জঙ্গল

 

জঙ্গল

এত বিন্যাস ও ব্যাকরণের বেড়াজাল পেরিয়ে শেষমেশ শব্দ, শব্দের আওয়াজে বেজে ওঠে। কাল, সন্ধি, বিভক্তি সহ, দক্ষিণ, উত্তর, উপরিপর আঞ্চলিকতায় সমস্তই তার চুরচুর করে ফেটে যায়। যদিও উল্লসিত ধ্বনিসমূহ, প্রগলভতা, মেহফিলে সেজে ওঠা ছন্দসমেত সেও মিশে যায় শব্দের স্বচ্ছতায়। যে ভাবে ঝোপের নিশ্চুপে ঝাঁটী বাবলার ছায়ায় লজ্জায় ফুটে ওঠে বাংলার ভাঁটফুল। তার লাবণ্য নিয়ে সংশয় ছিলোনা স্বয়ং স্বর্গরাজ্য ইন্দ্রের। যেহেতু তাকে ফুল নামে ফুটে উঠতে হয়, তাকে মানুষ হয়ে উঠতে হয়, বিয়ে, শাদি, শ্রাদ্ধ ও ভ্যালেন্টাইনে তাকে হয়ে উঠতে উপমা ও অলংকার, প্রতীত হয় মনুষ্য দুনিয়ার ব্যাকরণে সে মিস ফিট, জংলা, আদিম ও গেঁয়ো। নিয়মে কানুনে তাকে বারবার ঘিরে ফেলা হয় তুলনায়, পরিমাপে এবং লজ্জায়। বরং অরণ্য, এমন একটি জায়গা, ভাঁটফুল সেখানে নিরাপদ মেহসুস করে। এই সীমানায় কখন যে হেমন্ত আসে, কখন যে কোকিল ডেকে যায়, তা নিয়ে পোস্ট, গ্রুপ, ব্লগ বা লিটল ম্যাগাজিন নেই। কোন তর্ক ওঠে না। এই বোধ ও মগ্নতার সীমানা পারে কখন যে নিসর্গ ফুটে ওঠে, তা দেখতে স্বয়ং জ্যোৎস্না থমকে দাঁড়ায়। নাম না জানা - সেই গুল্ম, অথবা বীরুত এভাবেই থমকে দাঁড়িয়েছিলো অবধের মালঞ্চ লতা, পালামৌএর বন-ধুতরা। তাকে জংলী বলে অভিধান বারবার সংজ্ঞায় বাঁধতে চেয়েছে। ব্যাকরণে বাঁধতে চেয়েছে তাঁর বন্য চলন।

ভাষার জন্ম হয় অরণ্যের মতোই স্বতঃস্ফূর্ততায়, এক আদিম প্রয়োজনে। তারপর আসে ব্যাকরণের কারবারিরা, আসে অভিধানের সংকলকেরা। তারা ভাষাকে নিয়ম-শৃঙ্খলায় বাঁধতে চায়, শব্দের গায়ে পরিয়ে দেয় অর্থের নির্দিষ্ট পোশাক। তারা তৈরি করে সন্ধি, সমাস, কারক, বিভক্তির বেড়া। কিন্তু শব্দের আত্মা জঙ্গলেরই মতো। সে এই বেড়াজালকে মানে না। সুযোগ পেলেই সে আঞ্চলিকতার টানে, কথ্য ভাষার স্রোতে ভেসে গিয়ে সমস্ত নিয়ম ভেঙে চুরমার করে দেয়। মেহফিলে গজলের সুশৃঙ্খল ছন্দের পাশে বসেই সে মিশে যেতে পারে হাটে-বাজারে বলা গ্রাম্য কোনও প্রবাদে। তার এই বুনো শক্তিকেই ভয় পায় সভ্যতার ব্যাকরণ।

