ফুলের অধিকার
মালিকানা আর পাওনার
যাবতীয় খেরোখাতা উড়িয়ে দিয়ে অধিকার যখন এক বুনো ছন্দে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করে,
তখন রাষ্ট্র বা সমাজ নয়—জেগে ওঠে কেবল এক তৃষ্ণার্ত ভূগোল।সে হয়ে
ওঠে এক আদিম আস্ফালন। আমরা যাকে ‘হক’ বলি, অরণ্যের গভীরে তার
কোনো সন্ধি বা বিভক্তি নেই। সেখানে অধিকার মানে সূর্যের এক ফালি আলো, এক আজলা বৃষ্টির জল। কিন্তু এই আলোর কারবারিরা যখন ডালপালা ছড়িয়ে অন্যকে
আড়াল করে দেয়, তখনই শুরু হয় অধিকারের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন
জঙ্গল।
প্রশ্নটা কোনো
আচার্যকে নয়, প্রশ্নটা সেই মগ্ন নিসর্গের
কাছে—অধিকার আসলে দেবে কে? এই যে আদিম বনস্পতি, এই যে বীরুত বা গুল্মের দল, এরা কার কাছে হাত পাতে?
অরণ্য কি কোনো আলাদা দাতা? সে তো আসলে এই কোটি
কোটি শিকড় আর ঝরাপাতার এক সম্মিলিত অস্তিত্ব। অর্থাৎ, সেই
ভাঁটফুলটিই অরণ্য, আবার সেই বাবলার কাঁটাটিও অরণ্য। সে নিজেই
নিজের মালিক, আবার নিজেই নিজের ভিখারি। সে নিজের পাপড়ি মেলার
অধিকার দাবি করে সেই মাটির কাছেই, যাকে সে নিজে ধরে রেখেছে।
অথচ এই মনুষ্য
দুনিয়ার ব্যাকরণে, আমরা সবাই শুধু ডালপালা
বিস্তার করতে শিখেছি। আমরা চাই আকাশটাকে মুঠোয় নিতে, আমরা
চাই মাটির সমস্ত রস শুষে নিয়ে ‘কুলীন’ হয়ে উঠতে। একেই কি আমরা অধিকার বলি? নাকি এটি এক ধরণের পরভোজী লতা, যে আশ্রয়দাতার রক্ত
চুষে নিয়ে নিজেকে মহীরুহ প্রমাণ করতে চায়?
এই অরণ্যে সহস্র
ভাষার মর্মর ধ্বনি শোনা যায়। হাজারো প্রজাতির পত্রবিন্যাস,
হাজারো রঙের বুনো চলন। প্রত্যেকে যদি নিজের নিজের ছায়াকেই ধ্রুব
সত্য বলে মনে করে, যদি প্রত্যেকেই শুধু শুষে নেওয়ার ব্যাকরণ
মুখস্থ করে, তবে অরণ্য কি আর অরণ্য থাকে? সে তখন হয়ে ওঠে এক অরাজকতার জঙ্গল। সেখানে কেউ দায়িত্ব নিয়ে কুসুম ফোটাতে
চায় না, কেউ পাতা ঝরিয়ে মাটিকে উর্বর করতে চায় না। সবাই
গ্রহীতা, দাতা কেউ নেই। সবাই শিকারি, অথচ
কেউ এই বাস্তুতন্ত্রের সমাজসেবক নয়। এ এক এমন জঙ্গল, যেখানে
কোনো কানুন চলে না—চলে শুধু ‘আমি আমি আমি’ নামক এক উদ্ধত
চিৎকার।
সভ্যতার ক্লাসরুমে
বসে আমরা অধিকারের সংজ্ঞা মুখস্থ করেছি। কিন্তু সেই শেষ বেঞ্চের ছাত্রটি কোথায়,
যে প্রশ্ন করবে—"স্যার, যে মাটিতে
দাঁড়িয়ে আছি, তার প্রতি কি আমার কোনো ঋণ নেই?" এই প্রশ্নহীন জঙ্গলে সবাই আজ মিসফিট। কেউ নিজের শেকড় চেনে না, অথচ অধিকারের নামে একে অপরের ডাল ছিঁড়ে নিতে চায়। এই বিশৃঙ্খলার ভিড়ে
পালামৌ-এর বন-ধুতরা কিংবা অবধের মালঞ্চ লতা আজ বড়ই একা। তারা দেখেছে, কীভাবে অধিকারের দাবিতে বুনো চলনগুলো হিংস্র হয়ে উঠছে। কীভাবে এক আদিম
প্রয়োজনে জন্ম নেওয়া ভাষা আজ কেবল গালিগালাজ আর দাবিতে পর্যবসিত হয়েছে।
এই যে সহস্র
হরিয়ালী আর পল্লবরাজীর বিন্যাস—একে ধরে রাখার দায় কি কারোর নয়?
