায় এলো না।

আমার চোখের সামনে শুধু ওই নীল স্ক্রিনটা ভাসছে। আনহ্যান্ডলড এরর । আমার কানে শুধু বাজছে সান্যাল সাহেবের ওই শান্ত গলা, "চিল অনির্বাণ।" আমার সমস্ত অনুভূতি, সমস্ত আবেগ যেন ওই ক্র্যাশ করা সিস্টেমটার সঙ্গে সঙ্গেই হারিয়ে গেছে। আমার আত্মার যে জমিনে কবিতার ফসল ফলত, সেই জমিন আজ অতিরিক্ত চাষের ফলে অনুর্বর হয়ে গেছে। সেখানে আর কিচ্ছু ফলবে না।

আমি কলমটা নামিয়ে রাখলাম। ডায়েরিটা বন্ধ করলাম। আমি বুঝতে পারলাম, আমার আসল ব্যর্থতা ‘প্রোজেক্ট ফিনিক্স’-এর ক্র্যাশ করা নয়। আমার আসল ব্যর্থতা এই মুহূর্তটা। এই যে আমি একটা লাইনও লিখতে পারছি না, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ‘আনহ্যান্ডলড এরর’।

অতিরিক্ত উদ্যোগ আমাকে সফল করতে পারেনি, কিন্তু সে সফলভাবে আমার ভেতরের কবিটাকে হত্যা করেছে। আমি এই কংক্রিটের জঙ্গলে টিকে থাকার জন্য নিজের আত্মাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করেছিলাম। আজ টোপটা শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু শিকার ধরা পড়েনি। আমি এখন এক ব্যর্থ শিকারি, যার ঝুলিতে কোনো শিকার নেই, আর হাতে কোনো টোপও অবশিষ্ট নেই। আমি শুধু ক্ষয়ে গেছি, একটু একটু করে, একশো শতাংশের বাইরের ওই অতিরিক্ত দশ শতাংশের অলীক মরীচিকার পিছনে ছুটতে ছুটতে।

Comments