এই ব্যাকরণের দুনিয়ায় ‘ভাঁটফুল’ এক চিরকালীন বহিরাগত। তার সৌন্দর্য অনিন্দ্য, তার শুভ্রতায় এক স্বর্গীয় লাবণ্য। কিন্তু সে অভিজাত বাগানের জন্য নয়। সে ফুটে ওঠে আপন খেয়ালে, রেললাইনের ধারে, পরিত্যক্ত ভিটের কোণে, ঝাঁটি-বাবলার কঠোর আশ্রয়ে। সে গোলাপের মতো প্রেম নিবেদনের ব্যাকরণে নেই, রজনীগন্ধার মতো শোক জানানোর উপমায় নেই, অর্কিডের মতো কর্পোরেট আভিজাত্যের অলংকারে নেই। মনুষ্য-নির্মিত উপযোগিতার জগতে তার কোনো স্থান নেই। তাই অভিধান তাকে ‘জংলী’, ‘গেঁয়ো’ বলে একপাশে সরিয়ে রাখে। তার তুলনা টানা হয় কুলীন ফুলের সাথে, তার পরিমাপ করা হয় বাজারদর দিয়ে, এবং এই সমস্ত তুলনায় সে ‘ব্যর্থ’ প্রতিপন্ন হওয়ায় তার গায়ে লেপে দেওয়া হয় লজ্জার ছাপ।

কিন্তু অরণ্যের কাছে সে সম্মানিত। জঙ্গল তাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দেয়। এখানে তার সৌন্দর্যকে বিচার করার জন্য কোনো মাপকাঠি নেই। এখানে সে শুধুই এক অস্তিত্ব, প্রকৃতির এক নিখুঁত প্রকাশ। এই জঙ্গলে হেমন্ত আসে নিঃশব্দে, শিউলির গন্ধ মেখে। কোকিল ডেকে যায় তার প্রাণের আনন্দে, ক্যালেন্ডারের পাতা দেখে নয়। এই নিয়ে কোনো ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হয় না, কোনো ব্লগে তর্ক-বিতর্কের ঝড় ওঠে না। এখানে প্রকৃতি এক গভীর মগ্নতায় বিরাজমান। সেই মগ্নতার রূপ দেখতে পূর্ণিমার চাঁদও যেন থমকে যায়। সে অবাক হয়ে দেখে, কীভাবে অবধের মালঞ্চ লতা বা পালামৌ-এর বন-ধুতুরা কোনো পরিচয়ের তোয়াক্কা না করে, কোনো সংজ্ঞার অপেক্ষা না করে ফুটে উঠছে। ব্যাকরণ তাদের ‘বন্য’ বলে দাগিয়ে দিতে চায়, তাদের চলনকে নিয়মের নিগড়ে বাঁধতে চায়। কিন্তু তারা সেই সমস্ত প্রচেষ্টাকে উপেক্ষা করে নিজেদের অস্তিত্বকে উদযাপন করে চলে।

হে, মনুষ্য, বন্য কি? কে দিতে পারে এর উত্তর। আমি, সেই ছাত্রটিকে কোথাও দেখছিনা যে একবার প্রশ্ন করবে জঙ্গলের অর্থ কি? কাকে ঠিক জঙ্গল বলা যায়। হে, হোমো সেপিয়েন্স আপনি বলতে পারেন? হে প্রাণীশ্রেষ্ট, বলুন তো জঙ্গল মানে কি?

সভ্যতার ক্লাসরুমে বসে আমরা সবাই সুবোধ ছাত্র। শিক্ষক যা বলেন, আমরা তাই শুনি, তাই শিখি। কিন্তু সেই ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসা ছাত্রটি কোথায়, যে উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করবে, "স্যার, যা শেখাচ্ছেন, তার বাইরেও কি কিছু আছে? আপনি বলছেন ‘বন্য’, কিন্তু এই ‘বন্যতা’র সংজ্ঞা কে ঠিক করে দিয়েছে?" আমি সেই ছাত্রটিকে খুঁজছি। আমি আপনাদের প্রত্যেককে, এই হোমো সেপিয়েন্স প্রজাতিকে, এই প্রাণীশ্রেষ্ঠ জীবকে জিজ্ঞাসা করতে চাই—বলুন, জঙ্গল মানে কী? আপনাদের জ্ঞান, আপনাদের বিজ্ঞান, আপনাদের দর্শন দিয়ে আমাকে বোঝান, কাকে বলে জঙ্গল? যে সংজ্ঞার মধ্যে লুকিয়ে থাকবে না আপনাদের ভয়, আপনাদের শ্রেষ্ঠত্বের অভিমান, বা আপনাদের উপযোগিতার হিসেব।