সবাই যদি মেহফিলে গজলের সুশৃঙ্খল ছন্দ ভেঙে গ্রাম্য প্রবাদের মতো
যার যার ইচ্ছেমতো বেঁকে বসে, তবে এই বিশাল বনভূমি কি নিজের
ভার সইতে পারবে? অধিকার যখন কেবল নিজের স্বার্থের বেড়া হয়ে
দাঁড়ায়, তখন সে আর আকাশ ছোঁয়ার সিঁড়ি থাকে না; সে হয়ে ওঠে এক আত্মঘাতী ফাঁদ।
বনের গভীরে যখন
হেমন্ত আসে, শিউলি তার গন্ধ বিলিয়ে দেয়
নিঃশব্দে। সে কোনো ক্যালেন্ডার দেখে অধিকার দাবি করে না। সে জানে, ফুটে ওঠাই তার ধর্ম, আর ঝরে যাওয়াই তার দায়। কিন্তু
আমরা? আমরা এই কংক্রিটের জঙ্গলে বসে লড়ছি—কে কার চেয়ে বেশি
শুষে নিতে পারে। এ এক এমন জঙ্গলরাজ, যেখানে বাঘ হরিণকে মারছে
খিদের জ্বালায় নয়, বরং নিজের থাবার শক্তি পরীক্ষা করার জন্য।
বেলা বেড়ে যায়।
রাঙামাটির গ্রামগুলো পাথর হয়ে যাচ্ছে, আর আমাদের
অধিকারের জঙ্গল ক্রমশ আরও ঘন, আরও অন্ধকার হয়ে উঠছে। এখানে
জল নেই, যত্ন নেই, শুধু আছে
প্রতিযোগিতার বহুতল বাসনা। এই প্রতিযোগিতায় আত্মসমর্পণ করার আগে নিজের অস্তিত্ব
নিয়ে একবার গভীর শ্বাস নিয়ে ভেবে দেখি ।
ইতিহাস এখানে
ক্লিশে হয়ে গেছে। অধিকার আর দায়ের এই দ্বৈরথে অরণ্য আজ বড়ই ক্লান্ত। তবুও,
রাত বাড়লে যখন চাঁদ ডুবে যায়, সেই প্রধান
আঁধারে ফিরে আসে বৈশাখী। শূন্য থেকে শুরু হয় আবার নতুন সংখ্যা। যা ফুটেছে, তা রয়ে যায়।
অরণ্যের আসল অধিকার
তো ফুটে ওঠার মধ্যে, অন্যকে আড়াল করার
মধ্যে নয়। অধিকার কোনো হাইপার টেক্সট নয়, সে এক মগ্ন সাধনা।
এই জঙ্গলে টিকে থাকতে হলে দাতা হতে শিখতে হয়। নয়তো, এই
অধিকারের জঙ্গল একদিন নিজেই নিজেকে গ্রাস করে নেবে।
ফুলকে ফুটে উঠতেই
হয়—নিজের অস্তিত্বের দায় মেটাতে, অন্যের
অধিকার কেড়ে নিতে নয়। সেটাই অরণ্যের আদিমতম এবং একমাত্র কানুন।
Comments
Post a Comment