"আজ্ঞে, জঙ্গল হলো সেই জায়গা যেখানে বাঘ থাকে"। বললেন সে আচার্য। এবং বাঘ নিজেই একজন জঙ্গলের সদস্য, এই ইকো-সিস্টেমে, তার অন্য কোন রোল নেই। সে বরং একজন আম-জনতা। তার খিদে পায়, যৌনতা আছে। নাক, মুখ, দাঁত, থাবা, নখ, ঠ্যাং এবং লিঙ্গ ভেদে নুনুর আকার ভেদ আছে। এমতাবস্থায়, যেন সেই একমাত্র বলতে পারে, আমি আছি। বাকি সবাই সন্ত্রস্ত। অথচ, নিজস্ব এই অস্তিত্বের প্রয়োজনে তাকে শিকার করে খেতে হয়। এবং ডেফিনিটলি, সে একজন সমাজসেবক নন। একজন হরিণের প্রাণ বকসে দিলে, তাঁর আহার জোটে না। এহেন পরিসরে, একজন বাঘ যদি একটা একটি খরগোশ শিকার করে কামড়ে কামড়ে তাঁর মাংস ছিঁড়ে খান। মানুষ বলে ওঠে জঙ্গলরাজ। সে জঙ্গলের সংজ্ঞায় কতিপয় বাঘ ভাল্লুক বা হায়নারা বার বার হানা দেয়।

প্রথম উত্তরটি আসে জ্ঞানবৃদ্ধ আচার্যের কাছ থেকে। তাঁর সংজ্ঞাটি ভয়-মিশ্রিত শ্রদ্ধার। তাঁর কাছে জঙ্গল আর বাঘ সমার্থক। এই সংজ্ঞাটি মানুষের এক আদিম মনোবৃত্তির প্রতিফলন। যা কিছুকে সে ভয় পায়, যা কিছু তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তাকেই সে সমগ্রের প্রতীক হিসেবে ধরে নেয়। কিন্তু বাঘ? সে তো জঙ্গলের স্বঘোষিত রাজা নয়। সে এই বাস্তুতন্ত্রের লক্ষ লক্ষ সদস্যের মধ্যে একজন মাত্র। সে একজন সাধারণ নাগরিক, ‘আম-জনতা’। তারও খিদে পায়, তারও যৌনতার তাগিদ আছে। তার শারীরিক গঠন তাকে শিকার করতে সাহায্য করে, এটুকুই তার বিশেষত্ব। কিন্তু এই বিশেষত্বের কারণেই সে যেন এক মূর্তিমান অস্তিত্বের ঘোষণা। তার গর্জনে, তার পদচারণায় ধ্বনিত হয়—‘আমি আছি’। তার এই প্রবল উপস্থিতি বাকিদের সন্ত্রস্ত করে রাখে।

কিন্তু তার এই শিকার করা, এই সন্ত্রাস সৃষ্টি করা—এসবের পিছনে কোনো দর্শন নেই, কোনো আধিপত্যবাদের তত্ত্ব নেই। আছে শুধু খিদে মেটানোর এক জৈবিক প্রয়োজন। সে কোনো সমাজসেবী নয় যে হরিণের প্রতি মায়া দেখিয়ে না খেয়ে থাকবে। তার বেঁচে থাকার জন্যই হরিণকে মরতে হয়। এটা প্রকৃতির সরল এক সমীকরণ। কিন্তু মানুষ যখন দেখে, একটি শক্তিশালী প্রাণী একটি দুর্বল প্রাণীকে হত্যা করছে, তখন সে আঁতকে ওঠে। সে একে বলে ‘জঙ্গলরাজ’, অর্থাৎ অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা। তার নিজের সভ্যতায় যে আরও সূক্ষ্ম, আরও জটিল উপায়ে শক্তিশালীরা দুর্বলদের শোষণ করে চলেছে, সেই সত্যিটা সে দেখতে পায় না। তার কাছে জঙ্গলের সংজ্ঞা হয়ে দাঁড়ায় কিছু ভয়ঙ্কর хищ্র প্রাণীর সমষ্টি, যারা কেবল হত্যা আর ধ্বংস করে।

হে আচার্য, জঙ্গল কি তবে একটা ইকোসিস্টেম? এখানে বৃক্ষের কোন ভূমিকা নাই? হে, বিভূতিভূষণ আপনি বলতে পারেন অরণ্য কি? হে উইকিপিডিয়া আপনি দিতে পারেন জঙ্গলের সংজ্ঞা?

কিন্তু আচার্য, আপনার সংজ্ঞায় শাল, পিয়াল, মহুয়ার কথা কোথায়? সেই কোটি কোটি বৃক্ষ, যারা নীরবে আকাশকে স্পর্শ করার স্বপ্ন দেখে, তাদের কি কোনো ভূমিকা নেই? যে ছত্রাক মৃতকে decompose করে নতুন প্রাণের সম্ভাবনা তৈরি করে, সে কি জঙ্গলের অংশ নয়? জঙ্গল কি তবে শুধু এক ভয়াল নাটকের মঞ্চ? নাকি এটি এক জটিল, পরস্পর-নির্ভর বাস্তুতন্ত্র?

আমার তখন মনে পড়ে বিভূতিভূষণের কথা। তাঁর ‘আরণ্যক’-এর কথা। তিনি কি বলতে পারবেন, অরণ্য কী? তাঁর কাছে অরণ্য তো শুধু গাছপালা বা বন্যপ্রাণীর সমষ্টি ছিল না। তাঁর কাছে অরণ্য ছিল এক সত্তা, এক জীবন্ত চরিত্র, যার নিজস্ব মেজাজ আছে, নিজস্ব আত্মা আছে। তাঁর কাছে অরণ্য ছিল মহাকালের প্রতিচ্ছবি, যেখানে মানুষের ক্ষুদ্র অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়।

আর আজকের যুগের সর্বজ্ঞানী উইকিপিডিয়া? সে কী বলবে? সে হয়তো বলবে, "Jungle is a land covered with dense forest and tangled vegetation, typically in a tropical climate." এই সংজ্ঞাটি তথ্যগতভাবে সঠিক, কিন্তু আত্মাহীন। এতে জঙ্গলের রহস্য নেই, তার গভীরতা নেই, তার দর্শন নেই।

"আজ্ঞে, জঙ্গল হলো সেই জায়গা যেখান থেকে কাঠুরী কাঠ সংগ্রহ করেন, মৌয়াল সংগ্রহ করেন মধু"। ব্লগার লিখলেন, "যেখানে পর্যটক ঘুরতে যান, উড়ে যাওয়া প্রজাপতির ছবি তোলেন। ঈষৎ উচ্চ থেকে ঝুলে পড়া বেগুনী আঙ্গুর গুচ্ছ দেখে শৃগাল চেঁচিয়ে ওঠেন, আঙ্গুর ফল টক"।

এরপর আসে উপযোগিতাবাদী মানুষেরা। তাদের কাছে জঙ্গল হলো এক অফুরন্ত ভান্ডার। কাঠুরের কাছে সে জ্বালানির উৎস, মৌয়ালের কাছে সে মধুর খনি, ওষুধ কোম্পানির কাছে সে ভেষজ উদ্ভিদের গবেষণাগার। তাদের কাছে জঙ্গলের মূল্য নির্ধারিত হয় তার অর্থনৈতিক উপযোগিতা দিয়ে।

আর আধুনিক ব্লগার বা পর্যটক? তাদের কাছে জঙ্গল হলো এক সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ, এক নান্দনিক অভিজ্ঞতা। তারা প্রজাপতির ছবি তোলে, ঝর্ণার পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলে, রিসোর্টের ব্যালকনিতে বসে সূর্যাস্ত দেখে। তারা জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করে না, তারা তারผิวকে স্পর্শ করে মাত্র। তাদের অভিজ্ঞতা অনেকটা ঈশপের গল্পের সেই শেয়ালের মতো। তারা জঙ্গলের সৌন্দর্যকে ভোগ করতে চায়, কিন্তু যখনই তার নাগাল পায় না বা তার জটিলতাকে বুঝতে পারে না, তখনই তাকে ‘টক’ বা ‘মূল্যহীন’ বলে রায় দিয়ে চলে আসে। তাদের ইনস্টাগ্রাম পোস্টে জঙ্গল হয়ে ওঠে এক মনোরম, sanitized, বিপদমুক্ত প্যাকেজ।

এ এক আশ্চর্য ব্যাকরণ, যারা শিখেছে, মুখস্থ করেছে, তাদের কাছে জঙ্গল খানিকটা জলের মতো। তারা বুঝে গেছে তৃণমূলের ব্যাবহার, শিখে গেছে বাবলার কাঁটা থেকে কিভাবে নিজেদের গা বাঁচাতে হয়। রোদ, খরা, মহামারীতে বারো মাসে তাদের একটি দুর্গাপূজা ঘুরে আসে। তাদের কাছে গেন্দাফুল হলুদ হয়ে ফোটে, পলাশ লাল হয়, ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া উড়ে যায় সবুজাভ অক্ষর বিন্যাসে।

তবে কিছু মানুষ আছে, যারা জঙ্গলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বাস করে। তারা জঙ্গলের ভাষা বোঝে। তারা জানে কোন পাতার রস সাপের বিষ নামাতে পারে, কোন গাছের ছাল জ্বরের ওষুধ। তারা বাবলার কাঁটা এড়িয়ে চলতে শিখেছে, খরা বা মহামারীর সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে শিখেছে। তাদের কাছে জঙ্গল কোনো ভয়াল জায়গা বা ভোগের বস্তু নয়, তাদের কাছে জঙ্গল হলো জীবন। তাদের জীবনে ঋতুচক্র আসে প্রকৃতির নিয়মে, তাদের বারো মাসে তেরো পার্বণ সেই প্রকৃতিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। তাদের কাছে পলাশের লাল রঙ শুধু সৌন্দর্য নয়, তা বসন্তের আগমন বার্তা। তাদের কাছে টিয়ার ঝাঁকের উড়ে যাওয়া শুধু এক মনোরম দৃশ্য নয়, তা হয়তো আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস। তারা জঙ্গলের এক আশ্চর্য ব্যাকরণ আয়ত্ত করেছে, যা বই পড়ে শেখা যায় না।

এভাবেই, এতোটা বেলা গেলো। তার দৈর্ঘ্য প্রস্থ বিস্তার আন্দাজ করে। আমি ভাবি, এই ভাবে বিবর্ণ হয়ে গেছে লাল-পাহাড়ি, পাথর হয়ে গেছে রাঙ্গামাটির গাঁ। বেলা বেড়ে যায়। তার রং ও পরিণামে আমি যে অনিশ্চয়তা দেখি, দেখি ফেলে আসা আয়তনে বেড়ে উঠেছে আমার জন্মভূমি। তার ভৌগলিকে নিজেকে মিসফিট দেখি। এই দূর দিল্লিতে তার জন্মগন্ধ খুঁজি আর দেখি লুপ্তপ্রায় তার নিজস্ব শিকড়। জল ছাড়া, যত্নছাড়া বেড়ে ওঠা ভেরেণ্ডা গাছকে দেখি। দেখি - পাতা মেলে সে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে, প্রতিযোগিতায় বেড়ে ওঠা মনুষ্যনির্মিত বহুতল আবাসনের দিকে। খাদ্য, খাদক, লেখা, লেখক, বই, প্রকাশক, বইমেলা চত্বর সমস্তই তো প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায়, এই ভাবে আত্মসমর্পণ করার আগে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে একবার গভীর শ্বাস নিয়ে ভেবে দেখি। আছি? কংক্রিট আর পাকা ইটের ব্যাকরণে এই মহানগর নিজেই কি একটা জঙ্গল নয়?

এইসব ভাবতে ভাবতে জীবন অনেকটা পথ পেরিয়ে আসে। আমি আমার ফেলে আসা জন্মভূমির দিকে তাকাই। সেই লালমাটির রাস্তা, সেই শাল-পিয়ালের বন—সবই আজ বিবর্ণ। রাঙামাটির গ্রামগুলো উন্নয়নের চাপে পাথর হয়ে গেছে। আমার জন্মভূমি আয়তনে হয়তো বাড়েনি, কিন্তু তার চরিত্র বদলে গেছে। সেই পরিবর্তিত ভূগোলে আমি নিজেকে আর খাপ খাওয়াতে পারি না। আমি সেই ভাঁটফুলের মতোই ‘মিসফিট’।

এই দিল্লির কংক্রিটের অরণ্যে বসে আমি আমার মাটির গন্ধ খুঁজি। আমি আমার শিকড়কে অনুভব করার চেষ্টা করি, যা আজ লুপ্তপ্রায়। এখানে আমি দেখি একলা ভেরেণ্ডা গাছকে, যে কোনো যত্ন ছাড়াই, সিমেন্টের ফাটল চিরে বেড়ে উঠছে। তার এই অদম্য প্রাণশক্তি আমাকে অবাক করে। সে যেন এই প্রতিযোগিতামূলক শহরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করছে—তোমাদের এই ইঁদুর দৌড়ের শেষ কোথায়?

এখানেও তো এক জঙ্গল। এখানে খাদ্য (চাকরি) আর খাদকের (কর্মপ্রার্থী) লড়াই চলে। লেখক আর প্রকাশকের মধ্যে চলে টিকে থাকার লড়াই। বইমেলা চত্বর হয়ে ওঠে এক রণক্ষেত্র, যেখানে সবাই নিজের অস্তিত্বকে জাহির করতে চায়। এই মহানগরীও এক জঙ্গল, তবে এর নিয়মকানুন আরও জটিল, আরও নিষ্ঠুর। এখানে বাঘের থাবার চেয়েও ভয়ঙ্কর সহকর্মীর ষড়যন্ত্র। এখানে বুনো শুয়োরের আক্রমণের চেয়েও মারাত্মক বাড়িওয়ালার নোটিশ। এই কংক্রিটের জঙ্গলে আত্মসমর্পণ করার আগে আমি একবার নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করতে চাই। গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করি—আমি কি সত্যিই বেঁচে আছি?

হুম!

আছি। ইহজঙ্গলেই আছি। নিশ্চুপে, স্তূপে, ভূগোলে। ইতিহাস ক্লিশে হয়ে গেছে। অনন্ত অরণ্যের কাছে একটা ট্যাগ হয়ে, হ্যাস হয়ে, হাইপার টেক্সট হয়ে। থেকে যাবো অপরিচিত অক্ষর ধারায়, অলক্ষ্যে ও অন্তরালে। এখনো চাঁদ ডুবে গেলে, তাঁর প্রধান আঁধারে ফিরে আসে বৈশাখী। দশমিক শেষে রিপিটেড সংখ্যার অবস্থানে ফিরে আসে শূন্য। হোয়াট ব্লসোমড, দ্যাট রিমেনস। শূন্য ও রয়ে যায়। পুষ্পশ্রেনীর দৃশ্য আর শূন্যের কোলাজ আমাকে অবাক করে। সে রঙে প্রকট হয়। সহস্র হরিয়ালী ও পল্লবরাজীর বিন্যাসেও সে তার নিজস্ব রূপ ও গন্ধে হয়ে ওঠে ফুল। ফুলকে ফুটে উঠতেই হয়। এত জঙ্গল চারিধারে, তার অজস্রতায়, এত সহস্র ফুলের ভিতরে এতটা-কাল তাইতো আমি, আমি হয়ে ফুটে উঠতে চেয়েছি নিজস্ব পাপড়ি ও পুংকেশরে।

উত্তরটা ভেতর থেকেই আসে। হ্যাঁ, আমি আছি। এই জঙ্গলেই আছি। হয়তো নিশ্চুপে, হয়তো ভিড়ের স্তূপে হারিয়ে গিয়ে, কিন্তু এই ভূগোলের মধ্যেই আমি আছি। আমার ব্যক্তিগত ইতিহাস, আমার সাফল্য-ব্যর্থতার কাহিনী—এই অনন্ত অরণ্যের কাছে তা অর্থহীন, ক্লিশে। আজকের ডিজিটাল যুগে ইতিহাস হয়ে গেছে একটা হ্যাশট্যাগ, একটা হাইপারলিঙ্ক। আমিও হয়তো এই বিশাল তথ্য-জঙ্গলে এক অপরিচিত অক্ষর হয়ে থেকে যাবো, অলক্ষ্যে, অন্তরালে।

কিন্তু তাতে কী? চাঁদ ডুবে গেলে যেমন করে অন্ধকার ফিরে আসে, বৈশাখী ঝড় যেমন করে তার আদিম শক্তি নিয়ে ফিরে আসে, আমিও তেমনি ফিরে আসি আমার মূল সত্তায়। গণিতের দশমিকের পর যেমন করে সংখ্যা পুনরাবৃত্ত হতে হতে শূন্যে পৌঁছায়, আমিও তেমনি সমস্ত পরিচয়, সমস্ত ট্যাগ মুছে ফেলে আমার ভেতরের শূন্যতায় ফিরে আসি।

আর সেই শূন্যতা থেকেই সৃষ্টির জন্ম হয়। যা কিছু একবার ফুটেছে, তার অস্তিত্বকে মুছে ফেলা যায় না। "What blossomed, that remains." ফুল ঝরে যায়, কিন্তু তার ফুটে ওঠার স্মৃতি রয়ে যায়। শূন্যের প্রেক্ষাপটেই ফুলের রঙ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। চারিদিকে এত জঙ্গল, এত অজস্র গাছপালা, এত সহস্র ফুল। এই বিপুলতার মধ্যে হারিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার মধ্যেও আমি, ওই ভাঁটফুলের মতোই, নিজের মতো করে ফুটে উঠতে চেয়েছি। আমি চেয়েছি আমার নিজস্ব পাপড়ি, আমার নিজস্ব গন্ধ দিয়ে পরিচিত হতে। আমি অন্যের ব্যাকরণে বাঁধা পড়তে চাইনি। আমি চেয়েছি আমার নিজের জঙ্গল তৈরি করতে, যেখানে আমিই নিয়ম, আমিই ব্যাকরণ। এই ফুটে ওঠার আকাঙ্ক্ষা, এই নিজস্ব অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠা করার লড়াই—এটাই হয়তো জঙ্গলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। এই লড়াইয়ে টিকে থাকাই জীবন।  ফুলকে ফুটে উঠতেই হয় । এত জঙ্গল চারিধারে, তার অজস্রতায়, এত সহস্র ফুলের ভিতরে এতটা-কাল তাইতো আমি, আমি হয়ে ফুটে উঠতে চেয়েছি নিজস্ব পাপড়ি ও পুংকেশরে ।


Comments